বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন।। বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ীরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে।
সংবিধানে এই পরিষদের শপথ নেওয়ার বিধান নেই উল্লেখ করে বিএনপি দলীয় সদস্যরা এমপি হিসেবে শপথ নিলেও প্রস্তাবিত এই পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
রাষ্ট্রপতির জারি করা জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, গণভোটে হ্যাঁ বিজয়ী হলে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা একই সাথে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবেও কাজ করবেন। ৬০ সদস্যের কোরাম হলেই এই পরিষদ কাজ করতে পারে।
ওই আদেশের ভিত্তিতে যে গণভোট হয়েছে, সেখানে 'হ্যাঁ' ভোট জয় লাভ করেছে।
ওদিকে বিএনপি আজ এ পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নিলেও জামায়াত-এনসিপির ৭৭ জন নির্বাচিত সদস্য একই সাথে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন।
বিএনপির সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় এনসিপি দলীয়ভাবে মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান বয়কট করে। দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেছেন, "গণভোটে জনরায়ের সাথে প্রতারণা করে শপথ নিতে যাচ্ছে সরকার"।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, বিএনপি দুটি শপথ না নিলে সংসদে যাওয়াই তো অর্থহীন।
সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গণভোটের রায়ের কারণে যদি জুলাই আদেশ বাস্তবায়নযোগ্যই হয়ে যায়, তাহলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রয়োজনীয়তাই থাকে না। আবার অন্যদিকে যেসব সদস্যরা শপথ নিয়েছেন তারা নিজেরাই জুলাই আদেশ অনুযায়ী নিজেরাই সংবিধান বানিয়ে ফেলতে পারেন।
তাদের মতে, জুলাই আদেশে এ ধরনের সুযোগ থাকায় একে ঘিরে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।
এর মধ্যেই মঙ্গলবার গণভোটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ও ফলাফল স্থগিত চেয়ে হাইকোর্টে রিট হয়েছে।
বিএনপি ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ
নির্বাচনের পর সংসদ সদস্যদের শপথের তারিখ ঘোষণার পর থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছিল সংবিধান সংস্কার পরিষদ। বিশেষ করে বিএনপি এই পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেবে কি-না, তা নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়ে উঠেছিল।
সকালে সংসদ ভবনে দলটির নির্বাচিত এমপিরা শপথ নেবার ঠিক আগ মুহূর্তে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ একটি সাদা ও একটি নীল রংয়ের ফরম হাতে নিয়ে মাইকের সামনে দাঁড়ান।
দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ সিনিয়র নেতারা তখন সেখানে সামনের সাড়িতে উপস্থিত ছিলেন।
মি. আহমদ সাদা ও নীল রংয়ের দুটি ফরম হাতে নিয়ে বলেন, "আমরা কেউ সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হইনি এবং সংবিধানে এখনো এটা ধারণ করা হয়নি। গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হলে সেটা সংবিধানে আগে ধারণ করতে হবে এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যকে কে শপথ নেয়াবেন সেটার বিধান করতে হবে। এমন ফরম সংবিধানের তৃতীয় তপশিলে আসবে। সেগুলো সাংবিধানিকভাবে সংসদে গৃহীত হবার পরে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ নেওয়ার বিধান করা যাবে। আমরা সংবিধান মেনে এ পর্যন্ত চলেছি। আশা করি সামনের দিনেও চলবো"।
এরপর তিনি দলীয় সদস্যদের উদ্দেশ্যে আরও বলেন, "আমি মাননীয় চেয়ারম্যানের নির্দেশে ওনার উপস্থিতিতে আমাদের দলীয় সিদ্ধান্ত জানালাম"।
প্রসঙ্গত, বিএনপি আগে থেকেই ক্ষমতা গ্রহণের পর আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দলটি সনদের ভিত্তিতে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কাজ সম্পন্ন করার কথা বলে আসছে।
জামায়াত ও এনসিপি
বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নেওয়ায় প্রাথমিকভাবে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া আসতে থাকে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির দিক থেকে।
এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া বেলা সোয়া এগারটায় ফেসবুকে তার পাতায় লিখেন "গণভোটের জনরায়কে প্রথম দিনেই বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শুরু হলো নতুন সংসদের যাত্রা"।
বেলা ১২টা ৩৭ মিনিটে এনসিপির আরেকজন নেতা সারজিস আলম তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতায় লিখেন "জুলাই সনদ ও অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার সাথে গাদ্দারি করে বিএনপি সরকারের যাত্রা শুরু হলো!"
বেলা একটা দলটির ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতায় জানায় যে তারা মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছেন না।
জামায়াতের একজন সিনিয়র নেতা প্রথমে সংবাদমাধ্যমকে শপথ না নেওয়ার কথা বললেও পরে তারা এমপি হিসেবে শপথ নেন ও একই সাথে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেন তারা। জামায়াত জোটে থাকা এনসিপি সদস্যরাও একই পথ অনুসরণ করেন।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন নির্বাচন কমিশন থেকে দুটি শপথের জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে কিন্তু এখন বিএনপি যদি একটি শপথ নেয় তাহলে সেই সংসদে গিয়ে কী হবে?
সোমবার কমিশনের চিঠিতে বলা হয় 'মঙ্গলবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ পাঠ করাবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার'।
শুধু জামায়াত-এনসিপিতে কি পরিষদ হতে পারে?
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলছেন, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুসারে সংবিধান সংস্কার পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ৬০ জন পরিষদ সদস্যের উপস্থিতি প্রয়োজন হবে।
"জামায়াত-এনসিপির তো ৭৭ জন ওই আদেশ অনুযায়ী পরিষদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন। আদেশ বলছে কোরামের জন্য দরকার ৬০ জন। তাহলে ওই আদেশ অনুযায়ী তারা তো চাইলে নিজেদের মতো করে একটি সংবিধান বানিয়ে ফেলতে পারে। সেই পথে গেলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি কী হবে কিংবা তারা সেটি করবে কি-না তা ভবিষ্যতে দেখা যাবে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালের ১৩ই নভেম্বর গেজেট হওয়া ওই আদেশে বলা হয়েছে, সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর ত্রিশ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে যে পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আহবান করা হবে অনুরূপ পদ্ধতিতে পরিষদের প্রথম অধিবেশন আহবান করা হবে।
এতে বলা হয়েছে, সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত কোনো প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য পরিষদের মোট সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে এবং অন্য বিষয়ে উপস্থিত ও ভোট দানকারী সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে পরিষদের সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে।
মনজিল মোরসেদ বলছেন, এ আদেশ মানলে এসব নিয়ম অনুযায়ী জামায়াত-এনসিপি নিজেরাই পরিষদ আহবান করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এমনকি নতুন সংবিধানও বানিয়ে ফেলতে পারেন।
জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ পরিষদের গঠন সম্পর্কে বলা হয়েছে, নির্বাচিত প্রতিনিধিগন একই সাথে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে এবং এই আদেশ অনুসারে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করিবেন।
এই ধারায় আরও বলা হয়েছে, আরও বলা হয়েছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্য দিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করবে এবং তা সম্পন্ন করবার পর পরিষদের কার্যক্রম সমাপ্ত হবে।
কিন্তু বিএনপি শপথ না নেওয়ায় কার্যত এটি করার আর সুযোগ নেই বলেই মনে করছেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক।
তাহলে এখন কী হবে?
শাহদীন মালিক বলছেন, যেই ৭৭ জন শপথ নিয়েছেন তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে পারেন সেই আদেশ বলে। কিন্তু তেমন কিছু করার জন্য সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইলে সেটি আর জনগণের সমর্থন পাবে না বলে মনে করেন তিনি।
"জুলাই আদেশ অনুযায়ী গণভোটের জেতার কারণেই যদি এটি বাস্তবায়নযোগ্য হয়ে যায়, তাহলে এমনিতেও আর সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রয়োজন হয় না। তবে এ নিয়ে রাজনৈতিক সংকট তৈরির চেষ্টা আর সফল হবে না, কারণ এখন স্থিতিশীলতা চায়," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।
মনজিল মোরসেদ বলছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের মধ্যে পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তোলা বীজ রাখা হয়েছে এবং তার মতে, এটি করাই হয়েছে দেশে আবারো অনির্বাচিত সরকার আনার প্রেক্ষাপট তৈরির জন্য।
তিনি বলেন, নির্বাচন ঘোষণার পর থেকেই দেশ সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় চলে এসেছে এবং প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভা ও এমপিদের শপথ হয়েছে সংবিধান অনুযায়ী।
বাংলাদেশের বর্তমান সাংবিধানিক ব্যবস্থায় সংসদ বহাল না থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ বা নতুন আইন জারি করা হলে তা সংসদ বহাল হওয়ার পর উত্থাপনের ৩০ দিনের মধ্যে অনুমোদন করতে হয়। না হলে সেটি বাতিল হয়ে যায়। কিন্তু রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারি করে জুলাই বাস্তবায়ন আদেশের যে গণভোট হয়েছে, সেক্ষেত্রে কি হবে, সেটি পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।
আইনের ব্যাখ্যা দিয়ে মনজিল মোরশেদ বলছেন, ''যে অধ্যাদেশে গণভোট হয়েছে, সেটা হয়েছে রাষ্ট্রপতির নামে জারি করা একটি আদেশের ওপর নির্ভর করে। এভাবে অধ্যাদেশ হতে পারে কিনা, সেটি নিয়ে আইনি প্রশ্ন রয়ে গেছে। আবার সেই অধ্যাদেশকে বা গণভোটকে বৈধতা দিতে হলে সংসদে উত্থাপন করে পাশ করাতে হবে। বিএনপি এখন সেটা সংসদে তুলবে কিনা, সেটা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।''
তিনি আরো জানান, রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারি করার ক্ষেত্রে সংবিধানে কিছু সীমাবদ্ধতা বেধে দিয়েছে। সংবিধানে যা নেই অর্থাৎ সংসদ যে বিষয়ে আইন করতে পারে না বা সংবিধানের কোনো বিধান পরির্বতন হয়ে যায়, সেসব বিষয়ে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন না।
সংবিধানে যেহেতু গণভোটের বিধান নেই, তাই এ বিষয়ে অধ্যাদেশ জারি করার এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির নেই বলে মনে করেন মনজিল মোরশেদ। ফলে এসব বিষয় নিয়ে আইনি প্রশ্ন উঠতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
এর মধ্যেই মঙ্গলবার গণভোটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ও ফলাফল স্থগিত চেয়ে রিট আবেদন করেছেন একজন আইনজীবী। সেই রিটে গণভোট বাতিল চাওয়া হয়েছে।
ওদিকে সংসদ ভবনে শপথ গ্রহণের সময় বিএনপির দিক থেকে যেই ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে সেখানে বলা হয়েছে তারা সংবিধান অনুযায়ী পদক্ষেপ নিবেন।
তবে এর আগে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে সংবিধান সংস্কারের কিছু বিষয়ে বিএনপি নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিল।
তখন বলা হয়েছিল, নির্বাচনে তাদের ইশতেহার জনগণের ম্যান্ডেট পেলে তার সে অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের পদক্ষেপ নিবে।
মনজিল মোরসেদ বলছেন, সংবিধানে সংস্কার আনার বিষয়ে বিএনপি তাদের যে পরিকল্পনার কথা আগে জানিয়েছিল সে অনুযায়ী সংসদে বিল উত্থাপনের মাধ্যমে সংবিধানের প্রয়োজনীয় পরিবর্তন তারা করতে পারবে।
"এবং এটিই হবে সাংবিধানিক পন্থা। এর অন্যথা কিছু হলে সেটি জাতীয় স্থিতিশীলতার জন্যই হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।