শিরোনাম
◈ গুম হওয়া ২৫০ জনের সন্ধান মেলেনি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে অপহরণের প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে: চিফ প্রসিকিউটর ◈ দুই ডিআইজিসহ পুলিশের ১৭ কর্মকর্তা বদলি ◈ চেয়ার-সোফার পেছনে জাতীয় পতাকা প্রদর্শন নয়: হাইকোর্টের নির্দেশ ◈ মহানবী (সা.)-এর আদর্শ তরুণদের জন্য হতে পারে প্রেরণার উৎস: প্রধানমন্ত্রী ◈ ভারত-বাংলাদেশ গঙ্গা চুক্তি পর্যালোচনার আগে কেন সরব বিহার? ◈ যেভাবে শিক্ষক পরিবারের চারজনকে হত্যা করে ডাকাতির নাটক সাজায় দুই যুবক ◈ ‘দলগুলোর সদিচ্ছা থাকলে সহিংসতামুক্ত স্থানীয় নির্বাচন সম্ভব’ ◈ হাসিনাকে ঘিরে আটকে আছে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক স্বাভাবিকের উদ্যোগ, অচলাবস্থা কাটবে কীভাবে? ◈ স্বামীর করা যৌতুক মামলায় স্ত্রী কারাগারে ◈ হ‌কি বিশ্বকাপ থে‌কে ভারতের বিদায়, ১২ বছর পর সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা 

প্রকাশিত : ২৫ আগস্ট, ২০২৬, ০৭:১১ বিকাল
আপডেট : ২৫ আগস্ট, ২০২৬, ০৭:৫৯ বিকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

ভারত-বাংলাদেশ গঙ্গা চুক্তি পর্যালোচনার আগে কেন সরব বিহার?

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে এ বছরের ১২ ডিসেম্বর। এই চুক্তি অনুসারেই ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজ দিয়ে পানিবণ্টনের বিষয়টি নিয়ন্ত্রিত হয়। মূলত শুষ্ক মৌসুমে, ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত পানি ভাগাভাগির জন্য এই চুক্তি করা হয়েছিল।

১৯৯৬ সালে নয়াদিল্লিতে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবগৌড়া ও বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চুক্তিতে সই করেন। তখন দুই দেশের দীর্ঘদিনের অন্যতম জটিল পানি বিরোধের একটি সমাধান হিসেবে দেখা হয়েছিল এই চুক্তিকে।

তবে তিন দশক পর পরিস্থিতি বদলেছে। ভারতের বিহার রাজ্য এখন এই চুক্তিকে কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখছে না। রাজ্যটির রাজনৈতিক নেতৃত্বের একাংশের অভিযোগ, ফারাক্কা ও গঙ্গার পানি ব্যবস্থাপনার কারণে বিহারে পানি সংকট, নদীতে পলি জমা ও বন্যার সমস্যা বেড়েছে।

৩০ বছরের তথ্য পর্যালোচনার দাবি বিহারের: বিহারের জনতা দল-ইউনাইটেডের (জেডিইউ) কার্যকরী সভাপতি ও রাজ্যসভার সদস্য সঞ্জয় ঝা এ বিষয়ে সবচেয়ে সরব। তিনি চুক্তিটি বর্তমান কাঠামোয় নবায়ন না করার জন্য ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

সঞ্জয় ঝার যুক্তি, ১৯৯৬ সালে চুক্তি করার সময় বিহারের স্বার্থ যথেষ্ট বিবেচনা করা হয়নি। তিনি গত ৩০ বছরের তথ্য পর্যালোচনা করে কী পাওয়া গেছে আর কী হারানো হয়েছে, তা হিসাব করার দাবি জানিয়েছেন।

তার বক্তব্য, চুক্তির ফলে বিহারের যে ক্ষতি হয়েছে, তার হিসাবও করা প্রয়োজন। সঞ্জয় ঝা আরও দাবি করেছেন, বিহারের জন্য প্রাপ্য পানির বড় একটি অংশ বাংলাদেশে চলে যাচ্ছে।

বিহারের রাজনীতিতে এই দাবি এখন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

ফারাক্কায় কীভাবে ভাগ হয় গঙ্গার পানি: ১৯৯৬ সালের চুক্তির মূল বিষয় হলো ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ফারাক্কায় গঙ্গার প্রবাহের ভিত্তিতে পানি ভাগ করা। ফারাক্কায় প্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেক বা তার কম হলে ভারত ও বাংলাদেশ সমানভাবে পানি পাবে।

প্রবাহ ৭০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার কিউসেকের মধ্যে হলে বাংলাদেশ পাবে ৩৫ হাজার কিউসেক। বাকি পানি পাবে ভারত।

আর প্রবাহ ৭৫ হাজার কিউসেক বা তার বেশি হলে ভারত পাবে ৪০ হাজার কিউসেক। অবশিষ্ট পানি যাবে বাংলাদেশে।

চুক্তিতে মার্চের ১১ তারিখ থেকে মে মাসের ১০ তারিখ পর্যন্ত বিশেষ ব্যবস্থাও রয়েছে। এই সময়ে পালাক্রমে তিনটি ১০ দিনের মেয়াদে দুই দেশই ৩৫ হাজার কিউসেক করে পানি পাওয়ার নিশ্চয়তা পায়।

বাংলাদেশের জন্য শুষ্ক মৌসুমে এই পানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি, মৎস্য, নৌ চলাচল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশের ওপর এর সরাসরি প্রভাব রয়েছে।

অন্যদিকে, ভারতের লক্ষ্য ছিল গঙ্গার পানির একটি অংশ হুগলি নদী ব্যবস্থায় ধরে রেখে কলকাতা বন্দরের নৌ চলাচল ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটানো।

বিহারের আপত্তি কোথায়: বিহারের মূল প্রশ্ন হলো, পানি ভাগের হিসাব করার সময় রাজ্যটির নিজস্ব প্রয়োজন কতটা বিবেচনা করা হয়েছে। সঞ্জয় ঝার বক্তব্য, চুক্তির কারণে শুষ্ক মৌসুমে বিহারে পানির সংকট তৈরি হচ্ছে।

গঙ্গার পানি বিহারে পানীয় জল, সেচ ও কৃষির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সঞ্জয়ের মতে, ১৯৯৬ সালের পরিস্থিতি দিয়ে ২০২৬ সালের পানির চাহিদা নির্ধারণ করা যায় না।

বিহারের জনসংখ্যা বেড়েছে। কৃষি ও শিল্পের পানির চাহিদাও বেড়েছে। তাই নতুন করে বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে বিহারসহ গঙ্গা অববাহিকার সব রাজ্যের পানির প্রয়োজন নির্ধারণ করতে হবে।

বিহারের রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রশ্ন, ভারতের একটি আন্তর্জাতিক পানিচুক্তি নবায়নের আগে দেশটির ভেতরের সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলোর পানির প্রয়োজন কেন হিসাব করা হবে না।

পানি সংকটের পাশাপাশি বন্যার অভিযোগ: বিহারের আপত্তি শুধু শুষ্ক মৌসুমের পানির হিসাব নিয়ে নয়। ফারাক্কা ব্যারাজ ও নদী ব্যবস্থাপনার কারণে গঙ্গায় পলি জমার পরিমাণ বেড়েছে—এমন অভিযোগও দীর্ঘদিনের।

বিহারের রাজনৈতিক নেতৃত্বের দাবি, নদীতে অতিরিক্ত পলি জমায় গঙ্গার পানি ধারণের ক্ষমতা কমেছে। এর ফলে বর্ষায় নদীর পানি আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।

একদিকে শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট। অন্যদিকে বর্ষায় ভয়াবহ বন্যা। বিহারের কাছে এটিই বড় একটি বৈপরীত্য।

সঞ্জয় ঝার বক্তব্য, আগে নদীতে বেশি পানি ধরে রাখা যেত। পলি জমে সেই ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ায় বর্ষার পানি সহজেই আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে।

বিহার সরকারও সরব: বিহারের উপমুখ্যমন্ত্রী ও পানি সম্পদমন্ত্রী বিজয় কুমার চৌধুরীও ফারাক্কা নিয়ে রাজ্যের পুরোনো উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। চুক্তি নবায়নের আলোচনায় বিষয়টি তোলা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠকের পর বিজয় চৌধুরী বলেন, কেন্দ্র বিহারের উদ্বেগের বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে।

বিহারের বিরোধী দল আরজেডিও বিষয়টি সামনে আনছে। দলের বক্সার আসনের লোকসভা সদস্য সুধাকর সিং রাজ্যের পানিসম্পদ বিভাগের তথ্য তুলে ধরে দাবি করেছেন, ফেব্রুয়ারি, মার্চ ও এপ্রিলে পরিকল্পিত পানির তুলনায় ঘাটতি ছিল।

তার দাবি, নতুন ব্যবস্থায় বিহারের পানি, সেচ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নৌ চলাচলের স্বার্থকে গুরুত্ব দিতে হবে।

বাংলাদেশের ওপর কী প্রভাব পড়বে?
এখানেই বিষয়টি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে বাংলাদেশ-ভারত কূটনীতিতে চলে আসে।

গঙ্গা একটি আন্তঃসীমান্ত নদী। বাংলাদেশ এই নদীর নিম্ন অববাহিকায় অবস্থিত।

শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানির প্রবাহ বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি ও মৎস্যের পাশাপাশি নৌ চলাচল এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী ও পরিবেশের ওপর এর প্রভাব রয়েছে।

১৯৯৬ সালের চুক্তি কয়েক দশকের আলোচনার পর হয়েছিল। এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল দুই দেশের জন্য পানির প্রবাহে পূর্বানুমানযোগ্যতা তৈরি করা।

তাই বিহারের দাবি মেনে ভারতের অভ্যন্তরীণ পানি ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা হলেও তার প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়বে।

চুক্তির কোনো পরিবর্তন তাই শুধু বিহারের পানি সংকটের সমাধান নয়। এটি বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক চুক্তির ভবিষ্যৎও নির্ধারণ করবে।

১৯৯৬ সালের হিসাব কি এখনো কার্যকর?
গঙ্গার পানির বাস্তবতাও গত ৩০ বছরে বদলেছে। ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে ১৯৪৯ থেকে ১৯৮৮ সালের ঐতিহাসিক প্রবাহের তথ্য বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল।

এরপর জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, পানির চাহিদা বৃদ্ধি ও চরম আবহাওয়ার ঘটনা বেড়েছে। নদীতে পলি জমার সমস্যাও নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।

ভারত ও বাংলাদেশের উভয় দেশেই জনসংখ্যা, কৃষি ও শিল্পের পানির চাহিদা বদলেছে। এ কারণে বিতর্কটি এখন শুধু চুক্তি নবায়ন হবে কি না—সেই প্রশ্নে আটকে নেই।

মূল প্রশ্ন হয়ে উঠেছে, ২০২৬ সালের পর নতুন গঙ্গা চুক্তির কাঠামো কেমন হবে।

বিহার কী চায়: বিহারের দাবি মূলত আলোচনার টেবিলে নিজেদের জায়গা নিশ্চিত করা। রাজ্যটি চায়, বাংলাদেশকে পানি দেওয়ার আগে গঙ্গা অববাহিকার ভারতীয় রাজ্যগুলোর বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পানির চাহিদা বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারণ করা হোক।

ফারাক্কার প্রভাবও নতুন করে মূল্যায়ন করতে চায় বিহার। এর মধ্যে রয়েছে পলি জমা, বন্যা, নদীভাঙন, সেচ, পানীয় জল ও নৌ চলাচল।

বিহারের কিছু রাজনৈতিক নেতা শুধু পানিবণ্টন নয়, গঙ্গায় সারা বছর নৌ চলাচলেরও সুযোগ চান। জাতীয় জলপথ-১–এর নাব্যতা বাড়ানো, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন ঠেকানো এবং গঙ্গার তীরবর্তী অবকাঠামো উন্নয়নের দাবিও উঠছে।

ভারতের সামনে কঠিন সমীকরণ: গঙ্গা চুক্তি নবায়নের সময় ভারতের সামনে একসঙ্গে কয়েকটি স্বার্থ সামলানোর চ্যালেঞ্জ থাকবে।

একদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখা। অন্যদিকে বিহারের দীর্ঘদিনের পানি–সংকট ও বন্যার অভিযোগের সমাধান করা। এর সঙ্গে রয়েছে ভারতের অন্যান্য গঙ্গা অববাহিকার রাজ্যের পানির প্রয়োজন।

তাই ২০২৬ সালের গঙ্গা চুক্তি শুধু বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পানি ভাগাভাগির বিষয় থাকবে না। এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, নদী ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক কূটনীতিরও বড় পরীক্ষা হতে পারে। সূত্র: নিউজ১৮

  • সর্বশেষ