মানুষের জীবন এক নিরন্তর সংগ্রামের নাম, যেখানে সুখ-দুঃখ ছায়ার মতো একে অপরের অনুগামী। সুখ ও দুঃখ, মিলন ও বিচ্ছেদ, সহজ অবস্থা ও কঠিন অবস্থা এবং অসুস্থতা ও সুস্থতা ইত্যাদি নিয়েই মানুষের জীবন।
জীবনের কোনো কোনো মুহূর্তে মানুষকে দুশ্চিন্তা ঘিরে ধরে। হৃদয়ে জমে থাকা দুঃখগুলো যেমন মানুষের টুঁটি চেপে ধরে রাখে, যা মানুষের দুশ্চিন্তাকে আরো বাড়িয়ে দেয়।
দুশ্চিন্তা যখন মানুষের মনে জেঁকে বসে, তখন তার জীবন বিষাদময় হয়ে ওঠে। সে দিনের আলোকেও অন্ধকার দেখে, তার ক্ষুধা ও তৃষ্ণা লোপ পায় এবং রাতের দীর্ঘ নীরবতা তার কাছে অসহ্য মনে হয়। এটি মানুষের জীবনীশক্তি কমিয়ে দেয় এবং অকাল বার্ধক্যের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
দুশ্চিন্তার নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে ধারণা দিতে গিয়ে আলী (রা.) বলেন, ‘তোমার প্রতিপালকের সৃষ্টির মধ্যে ১০টি জিনিস সবচেয়ে শক্তিশালী, পর্বত; আর লোহা পর্বতকে খোদাই করে।
আগুন লোহাকে গ্রাস করে। পানি আগুনকে নিভিয়ে দেয়। আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানে নিয়ন্ত্রিত মেঘ পানি বহন করে। বাতাস মেঘকে বহন করে।
মানুষ তার হাত দিয়ে বাতাস থেকে আত্মরক্ষা করে এবং প্রয়োজন পূরণে তার মধ্যেই চলাফেরা করে। নেশা মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। ঘুম নেশার ওপর প্রাধান্য পায়। আর দুশ্চিন্তা ঘুমকে বাধা দেয়। সুতরাং তোমার প্রতিপালকের সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হলো দুশ্চিন্তা।
(মুজামুল আউসাত)
দুশ্চিন্তা মানবীয় বৈশিষ্ট্য। তাই যে কারো মধ্যে দুশ্চিন্তা আসা স্বাভাবিক। আল্লাহর প্রিয় নবীদের জীবনেও কখনো কখনো এসেছিল। আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর উম্মতের বিমুখতায় ব্যথিত হতেন, তখন আল্লাহ তাঁকে সান্ত্বনা দিতেন। নবী ইয়াকুব (আ.) তাঁর পুত্র ইউসুফ (আ.)-এর বিরহে কেঁদে কেঁদে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি আল্লাহর ওপর আশা হারাননি; বরং আল্লাহর ওপর আস্থা রেখেছেন, আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়েছেন। তাই মুমিনের উচিত দুশ্চিন্তা জেঁকে বসলে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া। নিম্নে দুশ্চিন্তার সময় করণীয় কিছু কাজ তুলে ধরা হলো—
ঈমান ও তাকওয়া : যে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও তাকওয়া অবলম্বন করে, মহান আল্লাহ তাকে যেকোনো সমস্যা থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য (সমস্যা থেকে উত্তরণের) কোনো না কোনো পথ বের করে দেবেন।’ (সুরা : তালাক, আয়াত : ২)
তা ছাড়া কেউ আল্লাহর ওপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখলে, তার ওপর দুশ্চিন্তা খুব বেশি প্রভাব বিস্তার করতে পারে না, কারণ সে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে, মহান আল্লাহ তার জন্য অকল্যাণকর কিছু করবেন না।
অধিক হারে দরুদ পাঠ : মহানবী (সা.)-এর ওপর দরুদ পাঠ করা দুশ্চিন্তা দূর করার শ্রেষ্ঠ মলম। উবাই ইবনে কাআব (রা.) একবার মহানবী (সা.)-কে তাঁর অধিক হারে দরুদ পাঠের আমলের ব্যাপারে অবহিত করলে মহানবী (সা.) বলেন, ‘তোমার চিন্তা ও কষ্টের জন্য তা যথেষ্ট হবে এবং তোমার পাপসমূহ ক্ষমা করা হবে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৪৫৭)
দোয়া ও ইস্তিগফার : বিপদের সময় আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করা এবং নির্দিষ্ট দোয়া করাও কার্যকর আমল। আমাদের মহানবী (সা.)-ও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতেন। তিনি দোয়া করতেন—‘হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই—দুশ্চিন্তা, পেরেশানি, অক্ষমতা, অলসতা, কাপুরুষতা, কৃপণতা, ঋণভার ও মানুষের প্রভাবাধীন হওয়া থেকে।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৩৬৯)
আখিরাতকে প্রধান লক্ষ্য বানানো : যার প্রধান চিন্তা হয় পরকাল, আল্লাহ তার অন্তরে অভাবহীনতা দান করেন এবং দুনিয়া তার কাছে তুচ্ছ হয়ে ধরা দেয়। কিন্তু এর বিপরীত হলে আল্লাহ সেই ব্যক্তির জন্য দুনিয়া সংকীর্ণ করে দেন। (বিস্তারিত জানতে দেখুন—তিরমিজি, হাদিস : ২৪৬৫)
যা আছে তা নিয়ে তুষ্ট থাকা : একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত আবু জর (রা.)-কে বলেন, আবু জর, তুমি কি সম্পদের প্রাচুর্যকেই সচ্ছলতা মনে করো? আবু জর (রা.) বলেন, হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসুল। রাসুলুল্লাহ (সা.) এরপর বলেন, তাহলে তুমি সম্পদের স্বল্পতাকে দারিদ্র্য মনে করো? তিনি বলেন, হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসুল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আসলে সচ্ছলতা তো হৃদয়ের সচ্ছলতাই, আর হৃদয়ের দারিদ্র্যই আসল দারিদ্র্য। (ইবনে হিব্বান : ৬৮৫)
তাই মুমিনের উচিত যা আছে তাতে সন্তুষ্ট থাকা। সর্বাবস্থায় আল্লাহর শোকর আদায় করা। ইনশাআল্লাহ, মহান আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে এর প্রতিদান দেবেন। সূত্র: কালের কণ্ঠ