মুসলিম ডিকোড: বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে আমেরিকাকে ইরানের সাথে একটি বিধ্বংসী যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়ার পেছনে শক্তিশালী কিছু অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক প্রভাব কাজ করছে। এই যুদ্ধ কেবল একটি সামরিক সংঘাত নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ এবং মার্কিন সামরিক বাহিনীর 'হিউব্রিস' বা অতি-অহংকার।
যুদ্ধের নেপথ্যে সক্রিয় শক্তিসমূহ উৎস অনুযায়ী, তিনটি প্রধান গোষ্ঠী আমেরিকাকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্ররোচিত করছে:
ইসরায়েল লবি: বিশেষ করে এআইপিসি (AIPAC) এবং খ্রিস্টান জায়নিস্টরা মার্কিন সরকারের ওপর বিশাল প্রভাব খাটায়।
অর্থনৈতিক স্বার্থ: ওয়াল স্ট্রিট এবং মার্কিন সাম্রাজ্য বিস্তারের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের নেশা।
সৌদি আরব: যারা ইরানকে তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি মনে করে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ইরানের সাথে পারমাণবিক চুক্তি বাতিল এবং জেনারেল কাসেম সোলাইমানীকে হত্যার মাধ্যমে এই প্রভাবের প্রতিফলন দেখা গেছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর 'হিউব্রিস' বা অতি-অহংকার ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের তথাকথিত সাফল্যের পর মার্কিন সেনাবাহিনী প্রথাগত যুদ্ধনীতি (বিশাল সৈন্যবাহিনী ও রসদ সরবরাহ নিশ্চিত করা) বাদ দিয়ে 'শক এন্ড অ' (Shock and Awe) নীতি গ্রহণ করেছে। তাদের ধারণা, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও আকাশপথের আধিপত্য দিয়ে যেকোনো যুদ্ধ জেতা সম্ভব। তবে লোহিত সাগরে হুথিদের দমনে তাদের ব্যর্থতা প্রমাণ করে যে, বর্তমানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা তারা অহংকারের কারণে স্বীকার করতে নারাজ।
যুদ্ধের একটি কাল্পনিক দৃশ্যপট (২০২৭) ভবিষ্যতে ট্রাম্প ক্ষমতায় ফিরলে পাঁচটি অজুহাতে ইরান আক্রমণ করতে পারেন: ইরানে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করা।পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রচেষ্টা ঠেকানো। ৩. বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহ (লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালী) রক্ষা করা। ইসরায়েল ও সৌদি আরবকে রক্ষা করা ৫. সন্ত্রাসবাদে ইরানের মদদ বন্ধ করা।
ইরান কেন একটি 'ফাঁদ' বা দুর্ভেদ্য দুর্গ? উৎস অনুসারে, আমেরিকাকে ইরানের ভেতরে স্থল যুদ্ধে টেনে আনাই ইরানের মূল লক্ষ্য। কিন্তু এই যুদ্ধে আমেরিকার পরাজয় অনিবার্য হওয়ার কারণগুলো হলো: ভৌগোলিক অবস্থান: ইরান একটি পাহাড়ি দেশ যা প্রাকৃতিক দুর্গের মতো। সেখানে ট্যাংক চালানো কঠিন এবং আকাশপথের রসদ সরবরাহ ব্যবস্থা সহজেই ভেঙে দেওয়া সম্ভব।
সৈন্য সংখ্যার ঘাটতি: ৯ কোটি জনসংখ্যার ইরান দখল করতে অন্তত ৩০-৪০ লাখ সৈন্য প্রয়োজন, যেখানে আমেরিকার মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে মাত্র ৬০ হাজার সৈন্য আছে।জনগণের প্রতিরোধ: ১৯৫৩ সালের শাহ শাসন থেকে শুরু করে ইরাক যুদ্ধের ধ্বংসলীলা পর্যন্ত ইতিহাসের কারণে ইরানিরা আমেরিকানদের ঘৃণা করে এবং তারা যেকোনো দখলদারের বিরুদ্ধে ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী চেতনা থেকে লড়াই করবে।
ঐতিহাসিক উদাহরণ ও গেম থিওরি বিশ্লেষণ
অ্যাথেন্সের সিসিলি অভিযান: অতি-অহংকার এবং রসদ সরবরাহের পথ হারিয়ে অ্যাথেন্স যেভাবে ধ্বংস হয়েছিল, আমেরিকার পরিণতিও তেমন হতে পারে।
ভিয়েতনাম যুদ্ধ ও সাংক কস্ট ফ্যালাসি: পরাজয় নিশ্চিত জেনেও মান-সম্মান বাঁচাতে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার যে প্রবণতা আমেরিকাকে ভিয়েতনামে ডুবিয়েছিল, ইরানেও তার পুনরাবৃত্তি ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে।
গেম থিওরি: ইসরায়েল ও সৌদি আরবের জন্য সবচেয়ে লাভজনক পরিস্থিতি হলো যদি আমেরিকা ও ইরান উভয়ই এই যুদ্ধে ধ্বংস হয়ে যায়, যার ফলে ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের একক অধিপতি হয়ে উঠবে।
রাশিয়া ও চীনের ভূমিকা এই যুদ্ধে আমেরিকা ফেঁসে গেলে রাশিয়া ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। পুতিন পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারে বাধা দিয়ে বিশ্বমঞ্চে হিরো হতে চাইবেন, যা আমেরিকাকে একটি প্রথাগত স্থল যুদ্ধে আটকে দেবে। এছাড়া, চীনের তুলনায় আমেরিকার উৎপাদন ক্ষমতা অনেক কম হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে রসদ ও গোলাবারুদ জোগানো আমেরিকার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়বে।
ইরান আক্রমণ করা হবে আমেরিকার জন্য একটি 'ব্ল্যাক হোল' বা কৃষ্ণগহ্বর, যেখান থেকে বের হওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না
। অতি-অহংকার এবং ভুল রণকৌশলের কারণে এই যুদ্ধ মার্কিন সাম্রাজ্যের পতনের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।