জীবনে আঘাত, হতাশা কিংবা কোনো প্রিয় কিছু হারানোর পর মন খারাপ হওয়া খুবই স্বাভাবিক। অনেক সময় সেই কষ্ট এতটাই গভীর হয় যে মানুষ নিজের ভেতরেই গুটিয়ে যায়।
পুরনো ঘটনা বারবার মনে পড়তে থাকে, ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয় নানা দুশ্চিন্তা। এর প্রভাব পড়ে দৈনন্দিন আচরণেও, সামান্য বিষয়েও অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে ফেলতে পারেন কেউ কেউ।
তীব্র আবেগের সময়ে নিজেকে সামলে রাখা সহজ নয়। তবে অনুভূতিগুলোকে অস্বীকার না করে সেগুলো বুঝতে শেখা এবং প্রতিক্রিয়া জানানোর আগে কিছুটা সময় নেওয়া পরিস্থিতি সামলাতে সাহায্য করতে পারে।
আবেগ নিয়ন্ত্রণ মানে কষ্ট, ভয়, রাগ বা দুশ্চিন্তা একেবারে অনুভব না করা নয় বরং এসব অনুভূতির মধ্যেও সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা ধরে রাখা।
নিজের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানো, শ্বাস-প্রশ্বাসের দিকে মনোযোগ দেওয়া কিংবা কোনো পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া না দেখানোর মতো ছোট ছোট অভ্যাস ধীরে ধীরে মানসিক স্থিরতা ফিরিয়ে আনতে পারে।
আবেগের কঠিন সময়ে কাজে লাগতে পারে এমন ছয়টি উপায় জেনে নেওয়া যাক।
প্রতিক্রিয়ার আগে একটু থামুন
তীব্র রাগ, কষ্ট বা হতাশার মুহূর্তে সঙ্গে সঙ্গে কোনো সিদ্ধান্ত কিংবা প্রতিক্রিয়া না দেখানোই ভালো। নিজেকে কয়েক মুহূর্ত সময় দিন।
এই সময়ে কী ঘটছে, শরীরে কী ধরনের পরিবর্তন অনুভব করছেন এবং মাথায় কী চিন্তা ঘুরছে—সেদিকে মনোযোগ দিন। কোনো বিচার-বিশ্লেষণে না গিয়ে শুধু অনুভূতিটাকে পর্যবেক্ষণ করুন। সামান্য এই বিরতিই আবেগ ও প্রতিক্রিয়ার মধ্যে একটি দূরত্ব তৈরি করতে পারে। ফলে পরিস্থিতির উপযোগীভাবে সাড়া দেওয়ার সুযোগ পাওয়া যায়।
ঠিক কী অনুভব করছেন, তা শনাক্ত করুন
‘খারাপ লাগছে’, এতটুকুতে থেমে না গিয়ে নিজের অনুভূতিকে নির্দিষ্ট করে বোঝার চেষ্টা করুন। আপনি কি আসলে কষ্ট পেয়েছেন, নাকি রেগে আছেন? হতাশ, উদ্বিগ্ন নাকি কোনো কারণে ভীষণ ব্যথিত?
অনুভূতির সঠিক নাম দিতে পারলে নিজের ভেতরের অবস্থাটাও পরিষ্কার হয়। এতে আবেগকে সামলানো এবং তার সঙ্গে কীভাবে মোকাবিলা করবেন, তা ঠিক করা তুলনামূলক সহজ হতে পারে।
চারপাশের বাস্তবতায় মন ফেরান
কোনো একটি চিন্তা যখন বারবার মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে, তখন সচেতনভাবে মনোযোগ বর্তমান মুহূর্তে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করুন।
জানালার বাইরে তাকাতে পারেন, আকাশের দিকে কিছুক্ষণ মনোযোগ দিতে পারেন কিংবা চারপাশের শব্দগুলো শুনতে পারেন। হাঁটার সময় পায়ের সঙ্গে মাটির স্পর্শও অনুভব করতে পারেন। এ ধরনের ছোট ছোট মনোযোগের অনুশীলন একই চিন্তার মধ্যে আটকে থাকা থেকে কিছুটা বেরিয়ে আসতে সাহায্য করতে পারে।
শ্বাস-প্রশ্বাসকে কাজে লাগান
দুশ্চিন্তা বা অস্থিরতার সময় শ্বাস-প্রশ্বাসের দিকে মনোযোগ দেওয়া যেতে পারে। ধীরে শ্বাস নিন এবং ধীরে ছাড়ুন। চাইলে প্রতিবার শ্বাস নেওয়া ও ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে মনে গুনতে পারেন। এতে মনকে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর স্থির রাখা সম্ভব হয়। ধীর ও নিয়ন্ত্রিত শ্বাস-প্রশ্বাস শরীরকে শিথিল করতেও সহায়তা করতে পারে, যা মানসিক চাপ সামলানোর ক্ষেত্রে কাজে লাগতে পারে।
কয়েক মিনিটের জন্য থেমে যান
ধ্যান করতে হলে দীর্ঘ সময় আলাদা করে বসে থাকতে হবে, এমনটা নয়। দিনের ব্যস্ততার মাঝেও কয়েক মুহূর্ত নিজের জন্য রাখা যেতে পারে।
চোখ বন্ধ করে কয়েকবার ধীরে ও গভীরভাবে শ্বাস নিন। মাথায় নানা চিন্তা এলে সেগুলোর পেছনে ছুটে না গিয়ে শুধু সেগুলোকে আসতে-যেতে দিন। কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া কিংবা কঠিন কথোপকথনে যাওয়ার আগে কয়েক মিনিটের এই বিরতিও নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিতে পারে।
প্রয়োজন অনুযায়ী ‘না’ বলতে শিখুন
অন্যের প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়ে নিজের সময়, শক্তি ও মানসিক শান্তির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করা ঠিক নয়। তাই নিজের জন্য কোন বিষয়টি গ্রহণযোগ্য আর কোনটি নয়, সে বিষয়ে পরিষ্কার সীমা তৈরি করা জরুরি।
কোনো কিছু আপনার জন্য উপযুক্ত না হলে সব সময় দীর্ঘ ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন হলে ভদ্রভাবে ‘না’ বলার অভ্যাস করুন। নিজের মানসিক প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া মানে অন্যদের অবহেলা করা নয়। বরং নিজের যত্ন নেওয়াও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব।
কষ্ট বা তীব্র আবেগ জীবনের স্বাভাবিক অংশ। সবসময় তা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা না করে অনুভূতিগুলোকে বুঝতে শেখা জরুরি। প্রতিক্রিয়ার আগে থামা, অনুভূতির নাম দেওয়া, বর্তমান মুহূর্তে মনোযোগ ফেরানো, শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ এবং নিজের সীমা নির্ধারণের মতো অভ্যাস ধীরে ধীরে আবেগ সামলানোর দক্ষতা বাড়াতে পারে।
তবে দীর্ঘদিন ধরে কষ্ট, উদ্বেগ বা মানসিক অস্থিরতা দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত করলে প্রয়োজন অনুযায়ী একজন মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
সূত্র: বাংলা নিউস ২৪