মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বাতিলের লক্ষ্যে জারি করা নির্বাহী আদেশ বাতিল করে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট। মঙ্গলবার (৩০ জুন) ‘ট্রাম্প বনাম বারবারা’ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট ৬-৩ ভোটে ট্রাম্পের নীতিটিকে অবৈধ বলে রায় দেন। এর মাধ্যমে আদালত এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে প্রচলিত সেই সাংবিধানিক ব্যাখ্যাই বহাল রাখলেন, যার অধীনে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেয়া প্রায় সবাই দেশটির নাগরিক হিসেবে স্বীকৃত।
সিবিএস নিউজের খবরে বলা হয়, প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস এবং বিচারপতি সোনিয়া সোটোমেয়র, এলেনা কেগান, অ্যামি কোনি ব্যারেট ও কেতানজি ব্রাউন জ্যাকসন একমত হন যে ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ১৪তম সংশোধনী লঙ্ঘন করেছে। বিচারপতি ব্রেট কাভানাও পৃথক মতামতে বলেন, তার মতে আদেশটি ফেডারেল আইনও লঙ্ঘন করেছে। অন্যদিকে বিচারপতি ক্লারেন্স থমাস, স্যামুয়েল আলিটো ও নিল গরসাচ এ রায়ের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন।
এই রায়ের মধ্য দিয়ে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ বাতিল হলো। এর আগে ফেব্রুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্ট তার আরোপ করা বহু শুল্কও বাতিল করেছিলেন। দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফিরে প্রথম দিনই অভিবাসন দমনের অংশ হিসেবে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করার নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছিলেন ট্রাম্প।
সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতে প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস লিখেছেন, ‘নাগরিকত্ব, তখন এবং এখনও অধিকার পাওয়ার অধিকার। আর তা হলো- আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে অবাধে অংশগ্রহণের অধিকার। চতুর্দশ সংশোধনীর প্রণেতারা সেই প্রতিশ্রুতি 'এই দেশের প্রত্যেক স্বাধীনভাবে জন্মগ্রহণকারী ব্যক্তির' জন্য প্রসারিত করেছিলেন। আমরা আজও সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছি।’
বিচারপতি ক্লারেন্স থমাস বলেন, ‘সংখ্যাগরিষ্ঠদের যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্বের ইতিহাস নিয়ে ব্যাখ্যা ঐতিহাসিকভাবে সঠিক নয়। আজ আদালত এক অসাধারণ পদক্ষেপ নিয়ে প্রেসিডেন্টের সেই আদেশকে সাংবিধানিকভাবে অবৈধ ঘোষণা করেছে, যার মাধ্যমে অস্থায়ী বিদেশি দর্শনার্থী ও অবৈধ অভিবাসীদের সন্তানদের নাগরিকত্ব থেকে বাদ দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। এভাবে আদালত ১৪তম সংশোধনীর দুঃখজনক ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যোগ করল। এ সংশোধনী মূলত মুক্তিপ্রাপ্ত কৃষ্ণাঙ্গদের সমান অধিকার নিশ্চিত করার জন্য প্রণীত হয়েছিল, কিন্তু পরে তা এমন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে, যা পুনর্গঠনকালীন কংগ্রেস সমর্থন করেনি।’ এই মন্তব্যের সঙ্গে বিচারপতি নিল গরসাচ একমত হয়েছেন।
কী ছিল ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ
অভিবাসন নীতির অন্যতম প্রধান অংশ হিসেবে ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশে যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে বা অস্থায়ীভাবে অবস্থানরত বাবা-মায়ের ঘরে জন্ম নেয়া শিশুদের স্বয়ংক্রিয় মার্কিন নাগরিকত্ব না দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল। এতে সংবিধানের নাগরিকত্ব ধারার দীর্ঘদিনের ব্যাখ্যা পাল্টে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
তবে ফেডারেল পর্যায়ের প্রতিটি আদালত আদেশটির কার্যকারিতা স্থগিত করে দেয়ায় এটি কখনোই বাস্তবায়িত হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর নাগরিকত্ব ধারায় বলা হয়েছে, ‘যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী বা আইন অনুযায়ী নাগরিকত্বপ্রাপ্ত এবং যুক্তরাষ্ট্রের এখতিয়ারের আওতাভুক্ত সব ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক।’
কংগ্রেস ১৯৪০ সালে জাতীয়তা আইন এবং ১৯৫২ সালে অভিবাসন ও জাতীয়তা আইনের মাধ্যমে এ সাংবিধানিক ভাষাকে ফেডারেল আইনে অন্তর্ভুক্ত করে। ১৮৯৮ সালের একটি ঐতিহাসিক মামলায় সুপ্রিম কোর্ট জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের নীতি বহাল রাখেন। সে সময় বিদেশি কূটনীতিকদের সন্তান, দখলদার বাহিনীর সদস্যদের সন্তান এবং তৎকালীন আইনি কাঠামোয় নেটিভ আমেরিকান জনগোষ্ঠীর সদস্যদের সন্তানদের জন্য কিছু ব্যতিক্রম রাখা হয়েছিল। পরে ১৯২৪ সালে কংগ্রেসের আইনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেয়া সব নেটিভ আমেরিকানকে নাগরিকত্ব দেয়া হয়।
তবে ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশে দীর্ঘদিনের নাগরিকত্বের সংজ্ঞা পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়েছিল। ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তি দেয়, জন্মসূত্রে প্রাপ্ত অবাধ নাগরিকত্ব অবৈধ অভিবাসন এবং ‘বার্থ ট্যুরিজম’-এর জন্য একটি শক্তিশালী প্রণোদনা হিসেবে কাজ করেছে। তাদের মতে, বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে নাগরিকত্ব ধারার ভুল ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে।