মানবজমিনের প্রতিবেদন।। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে গুপ্তহত্যা ও টার্গেট কিলিংয়ের শঙ্কা করছেন গোয়েন্দারা। এমন আশঙ্কার পরপরই সারা দেশের পেশাদার কিলার-শুটারদের তালিকা করা হয়েছে। নির্বাচনী ডামাডোল শুরুর পর ইনকিলাব মঞ্চের মুখমাত্র ওসমান হাদিসহ বেশ কিছু হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নড়েচড়ে বসেছে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে গোয়েন্দাদের করা তালিকা পুলিশ সদরদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট ইউনিটে পাঠানো হয়েছে। তালিকায় থাকা এ সব অপরাধীকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তাদের অবস্থান শনাক্ত ও গতিবিধি মনিটরিং করা হচ্ছে।
বিশেষ করে ঢাকার ২০টি আসনে পুলিশ ও গোয়েন্দারা কাজ করে যাচ্ছেন। আর ঢাকার বাইরে জেলা পুলিশও সংশ্লিষ্ট এলাকার অপরাধীদের নজরদারিতে রেখেছেন। পেশাদার তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ছাড়াও মাঝারি ও ছোট সারির সন্ত্রাসীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কারণ তারা যাতে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে কোনো প্রার্থী বা দলের হয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে। পুলিশের পাশাপাশি অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে এই মুহূর্তে শীর্ষ শতাধিক শুটারের তালিকা রয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, এবার নির্বাচনে সহিংসতা, সংঘর্ষ, গুলি, গুপ্তহত্যা, টার্গেট কিলিংয়ের মতো ঘটনার আশঙ্কা করা হচ্ছে। মাঠপর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহ, ঘটে যাওয়া ঘটনা বিশ্লেষণ, দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনা, ছোট-বড় অপরাধীদের তৎপরতা, জেল থেকে পালানো বন্দিদের ধরতে না পারা, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের জামিনে মুক্ত হওয়াসহ বেশ কিছু কারণে এবারের আশঙ্কাটা অতীতের তুলনায় একটু বেশি। নাশকতা সহিংসতা বেশি হতে পারে এমনকিছু জেলাকেও তালিকায় গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে ফরিদপুর, খুলনা, বাগেরহাট, শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জ জেলাকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এর বাইরেও হেভিওয়েট প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এমন কিছু জেলাতে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় জোর দেয়া হয়েছে। যেসব এলাকায় আগের নির্বাচনগুলোতে সহিংসতা ও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে সেগুলোকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
পুলিশের সূত্র বলছে, লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারেও তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। এখনও এক হাজারের বেশি অস্ত্র সন্ত্রাসী অপরাধীদের হেফাজতে রয়েছে। এসব অস্ত্র ব্যবহার করে যাতে কোনো ধরনের গুপ্তহত্যা বা টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনা না ঘটে সেদিকেও তৎপর পুলিশ। তাই পুলিশ গোয়েন্দা তথ্য ও স্থানীয় সোর্স কাজে লাগিয়ে এসব অস্ত্র উদ্ধারের চেষ্টা করছে। এর বাইরে দেশের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতেও বাড়তি নজরদারি করা হচ্ছে। নির্বাচনকে ঘিরে যাতে অবৈধভাবে অস্ত্র দেশে প্রবেশ করতে না পারে। তবে নির্বাচনকে ঘিরে দেশে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র দেশে প্রবেশ করেছে এমন আলোচনাও আছে। তবে এসব অস্ত্র কার কাছে কোন জেলায় আছে সেই তথ্য কারও কাছে নেই। বিজিবি দিবসের অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাই বলেছিলেন, সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র প্রবেশের কথা।
এবারের নির্বাচনে প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্বে কাজ করবেন। অপরাধীদের ধরতে সারা দেশে বিশেষ অভিযান, টহল, তল্লাশি চৌকি, মোবাইল পেট্রোল ও গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়িয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি, সেনাবাহিনী, র্যাব তল্লাশি অভিযান পরিচালনা করছে। পুলিশ সদরদপ্তর থেকে জেলার এসপি, রেঞ্জ ডিআইজি, কমিশনারসহ বিভিন্ন ইউনিট প্রধানদের কাছ থেকে সার্বিক পরিস্থিতি জেনে বিভিন্ন ধরনের নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে।
সদরদপ্তরের সঙ্গে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বৈঠকে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি, গোয়েন্দা তথ্য, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এবং নিরাপত্তা ঘাটতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিটি জেলার প্রস্তুতি কতটা এগিয়েছে, তা সরাসরি জানানো হচ্ছে আইজিপিকে। নির্বাচনে এনালগ নজরদারির পাশাপাশি ডিজিটাল নজরদারিতে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এজন্য সরঞ্জামাদিও কেনা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের প্রার্থীদের অনেকেই নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা জানিয়েছিলেন। আর ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যার পর প্রার্থীদের নিরাপত্তা ইস্যু সামনে আসে। এরপরই কিছু প্রার্থীকে দেয়া হয়েছে সার্বক্ষণিক গানম্যান। কারও বাড়িতে রাখা হয়েছে পুলিশ প্রহরা। আবার যাদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি, তাদের ক্ষেত্রে গানম্যান ও বাসাবাড়ির নিরাপত্তার পাশাপাশি দেওয়া হয়েছে পুলিশ প্রটোকলের গাড়ি। পুলিশ জানিয়েছে, অন্তত ১৮ জন প্রার্থীকে এই ধরনের বিশেষ নিরাপত্তার আওতায় আনা হয়েছে। এ ছাড়া জেলা পর্যায়ে যেসব ব্যক্তি রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর বা যাদের ঝুঁকি রয়েছে, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সুপারদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সূত্র জানিয়েছে, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর দুই শীর্ষ নেতাকে গানম্যান ও বাসাবাড়ির নিরাপত্তার পাশাপাশি দেয়া হয়েছে পুলিশ প্রটোকলের গাড়ি।
এ ছাড়া ঢাকা-১১ আসনের প্রার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, ঢাকা-১২ আসনের প্রার্থী ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এবং ঢাকা-১৩ আসনে ধানের শীষের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী ববি হাজ্জাজের নিরাপত্তায় গানম্যান দেয়া হয়েছে। এর বাইরে ঢাকা-৮ আসনে এনসিপি’র প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারাকে গানম্যানের পাশাপাশি পুলিশ প্রটোকলের গাড়িও দেয়া হচ্ছে।
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) আইন ও গণমাধ্যম শাখার (পরিচালক) উইং কমান্ডার এমজেডএম ইন্তেখাব চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যান্য ইউনিটের পাশাপাশি আমরা একটা তালিকা ধরে সম্ভাব্য শুটার ও কিলারদের নিয়ে কাজ করছি। মূল কাজ পুলিশ করছে। আমাদের গোয়েন্দা ইউনিট শুটারদের গতিবিধি, অবস্থান, কোনোরকম আর্থিক লেনদেন, বা কোনো সন্ত্রাসীগোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত হচ্ছে কি না সেগুলো মনিটরিং করছে। কোনো ধরনের অস্বাভাবিক কিছু পেলে আমরা আইনের আওতায় নিয়ে আসবো। প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে র্যাব কীভাবে কাজ করছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইতিমধ্যে যেসব প্রার্থী ঝুঁকির কথা জানিয়েছেন, তাদের নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছে। অনেককে গানম্যান দেয়া হয়েছে। এরবাইরেও যারা ঝুঁকিতে আছেন তাদের আমরা সমন্বিতভাবে নিরাপত্তা দিচ্ছি। তাদের প্রচার-প্রচারণার সময় আমরা নজরদারি রাখছি।