শিরোনাম

প্রকাশিত : ০৪ মে, ২০২৩, ১২:১৯ দুপুর
আপডেট : ০৪ মে, ২০২৩, ১২:১৯ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

দেশের অর্থনীতির নতুন অগ্রযাত্রা শুরু হবে মাতারবাড়ী গভীর সমুন্দ্রবন্দর থেকে : আহমদ আল কবির

আহমদ আল কবির

ভূঁইয়া আশিক রহমান: [২] রূপালী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ড. আহমদ আল কবির বলেছেন, জাপান বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধু। বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে জাপান আমাদের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রায় সকল সময়ে বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা করেছে। জাপান আমাদের যেসব অর্থ ঋণ হিসেবে দিয়েছিলো, এর বেশির ভাগ ঋণই দ্যাট রিলিফ ফান্ডের আওতায় মাফ করে দিয়েছে। বাংলাদেশ পে করেছে ঠিকই, তবে পাশাপাশি জেডিটিএফ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য ফেরতও দিয়ে দিয়েছে। জাপানের অর্থায়নে আমাদের দেশে যেসব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে, সবগুলো অনেক বেশি সফল হয়েছে। 

[৩] তিনি বলেন, মাতারবাড়ীতে জাপান গভীর সমুন্দ বন্দর নির্মাণ করছে। সেখানে এখন ব্যাপক কর্মকাণ্ড চলছে। এই কাজগুলো আগামী দিনে আমাদের অর্থনীতি একটা বিরাট অবস্থান তৈরি করবে। খুব সম্প্রতি আমাদের প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা জাপান সফরে গিয়েছিলেন। সেখানে ৮টি বড় চুক্তির পাশাপাশি প্রায় এগোরোটির মতো এমইউ সাইনিং হয়েছে। এর সবগুলোই আগামীতে জাপানের বাংলাদেশে বিনিয়োগের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে। 

[৩] জাপানের মতো দেশের বিনিয়োগ যখন আমাদের দেশে আসে, তাতে দুটি জিনিস আমরা পাই। একটা হচ্ছে, আর্থিক সহযোগিতা। দ্বিতীয় হচ্ছে, তাদের দক্ষ কারিগরি সহযোগিতা পেয়ে থাকি আমরা। এ কাজগুলো বাস্তবায়নও হয় সময়মতো। সময়মতো কাজ শেষ করার জন্য বিশে^ জাপানিরা উদাহরণীয়। বাংলাদেশেও জাপানিরা যেসব কাজ সম্পাদন করেছেন, এতে দেখা যাচ্ছেÑ সময়মতো কাজ করেছেন।

কাজ যেন সময়মতো শেষ হয়, সেজন্য তারা কঠোরভাবে নজর রাখেন কোলাবরেশনের মাধ্যমে। প্রকল্পের নির্ধারিত অর্থ পুরো ব্যয় না হলে সেই টাকা ফেরতও দিচ্ছেন তারা! যখন যেসব কারিগরি সহযোগিতা প্রয়োজন হয়, সেসবও দেন। প্রযুক্তি ও দক্ষতাও বিনিময় করছেন, এতে আমাদের অনেক বেশি উপকারে আসছে। অনেক বেশি কাজে দিচ্ছে। অন্য কোনো ডোনাররা এভাবে কাজ করেন না আমাদের দেশে। 

[৫] মাতারবাড়ীর গভীর সমুন্দ্র বন্দর, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বা অন্য যেসব কাজ জাপানিরা বাংলাদেশে করছেন, তা সময়মতো শেষ করার জন্য তারা খুবই সিরিয়াস। আমার বিশ্বাস, এসব কাজ তারা সময়তোই শেষ করবেন। আমাদের অর্থনীতির যে নতুন অগ্রযাত্রা, এই মাতারবাড়ী থেকেই শুরু হবে। মাতারবাড়ী প্রকল্প অর্থনৈতিকভাবে একটা নতুন পর্যায়ে নিয়ে যাবে বাংলাদেশকে। আমরা যদি এ ধরনের সহযোগিতার হাত ধরে রাখতে পারি, তাহলে আমাদের অর্থনীতির চিত্র পাল্টে যাবে। 

[৬] জাপানিরা নারায়নগঞ্জের আড়াই হাজারে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন করছেন। জাপানের বিনিয়োগকারীরা সেখানে বিনিয়োগ করার জন্য খুবই উদগ্রীব হয়ে আছেন। তারা যদি বিনিয়োগে আসেন, তাহলে আমাদের পণ্যের ডাইভারফিকেশন হবে। আমাদের নতুন নতুন পণ্য এশিয়া কিংবা বিশে^র বিভিন্ন বাজারে নিয়ে যেতে পারবো আমরা। আমার বিশ্বাস, নারায়নগঞ্জের এই বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল খুব শিগগিরই তার পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে। কারণ আমি আগেই বলেছি, জাপানিরা সময়মতো সব কাজ শেষ করেন। করতে পছন্দ করেন। ফলে এই শিল্পাঞ্চলটিও সময়মতো কাজ সম্পন্ন করে কার্যক্রমে যেতে পারবে। এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে যদি আমাদের স্থানীয় উদ্যোক্তারাও সহযোগী হিসেবে কাজ করেন, তাতে আমাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। এ দেশেও জাপানি টেকনোলজি ট্রান্সফার হবে। 

[৭] বাংলাদেশ কাজ করছে কিছু সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যকে সামনে রেখে। ২০৩১ সালের মধ্যে আমরা একটা পূর্ণাঙ্গ মধ্যম আয়ের দেশে চলে যাবো। ২০৪১ সালে উন্নত দেশে পৌঁছানোর লক্ষ্য নিয়েই কাজ করছি। এতে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো আমাদের আশার সঞ্চার করেছে। আমরা দেখেছি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সফরে সময় বিশ্বব্যাংক বড় ধরনের সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ^ব্যাংকের ঋণগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ আমাদের জন্য। কারণ এর মধ্যদিয়ে আমাদের উন্নয়নের গতি আরও ত্বরান্বিত হবে। 

[৮] আমাদের উন্নয়ন গতি নিয়ে কিছু মানুষের মধ্যে সংশয় কাজ করছিলো, অর্থনীতিবিদদের অনেকেই মনে করছিলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা বড় বড় সংকেটর সময় হয়তো কিছুটা মন্থর হয়ে যাবে, এ আশঙ্কার এখন আর বাস্তবতা নেই। আমাদের অর্থনীতি মন্থর হবে না। কারণ প্রতি বছর প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের ওপরে বাংলাদেশকে সহায়তা দেবে বিশ্বব্যাংক। এর বাইরেও অনেকগুলো প্রজেক্ট হাতে নেওয়া হয়েছে। 

[৯] বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতা নিয়ে বিশ্বের কেউ বড় ধরনের কোনো বিপদে পড়েনি। যেসব দেশ অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে, তারা বিশে^র অন্যান্য দেশের অর্থ বেশি সুদ নিয়েছিলো। ফলে তারা বিপদে পড়েছিলো। অনেক দেশই কিছু দেশের ঋণের ফাঁদে পড়েছে। কিন্তু বিশ্ব ব্যাংকের ঋণ নিয়ে কেউ বিপদে পড়েনি। কারণ অধিকাংশ ঋণ সহায়তাই কম সুদের। কিছু ঋণ অনেক বেশি দেরিতে দেওয়া শুরু হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ১ শতাংশ বা তারও নীচে ঋণের সুদ হার। 

[১০] বাংলাদেশের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রার একটা রূপরেখা বা বাস্তব পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আমাদের একটা সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাচ্ছে। জাপানিদের সহায়তা অথবা অন্যদের সহায়তা নিয়ে যে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হচ্ছে এখন দেশে, এর বেশির ভাগই অবকাঠামো খাতে। সব প্রকল্প চালু হলে আমাদের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রা আরও বেগবান হবে। 

[১১] উন্নয়নশীল বিশ্ব ও উন্নয়নগামী বিশ্ব সকলেই করোনা ও ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের পরিস্থিতির শিকার। করোনার সময় বেশির ভাগ দেশ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক দেশের প্রবৃদ্ধি কমেছে। ভারত ও চীনের মতো শক্তিশালী অর্থনৈতিক দেশ, ইউরোপের প্রায় প্রতিটি দেশই করোনায় দারুণভাবে প্রভাবিত হয়েছে। বাস্তব বিশ্ব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আমাদের অর্থনৈতিক পলিসি নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশ্বের প্রতিটি দেশও তা করেছে। আমরা আমাদের পলিসি অনুযায়ী চলতে পারলে আমাদের অর্থনীতির গতি কেউ দাবিয়ে রাখতে পারবে না। 

[১২] বিশ^ব্যাপী উৎপাদন কমে গেছে। মানুষের মোবিলিটি নষ্ট হয়ে গেছে। এই মোবিলিটির মাধ্যমেই ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালিত হয়। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ বিশ্ব পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেন-রাশিয়া খাদ্য ও তেলসমৃদ্ধ দেশ। খাদ্য উৎপাদনেও তারা শীর্ষ দেশ। বিশ্বকে দারুণভাবে খাদ্য সরবরাহ করে আসছিলো। তেলের বাণিজ্যে তারা একটা মুখ্য ভূমিকা পালন করছিলো। করোনা সংকটের সঙ্গে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ যোগ হয়ে বিশ্ব পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করে ফেলেছে। 

[১৩] সার্বিকভাবে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা হলেও স্বস্তির মধ্যে আছে। কারণ করোনার সময়টা কঠিন গেলেও আমাদের অর্থনীতি ভালো ছিলো। আমাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি অনেক মজবুত। প্রবৃদ্ধিও পজেটিভ রাখতে সক্ষম হয়েছিলাম আমরা। এশিয়া ও ইউরোপের অনেক দেশ তখন নেগেটিভ প্রবৃদ্ধিতে চলে গিয়েছিলো। করোনার মধ্যেও বাংলাদেশের আমদানি কমেনি। রেমিটেন্স প্রবাহও কমেনি। সার্বিকভাবে অর্থনৈতিক কার্যক্রমও মোটামুটিভাবে সফলভাবে ব্যবস্থাপনা করে কঠিন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ পেয়েছি। 

[১৪] ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্ব টালমাটাল। কে কোন দিকে যাবে, কাকে সমর্থন দেবেÑ এ নিয়ে চলছে নানান রাজনীতি। এই কঠিন পরিস্থিতিতেও আমরা অনেকটা স্বস্তির মধ্যে আছি। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী তেলের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। এতে হয়তো এখন আমরা বড় রকমের ক্ষতির শিকার হবো না।

তবে দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতির আশঙ্কা আছে। খাদ্যে আমরা অনেকটা স্বয়ংসম্পন্ন হলেও আমদানিও করি অনেক পণ্য। আমাদের আমদানি পণ্যের মধ্যে গম ও তেল অন্যতম। এই খাদ্যপণ্য আসতো বেশির ভাগই ইউক্রেন ও রাশিয়া থেকে। ভারত থেকেও আমরা গম আমদানি করি। কিন্তু আমদানি ব্যবস্থাপনায় বিঘ্ন ঘটায় দেশে খাদ্য সরবরাহে সমস্যা দিয়েছে। এর ফলে খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। 

[১৫] আগামী বাজেটে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে খাদ্য ব্যবস্থাপনা। খাদ্যপণ্য ব্যবস্থাপনায় যেন আমরা সামাল দিতে পারি। খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবে। বিদেশের বাজারে খাদ্যপণ্য সহজতর হবে না, পাওয়ার সম্ভাবনা কমে আসছে দিন দিন। বিশ্বের প্রতিটি দেশকেই খাদ্যপণ্য ব্যবস্থাপনায় প্রস্তুতি নিতে হবে। খাদ্যমজুত ভান্ডার গড়ে তুলতে হবে। একদিকে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবে, অপর দিকে খাদ্যমজুত ভান্ডারকে অনেক শক্তিশালী করতে হবে।

[১৬] মুদ্রাস্ফীতি যেন সহনশীল পরিস্থিতিতে রাখা যায়, এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ হবে বাজেট প্রণয়নের সময়। এখনো পর্যন্ত আমরা মোটামুটি সামালভাবে দিয়ে আসছি। বিশ্ব কঠিন পরিস্থিতি আমরাও সামাল দিয়ে চলছি। বিশ^ পরিস্থিতি খারাপ হলে তা সামাল দেওয়ার প্রস্তুতি এখনই গ্রহণ করতে হবে। কিছু কিছু কৃচ্ছ্রতা সাধনও করতে হবে। 

ভিএআর/এএ

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়