কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডিজিটাল নীতিকে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরতে প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ এআই মন্ত্রীর পদ সৃষ্টি করেছে যুক্তরাজ্য। নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নামের মন্ত্রিসভায় এই দায়িত্ব পেয়েছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত লেবার পার্টির সংসদ সদস্য (এমপি) কণিষ্ক নারায়ণ।
সোমবার ঘোষিত নতুন মন্ত্রিসভায় এআই মন্ত্রীর পদকে প্রথমবারের মতো ক্যাবিনেট পর্যায়ের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রযুক্তি ও ডিজিটাল রূপান্তরকে সরকারের কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণে আরও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে নতুন প্রশাসন।
এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সরকারের অধীনে বিজ্ঞান, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে ‘এআই ও অনলাইন নিরাপত্তা’ বিষয়ক জুনিয়র মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন কণিষ্ক নারায়ণ।
২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে ওয়েলসের ভেল অব গ্ল্যামারগন আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে হাউস অব কমন্সে প্রবেশ করেন তিনি। একই সঙ্গে ওয়েলসের ইতিহাসে প্রথম সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে এমপি নির্বাচিত হওয়ার কৃতিত্বও অর্জন করেন এই লেবার রাজনীতিক।
বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, ভারতের বিহারে জন্ম নেওয়া কণিষ্ক নারায়ণ শৈশবে পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের কার্ডিফে চলে যান। পরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি (পিপিই) বিষয়ে স্নাতক এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন।
রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার পর ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি যুক্তরাজ্যের পরিবেশ, খাদ্য ও গ্রামীণ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পার্লামেন্টারি প্রাইভেট সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর স্টারমার সরকারের বিজ্ঞান, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে এআই ও অনলাইন নিরাপত্তাবিষয়ক জুনিয়র মন্ত্রী হন।
নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নাম মন্ত্রিসভার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন আনলেও কণিষ্ক নারায়ণকে সরকারে রেখে তার দায়িত্বের পরিধি বাড়িয়েছেন। একই সঙ্গে তাকে ক্যাবিনেট মন্ত্রীর মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।
সরকারি দায়িত্বের বাইরেও জননীতি, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং অলাভজনক বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কণিষ্ক। ২০১২ সালে তিনি দক্ষিণ ওয়েলসের তরুণদের শিক্ষা ও সামাজিক অগ্রগতির লক্ষ্যে ‘অ্যাটেইন ওয়েলস’ নামে একটি অলাভজনক কর্মসূচি চালু করেন।
২০১৬ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তিনি অর্থনৈতিক নীতি ও জনসেবা সংস্কারবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন। কোভিড-১৯ মহামারির সময়, ২০২০ সালে স্থানীয় ব্যবসাগুলোকে সহায়তা দিতে ‘হেল্প ইয়োর হাই স্ট্রিট’ নামে একটি জাতীয় প্রচারণাও শুরু করেন।
এ ছাড়া ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে সিটিজেনস অ্যাডভাইস ব্যুরোর ট্রাস্টি এবং যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের পরামর্শক প্যানেলের সদস্য ছিলেন তিনি। ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ‘সেন্টার ফর সিটিজ’-এর ভিজিটিং অ্যাসোসিয়েট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
কণিষ্ক নারায়ণের পদোন্নতির পাশাপাশি প্রশাসনিক কাঠামোতেও বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছে বার্নাম সরকার। বাণিজ্য ও ব্যবসা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বিজ্ঞান, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়কে একীভূত করে জোনাথন রেনল্ডসকে ‘বিজনেস, ইনোভেশন, সায়েন্স অ্যান্ড ট্রেড’ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আওতা বাড়িয়ে সেখানে ডিজিটাল রূপান্তর ও অনলাইন নিরাপত্তা বিষয়ও যুক্ত করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী এআই প্রযুক্তিতে প্রতিযোগিতা তীব্র হয়ে ওঠার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্যের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতেই এআই মন্ত্রীর পদকে ক্যাবিনেট পর্যায়ে উন্নীত করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বর্তমানে যুক্তরাজ্যে গুগলের ডিপমাইন্ডের পাশাপাশি ইলেভেনল্যাবস ও ওয়েভের মতো বৈশ্বিক এআই প্রতিষ্ঠান এবং দক্ষ প্রকৌশলীদের বড় একটি ভিত্তি রয়েছে। তবে উচ্চ বিদ্যুৎ ব্যয়ের কারণে ওপেনএআইয়ের ডেটা সেন্টার নির্মাণ পরিকল্পনা থমকে যাওয়া এবং নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে আগের সরকারের প্রযুক্তিনীতি সমালোচনার মুখে পড়েছিল।
সূত্র : বিবিসি।