শিরোনাম
◈ ভারতীয় অপতথ্যের ফাঁদে বাংলাদেশ, উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ভুয়া খবর ◈ চুক্তিতে না এলে আগের চেয়েও ভয়াবহ হামলা: ইরানকে ট্রাম্পের নতুন হুমকি ◈ এবার চট্টগ্রামে গভীর নলকূপের গর্তে পড়ে গেল শিশু, চলছে উদ্ধার কাজ (ভিডিও) ◈ নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ: টিকিট নিশ্চিত করল বাংলাদেশ ◈ ১৪ বছর পর ঢাকা–করাচি সরাসরি ফ্লাইট, টিকিট কেনার হিড়িকে দ্বিতীয় ট্রিপেরও ৮০ শতাংশ বুকিং ◈ খেলাপি ঋণ কমাতে কঠোর পদক্ষেপ: নাম-ছবি প্রকাশ ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার দাবি ◈ বাংলাদেশের নির্বাচনে ‘হাদি প্রভাব’ ◈ নির্বাচনী ব্যয়: হলফনামায় ৩৯৬ কোটি, বাস্তবে কত? ◈ নির্বাচন শান্তিপূর্ণ রাখতে উস্কানিমূলক পরিস্থিতিতে শান্ত থাকবেন নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান মির্জা আব্বাসের ◈ নির্বাচনী প্রচারণায় একটি রাজনৈতিক দল  ‘ধর্মীয় অনুভূতির অপব্যবহার করছে ’ অভিযোগ  বিএনপির

প্রকাশিত : ২৮ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৬:৫৪ বিকাল
আপডেট : ২৮ জানুয়ারী, ২০২৬, ১০:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

নির্বাচনী ব্যয়: হলফনামায় ৩৯৬ কোটি, বাস্তবে কত?

আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী এক হাজার ৯৮১ প্রার্থী হলফনামায় ব্যয়ের যে হিসাব প্রকাশ করেছেন, তার পরিমাণ প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিসংখ্যান বাস্তবসম্মত নয় এবং এটি নির্বাচনী প্রচারণার প্রকৃত ব্যয়ের প্রতিফলন নয়।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) 'নো ইউওর ক্যান্ডিডেট' পোর্টালের তথ্য অনুযায়ী, বিএনপির প্রার্থীরা মূলত ব্যক্তিগত তহবিল থেকে তাদের নির্বাচনী ব্যয় বহন করার পরিকল্পনা করেছেন, যার ৫৬ শতাংশই নিজস্ব তহবিল থেকে আসবে।

এর বিপরীতে, জামায়াতে ইসলামী জানিয়েছে, তাদের নির্বাচনী ব্যয়ের ৫৮ শতাংশ অনুদান ও দান থেকে আসবে, যার মধ্যে দলের তহবিলও অন্তর্ভুক্ত। জাতীয় নাগরিক পার্টি জানিয়েছে, তাদের নির্বাচনী ব্যয়ের ৬২ শতাংশ অনুদান ও দানের ওপর নির্ভর করবে।

সব দলের ক্ষেত্রে মোট ব্যয়ের পরিমাণ ৩৯৬ কোটি টাকা।

মোট খরচের মধ্যে, বিএনপি তাদের ২৮৮ প্রার্থীর জন্য ১১৫ দশমিক ৪ কোটি টাকা, জামায়াত ২২৪ প্রার্থীর জন্য ৬৬ দশমিক ৩ কোটি টাকা, জাতীয় পার্টি ১৯২ প্রার্থীর জন্য ৩০ দশমিক ৮ কোটি টাকা, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (আইএবি) ২৫৩ প্রার্থীর জন্য ২৯ কোটি টাকা, গণ অধিকার পরিষদ ৯০ প্রার্থীর জন্য ১২ দশমিক ৩ কোটি টাকা এবং এনসিপি ৩২ প্রার্থীর জন্য ১১ দশমিক ৭ কোটি টাকা ব্যয়ের ঘোষণা দিয়েছে।

স্বতন্ত্র প্রার্থীরা মোট ৫৩ কোটি টাকা ব্যয় করবেন।

টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন ডিরেক্টর মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম বলেছেন, প্রার্থীরা যে তথ্য তাদের হলফনামায় দিয়েছেন, তারা তা সংকলন করেছেন এবং ব্যাখ্যা করেছেন, প্রতিটি রাজনৈতিক দলের তহবিলকেও অনুদান বা দানের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে গণ্য হবে।

'একইভাবে, যখন কোনো সমর্থক বা শুভাকাঙ্ক্ষী স্বেচ্ছায় দলে অর্থ দান করেন, তখন এটিও দান বা অনুদানের শ্রেণীতে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে, প্রার্থীরা ব্যয় মেটাতে আত্মীয়স্বজন বা ঘনিষ্ঠ পরিচিতদের কাছ থেকেও ঋণ নেন।'

টিআইবি পোর্টালের তথ্য অনুযায়ী, বিএনপির প্রার্থীরা ঘোষণা দিয়েছেন, মোট তহবিলের মধ্যে ৪৪ দশমিক ২ কোটি টাকা দান বা অনুদান থেকে আসবে, ৬ দশমিক ৮ কোটি টাকা ঋণ থেকে এবং ৬৪ দশমিক ৪ কোটি টাকা দলের নিজস্ব তহবিল থেকে আসবে।

জামায়াত প্রার্থীরা ঘোষণা দিয়েছেন, ৩৮ দশমিক ৬ কোটি টাকা দান ও অনুদান থেকে, ১০ কোটি টাকা ঋণ থেকে এবং ১৭ দশমিক ৭ কোটি টাকা দলের নিজস্ব তহবিল থেকে আসবে।

জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা ৬ দশমিক ১ কোটি টাকা অনুদান ও দান থেকে, ৬ দশমিক ৯ কোটি টাকা ঋণ থেকে এবং ১৭ দশমিক ৮ কোটি টাকা নিজস্ব তহবিল থেকে পাবেন।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীরা ১৬ দশমিক ৭ কোটি টাকা অনুদান বা দান থেকে, ১ দশমিক ৬ কোটি টাকা ঋণ থেকে এবং ১০ দশমিক ৭ কোটি টাকা পার্টির নিজস্ব তহবিল থেকে পাবেন।

গণ অধিকার পরিষদের প্রার্থীরা ২ দশমিক ৮ কোটি টাকা অনুদান ও দান থেকে, ২ দশমিক ৬ কোটি টাকা ঋণ থেকে এবং ৬ দশমিক ৯ কোটি টাকা নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যবহার করবেন।

এনসিপি প্রার্থীরা ৭ দশমিক ৩ কোটি টাকা অনুদান ও দান থেকে, ২ দশমিক ২ কোটি টাকা ঋণ থেকে এবং সমপরিমাণ টাকা পার্টির তহবিল থেকে পাবেন।
 
প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয়ের সীমা নির্ধারণকারী গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ অনুযায়ী, একজন প্রার্থী নির্বাচনী এলাকার প্রতিটি ভোটারের জন্য সর্বোচ্চ ১০ টাকা ব্যয় করতে পারবেন, তবে মোট খরচ ২৫ লাখ টাকা অতিক্রম করতে পারবে না, যা ভোটারের সংখ্যার ওপর নির্ভর করবে।

এ ছাড়া, প্রার্থীদের নির্বাচনের ৩০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারের কাছে তাদের নির্বাচনী খরচের বিস্তারিত হিসাব জমা দিতে হবে।

হলফনামায় নির্বাচনীয় ব্যয়ের ঘোষণার বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ এবং বর্তমানে বিলুপ্ত নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার হেসে বলেন, 'তারা আমাদের সঙ্গে শুধুই উপহাস করছে… আমরা সবাই জানি, একটি মনোনয়ন নিশ্চিত করতে প্রার্থীদের কয়েক কোটি টাকা খরচ করতে হয়।'

তিনি আরও যোগ করেন, প্রার্থীরা কখনো তাদের ব্যয় সীমার মধ্যে রাখেন না।

ওয়েস্টমিনস্টার ফাউন্ডেশন ফর ডেমোক্রেসি কর্তৃক ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত 'দ্য কস্ট অব পলিটিকস ইন বাংলাদেশ' শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যয়বহুল, যেখানে প্রার্থীরা মনোনয়ন নিশ্চিত করা এবং নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর জন্য ৫ থেকে ১০ কোটি টাকা খরচ করেন।
 
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনী প্রচারণার ব্যয় বৃদ্ধি অনেক আগ্রহী রাজনীতিবিদের জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে, বিশেষ করে কম ধনী এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের জন্য, এর সঙ্গে নারীরাও অন্তর্ভুক্ত।

প্রতিবেদন তৈরিতে গবেষণাটি ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে পরিচালিত হয়েছিল। এতে সাবেক সংসদ সদস্য, নির্বাচন কর্মকর্তা ও অন্যান্য স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে ২৫টি সাক্ষাৎকার এবং দুটি গ্রুপ ডিসকাশন অন্তর্ভুক্ত ছিল।

গবেষকরা সরকারি প্রকাশনা, গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতি নিয়ে একাডেমিক গবেষণাসহ অন্যান্য সেকেন্ডারি সোর্স থেকেও তথ্য সংগ্রহ করেছেন।
 
নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালীন, নির্বাচনী এলাকা এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতার স্তরের ওপর নির্ভর করে প্রার্থীদের তিন কোটি থেকে পাঁচ কোটি টাকা বা তার বেশি খরচ করতে হয়।

ভোট পেতে নির্বাচনের দিনেও প্রার্থীদের খরচ করতে হয়। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনের দিনে একজন প্রার্থীর গড় ব্যয় কমপক্ষে ৫০ লাখ টাকা।

২০২৪ সালের সব নির্বাচনে 'ভোট কেনা' লক্ষ্য করা যায়, যেখানে প্রতিটি ভোটের জন্য এক থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থ দেওয়া হয়েছিল।

নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরও কিছু প্রার্থীর প্রশাসনিক প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য আরও চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা খরচ করতে হয়, যেমন ফলাফল প্রকাশ বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করা।

২০২৪ সালের নির্বাচনের ওপর টিআইবির একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, নির্বাচনী সময়সূচি ঘোষণার আগে থেকে ভোটের দিন পর্যন্ত একজন প্রার্থীর গড় ব্যয় ছিল ১ দশমিক ৫৭ কোটি টাকা — যা নির্বাচন কমিশনের অনুমোদিত সর্বাধিক সীমার (প্রতি প্রার্থীর সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা) চেয়েও ছয়গুণ বেশি। গবেষণায় ৫০টি আসন অন্তর্ভুক্ত ছিল।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, 'দলগুলোর সার্বিক কর্মকাণ্ড এবং ব্যয়ের ধরন বিবেচনা করে বলা যায়, তারা নির্ধারিত সীমা অনেক আগেই অতিক্রম করেছেন।'

তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক নেতা ও তাদের পার্টি নিজেদের সংস্কার না করলে বেশি কিছু পরিবর্তন হবে না। তবে ইসি, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) যদি সাহস ও প্রতিশ্রুতি দেখিয়ে তাদের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করতো, তাহলে অন্তত কিছু দৃশ্যমান পরিবর্তন আশা করা যেত।

'ইসির কাজ হবে অতিরিক্ত ব্যয় বা হলফনামার তথ্যের অসঙ্গতির ক্ষেত্রে প্রার্থীর বৈধতা যাচাই করা; এনবিআরের কাজ হবে কর ফাঁকির ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং দুদকের কাজ হবে অবৈধ সম্পদ ও আয়সহ দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।'

গতকাল দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ইসির  একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা স্বীকার করেন যে প্রার্থীরা তাদের হলফনামায় যা ঘোষণা দেন, তার চেয়ে বেশি খরচ করেন।
 
'তাদের নির্বাচনী ব্যয়ের জন্য একটি পৃথক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রাখতে হয়। তবে বাস্তবে, অনেক সময় আর্থিক লেনদেনের একটি বড় অংশ আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেল এড়িয়ে চলে। বড় অঙ্কের অর্থ, কখনও কোটি টাকারও হতে পারে, প্রায়ই আনুষ্ঠানিক ব্যাংক চ্যানেল এড়িয়ে লেনদেন করা হয়, তাই ঘুষ বা অবৈধ লেনদেন ধরা বা প্রমাণের কাজ খুব কঠিন হয়ে যায়।'

কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, এই অ্যাকাউন্টগুলো যাচাই করা এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাসুদ বলেন, তারা জমা দেওয়া ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করবেন। 'যদি ভোট কেনার জন্য কালো টাকা ব্যবহার করা হয়, তবে তা জনগণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বিকৃত করে… আমরা আসন্ন নির্বাচনের জন্য ব্যয়ের হিসাব যাচাইকরণ আরও শক্তিশালী করব।' উৎস: ডেইলি স্টার।

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়