অহংকার এমন একটি মানসিক ব্যাধি, যা মানুষকে অজান্তেই সত্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। ইসলামে এটি একটি গুরুতর নিন্দনীয় গুণ হিসেবে বিবেচিত। একজন মুমিনের পরিচয় নম্রতা, বিনয় ও মানবিকতায়; অথচ অহংকার মানুষের হৃদয়কে কঠিন করে তোলে এবং আল্লাহর নৈকট্য থেকে বঞ্চিত করে। কিয়ামতের দিন অহংকারীদের মানুষের সূরতে পিঁপড়ার মতো একত্রিত করা হবে এবং তাদের শেষ পরিণতি হবে জাহান্নাম।
অহংকার মানুষকে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। এটি কখনোই একজন মুমিনের চরিত্রের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। বরং নম্রতা, বিনয় ও নিরহংকারীতাই প্রকৃতপক্ষে একজন মুমিনের পরিচয় বহন করে। অন্যদিকে অহংকার মহান রাব্বুল আলামিনের চাদর, কাজেই এই গুণ কেবল আল্লাহ তা’আলার জন্যই প্রযোজ্য। হাদিসে পাকে এসেছে—
الْعِزُّ إِزَارُهُ وَالْكِبْرِيَاءُ رِدَاؤُهُ، فَمَنْ يُنَازِعُنِي فِيهِمَا أُعَذِّبْهُ
ইজ্জত (সম্মান) আল্লাহর লুঙ্গি এবং অহংকার তাঁর চাদর। যে ব্যক্তি এ দুটি বিষয়ে তার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবে, আল্লাহ তাকে শাস্তি দেবেন। (মুসলিম ৬৫৭৪)
পবিত্র কুরআনেও মানুষকে অহংকারী না হতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কারণ, মহান আল্লাহ অহংকারীকে পছন্দ করেন না। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا ۖ إِنَّكَ لَنْ تَخْرِقَ الْأَرْضَ وَلَنْ تَبْلُغَ الْجِبَالَ طُولًا
‘পৃথিবীতে দম্ভভরে চলাফেরা করো না; তুমি কখনোই জমিন বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় পাহাড়ের সমান পৌঁছাতে পারবে না।’ (সুরা বনী-ইসরাঈল: আয়াত ৩৭)
কুরআনে আরও এসেছে—
وَلَا تُصَعِّرْ خَدَّكَ لِلنَّاسِ وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا ۖ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ
‘অহংকারবশত মানুষকে অবজ্ঞা করো না এবং পৃথিবীতে গর্বভরে চলাফেরা করো না; নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না।’ (সুরা লুকমান: আয়াত ১৮)
অন্যদিকে অহংকার ধীরে ধীরে মানুষের ধ্বংস ডেকে আনে। হাদিসে পাকে এসেছে—
ثَلَاثٌ مُنْجِيَاتٌ وَثَلَاثٌ مُهْلِكَاتٌ...
‘তিনটি জিনিস মুক্তিদায়ক এবং তিনটি ধ্বংসকারী। মুক্তিদায়ক— ১. প্রকাশ্যে ও গোপনে আল্লাহকে ভয় করা; ২. সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টি উভয় অবস্থায় ন্যায় কথা বলা; ৩. ধনী-গরিব সব অবস্থায় মধ্যপন্থা অবলম্বন করা। ধ্বংসকারী— ১. প্রবৃত্তির অনুসরণ; ২. লোভ-লালসা; ৩. নিজের প্রতি আত্মমুগ্ধতা বা অহংকার।’ (মেশকাতুল মাসাবিহ ৫১২২)
এ ক্ষেত্রে অহংকারের ভয়াবহ পরিণামের কথাও হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। বলা হয়েছে—
لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ كِبْرٍ
‘যার অন্তরে অণুপরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। প্রশ্ন করা হলো— সুন্দর পোশাক ও জুতা পছন্দ করাও কি অহংকার?
নবী (সা.) বললেন— ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন। অহংকার হলো সত্যকে অস্বীকার করা এবং মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করা।’ মুসলিম ১৬৬)
অন্যদিকে কিয়ামতের দিন অহংকারীদের জন্য রয়েছে চরম অপমানজনক পরিণতি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
يُحْشَرُ الْمُتَكَبِّرُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَمْثَالَ الذَّرِّ فِي صُوَرِ الرِّجَالِ...
‘কিয়ামতের দিন অহংকারীদের মানুষ আকৃতিতে পিঁপড়ার মতো ক্ষুদ্র করে একত্রিত করা হবে। চারদিক থেকে লাঞ্ছনা তাদের ঘিরে ধরবে। তাদের জাহান্নামের ‘বূলাছ’ নামক কারাগারে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে প্রখর আগুন তাদের গ্রাস করবে এবং জাহান্নামিদের পুঁজ-রক্ত পান করানো হবে।’ (তিরমিজি ২৪৯৪)
অহংকার এমন এক মারাত্মক দোষ, যা মানুষকে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত করে এবং আখিরাতে ভয়াবহ শাস্তির দিকে নিয়ে যায়। তাই প্রতিটি মুমিনের উচিত নিজের অন্তরকে অহংকারমুক্ত রাখা এবং বিনয় ও নম্রতার মাধ্যমে জীবন গঠন করা। মনে রাখতে হবে, প্রকৃত সম্মান ও মর্যাদা কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে— অহংকার থেকে নয়।