অমর একুশে বইমেলার আয়তন যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে স্টলের সংখ্যাও। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মেলার কেন্দ্রবিন্দুও যেন কিছুটা সরে গেছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে। তবু বইমেলার ইতিহাস, স্মৃতি আর সাংস্কৃতিক আবহের এক অনন্য কেন্দ্র হিসেবে এখনও দাঁড়িয়ে আছে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ। এখানে পা রাখলে যেন ধরা দেয় বইমেলার সেই পুরোনো দিনের আবহ—যখন লেখক, কবি, শিল্পী আর পাঠকদের প্রাণবন্ত আড্ডায় মুখর থাকত পুরো এলাকা। এখন সেই ভিড় আর কোলাহলের বড় অংশ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সরে গেলেও বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে রয়ে গেছে অন্যরকম এক পরিবেশ—নিরিবিলি, ধীর, স্মৃতিময়। যেখানে ভিড় কম হলেও বইয়ের প্রতি নিবেদিত পাঠকদের উপস্থিতি এখনও চোখে পড়ে।
প্রায় ১৯ বছর ধরে বাংলাদেশ শিশু একাডেমির বইমেলা স্টলে কাজ করছেন কামাল হোসাইন। শিশু একাডেমির প্রুফ সেকশনে কর্মরত এই কর্মী জানান, আগে বইমেলা এক জায়গাতেই সীমাবদ্ধ থাকায় প্রতিদিনই দেখা মিলত লেখক, কবি ও সাহিত্যিকদের প্রাণবন্ত আড্ডার। “চোখ ফেরালেই কোথাও না কোথাও লেখকদের জটলা থাকত। স্টলে বসে পাঠকদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে কখন সময় চলে যেত বুঝতাম না,” বলেন তিনি।
তার ভাষ্য, এখন মেলার পরিসর বড় হলেও সেই উচ্ছ্বাস আর আগের মতো অনুভূত হয় না। মেলা প্রাঙ্গন ভাগ হওয়ার পর থেকেই বাংলা একাডেমির অংশে পাঠক ও দর্শনার্থীর উপস্থিতি তুলনামূলক কমে গেছে।
এবার বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গনে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সংগঠন ও এনজিও মিলিয়ে মোট ৮১টি স্টল রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য উদীচী, উন্মাদ, জাসদ, চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর (ডিএফপি), সমবায় অধিদপ্তর, জিয়াউর রহমান আর্কাইভ, স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশনা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা সংস্থা, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউট, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
এসব স্টলে সাজানো রয়েছে বিষয়ভিত্তিক বই, ম্যাগাজিন, পোস্টার, ক্যাটালগসহ নানা প্রকাশনা। স্টলকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই অংশে মূলত সেই পাঠকরাই বেশি আসেন যারা দীর্ঘ সময় ধরে বইমেলায় ঘোরেন, বই খোঁজেন এবং বিকেলে মূলমঞ্চের অনুষ্ঠানও দেখতে চান।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির স্টলে ১৯৯৩ সাল থেকে কাজ করছেন হাফিজ আহমেদ। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, একসময় শিল্পীদের আনাগোনায় সরগরম থাকত তাদের স্টল।
“আমাদের স্টলে কত বড় বড় শিল্পী আসতেন আগে। এখন তাদের বই আছে, কিন্তু তারা আর আসেন না। এখন বেশি আসেন চারুকলার শিক্ষার্থীরা। শিল্পীদের ছবির ক্যাটালগ বা শিল্পবিষয়ক বই খুঁজতে আসেন তারা,” বলেন তিনি।
রোজার সময়ের বইমেলার স্মৃতিও তার মনে উজ্জ্বল। নব্বইয়ের দশকের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, তখন অনেক সময় আমি সেহরির খাবার নিয়েই মেলায় আসতাম। টিএসসি থেকে দোয়েল চত্বর পর্যন্ত পুরো এলাকা যেন এক বিশেষ আবহে ভরে উঠত।
প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি) স্টলের দায়িত্বে থাকা মো. মঞ্জুরুল হক খান বলেন, বাংলা একাডেমির অংশে এখন মেলাকেন্দ্রিক মানুষের উপস্থিতি তুলনামূলক কম। “সারাদিন বসে থাকি। যারা আসে, তারা বেশিরভাগই ঘুরে দেখে চলে যায়। কেনাকাটা খুব কম হয়। সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্টল বেশি থাকায় মানুষের আগ্রহটা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকেই বেশি,” বলেন তিনি।
তার মতে, বইমেলার মূল প্রাণ এখনো বাংলা একাডেমিকেই ঘিরে। পুরোনো পাঠক আর কিছু দর্শনার্থীদের চলাচল দেখলেই বোঝা যায়, মেলার ঐতিহ্য এখান থেকেই শুরু।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের স্টলে থাকা হারেছ উজ জামান বলেন, আগে তাদের স্টলে মুক্তিযোদ্ধা থেকে শুরু করে নানা বয়সের পাঠকের ভিড় লেগে থাকত। “অনেকে নির্দিষ্ট করে বইয়ের নাম বলতেন, কেউ আবার স্মারক খুঁজতেন। এখন সেই ভিড় অনেকটাই কমে গেছে,” বলেন তিনি।
তার মতে, এখন মেলার এই অংশ অনেকটাই স্বস্তির জায়গা হয়ে উঠেছে। যেখানে ভিড়ের কোলাহল কম, কিন্তু বইয়ের প্রতি আগ্রহী পাঠকেরা এখনও খুঁজে নেন তাদের প্রয়োজনীয় বই।
তবে কিছুটা ভিন্ন চিত্র দেখা যায় গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের স্টলে। সেখানে পাঠকেরা তথ্যসমৃদ্ধ ও জ্ঞানভিত্তিক বইগুলো আগ্রহ নিয়ে দেখছেন। কেউ কেউ বইয়ের ছবি তুলে বা সিরিয়াল নম্বর লিখে রাখছেন, পরে পাবলিক লাইব্রেরিতে গিয়ে পড়ার জন্য। স্টলের দায়িত্বে থাকা শফিকুর রহমান জানান, আগ্রহ থাকলেও পরবর্তীতে পাবলিক লাইব্রেরীতে গিয়ে এই বইগুলো পড়ার পাঠক সংখ্যা খুব বেশি নয়।
মূলত বাংলা একাডেমি চত্বরে স্থান সংকুলান না হওয়ায় ২০১৪ থেকে বইমেলা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্প্রসারণ করা হয়। তারপর থেকেই ফিকে হতে শুরু করে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ। তবু বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে এখনও টিকে আছে বইমেলার পুরোনো দিনের আবহ। যেখানে কোলাহলের বদলে আছে স্মৃতি, পাঠ আর নীরব মেলাবৃত্তির দীর্ঘ ধারাবাহিকতা।
বইমেলায় এলো যেসব নতুন বই
বৃহস্পতিবার মেলায় নতুন বই আসে ৮২টি। এছাড়া শাহাদাত হোসেনের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ম্যাগাজিন গণগ্রাফিতি। এটির প্রথম সংখ্যায় রয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান, সংস্কার ও নির্বাচন নিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ তিন প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি, জামায়াতে ইসলাম ও এনসিপির নিজস্ব ভাবনা। পাশাপাশি রয়েছে বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিক ও স্কুলছাত্রীর দৃষ্টিভঙ্গি। এছাড়া থাকছে বিশেষ সাক্ষাৎকার এবং অভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট প্রবন্ধ ও গল্প। বইটির মোড়ক উন্মোচন হয় সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অমর একুশে বইমেলার মোড়ক উন্মোচন মঞ্চে।
শুক্রবারের বইমেলার আয়োজন
শুক্রবার মেলায় শিশুপ্রহর শুরু হবে সকাল ১১টায়। সকাল সাড়ে ১০টায় শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি ও সংগীত প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার প্রদান করা হবে।
বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘স্মরণ : বদরুদ্দীন উমর’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন ফিরোজ আহমেদ। আলোচনায় অংশ নেবেন সুমন রহমান। সভাপতিত্ব করবেন আনু মুহাম্মদ। বিকেল ৪টায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
সূত্র: সমকাল