শিরোনাম

প্রকাশিত : ১৩ মে, ২০২৬, ০৭:২১ বিকাল
আপডেট : ১৩ মে, ২০২৬, ১১:৩৩ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

আল জাজিরা এক্সপ্লেইনার

ট্রাম্প-শি বৈঠকে বাণিজ্য, তাইওয়ান নাকি ইরান—কোন ইস্যু বেশি গুরুত্বপূর্ণ?

দীর্ঘ কূটনৈতিক টানাপড়েন, বাণিজ্যযুদ্ধ এবং ইরান যুদ্ধের মধ্যেই চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে পৌঁছেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেখানে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং-এর সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বসবেন তিনি।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুই অর্থনীতির এই বৈঠককে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কারণ বাণিজ্য থেকে শুরু করে তাইওয়ান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালি; সবচেয়ে স্পর্শকাতর বৈশ্বিক ইস্যুগুলোই আলোচনার টেবিলে উঠতে যাচ্ছে।

১৪ ও ১৫ মে অনুষ্ঠিতব্য এই বৈঠক হবে ২০১৭ সালের পর ট্রাম্প ও শি-এর প্রথম বৈঠক।

বিশ্লেষকদের মতে, এমন এক সময়ে এই বৈঠক হচ্ছে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক সবচেয়ে জটিল পর্যায়ে রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা, প্রযুক্তিগত আধিপত্য, তাইওয়ান প্রশ্ন এবং ইরান যুদ্ধ নিয়ে উত্তেজনা বাড়ছেই।

মূলত বছরের শুরুতেই এই বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইরান যুদ্ধের কারণে তা পিছিয়ে যায়।

বেইজিং যাওয়ার আগে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, তিনি শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করবেন এবং সেখানে ইরান ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তবে তার ভাষায়, সফরের মূল কেন্দ্রবিন্দু থাকবে বাণিজ্য।

লাইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সালভাদর সান্তিনো রেগিলমে বলেন, বাণিজ্য ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি এমন একটি বিষয়, যা সাধারণ ভোটার সহজে বুঝতে পারে। কিন্তু আসল সংঘাত হলো বৈশ্বিক নেতৃত্ব এবং ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে।

তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এমন এক সম্পর্কে আবদ্ধ যেখানে প্রতিযোগিতা যেমন আছে, তেমনি গভীর অর্থনৈতিক নির্ভরতাও রয়েছে।

তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র এখনও চীনের উৎপাদন সক্ষমতা ও কম খরচের শিল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে চীন নির্ভর করে মার্কিন ভোক্তা বাজার, প্রযুক্তি, পুঁজিবাজার এবং ডলারকেন্দ্রিক বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার ওপর।

রেগিলমে বলেন, এটাই যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য। দুই দেশই স্বাধীনভাবে শক্তিশালী হতে চায়, কিন্তু তারা এমন এক অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে যেখান থেকে বের হতে গেলে নিজেদেরই ক্ষতি হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশ ভিন্ন ভিন্ন অগ্রাধিকার নিয়ে বৈঠকে যাচ্ছে। ট্রাম্পের প্রধান লক্ষ্য থাকবে বাণিজ্যে দৃশ্যমান সাফল্য দেখানো। বিশেষ করে নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তিনি এমন কিছু অর্জন দেখাতে চান, যা রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানো যাবে।

ওয়াশিংটন চাইছে চীন আরও বেশি মার্কিন পণ্য কিনুক। এর মধ্যে রয়েছে বোয়িং উড়োজাহাজ, গরুর মাংস ও সয়াবিন। একই সঙ্গে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সহযোগিতাও বাড়াতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।

অন্যদিকে বেইজিংয়ের প্রধান লক্ষ্য উন্নতমানের অর্ধপরিবাহী চিপ ও চিপ তৈরির প্রযুক্তির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা শিথিল করানো। তাইওয়ান ইস্যুও বৈঠকের অন্যতম স্পর্শকাতর বিষয় হতে যাচ্ছে।

ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি হংকংয়ের কারাবন্দি গণতন্ত্রপন্থি গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব জিমি লাই-এর বিষয়টিও উত্থাপন করবেন। এছাড়া ইরান যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকিও আলোচনায় আসবে।

প্রযুক্তি ও সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে দুই দেশের দ্বন্দ্ব এখন সবচেয়ে তীব্র পর্যায়ে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে চীনের কাছে উন্নত চিপ ও চিপ তৈরির যন্ত্রপাতি রপ্তানিতে কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, চীনের সামরিক ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সক্ষমতা ঠেকাতেই এই পদক্ষেপ।

অন্যদিকে বিশ্বে ব্যবহৃত বিরল খনিজ পরিশোধনের প্রায় ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে চীন। এসব খনিজ অর্ধপরিবাহী চিপ, বৈদ্যুতিক গাড়ি, সামরিক সরঞ্জাম ও ইলেকট্রনিক পণ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চীনও পাল্টা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ রপ্তানিতে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। বেইজিং চাইছে প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞা কমানো হোক। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চায় চীন আবার বিরল খনিজ রপ্তানি শুরু করুক। কারণ রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মার্কিন গাড়ি ও উড়োজাহাজ শিল্পে বড় প্রভাব পড়েছে।

বৈঠকের সবচেয়ে আলোচিত ইস্যুগুলোর একটি হতে যাচ্ছে ইরান যুদ্ধ। বিশ্লেষকদের ধারণা, ওয়াশিংটন চীনের ওপর চাপ দেবে যাতে তারা তেহরানকে আবার আলোচনায় ফিরতে রাজি করায়।

কারণ চীন এখন ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। দেশটি ইরানের রপ্তানিকৃত অপরিশোধিত তেলের ৮০ শতাংশেরও বেশি কিনছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র চায়, হরমুজ প্রণালিকে আবার নিরাপদ ও উন্মুক্ত রাখতে চীন সহযোগিতা করুক। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য এই প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইরান যুদ্ধ চীনের জ্বালানি নিরাপত্তাকেও চাপের মুখে ফেলেছে। চীনের প্রায় অর্ধেক অপরিশোধিত তেল মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে।

স্টিমসন সেন্টারের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ড্যান গ্রাজিয়ের বলেন, আমার কোনো সন্দেহ নেই, ট্রাম্প চেষ্টা করবেন শি জিনপিংকে দিয়ে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করাতে, যাতে তারা আলোচনায় ফিরে আসে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান ইস্যু এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের স্বার্থ আংশিকভাবে মিলছে। কারণ দুই দেশই উপসাগরীয় অঞ্চলে স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ চায়।

কৌশল বিশ্লেষক গ্রেগ্রি পোলিং বলেন, দুই পক্ষই হরমুজ প্রণালি খোলা দেখতে চায়। তবে বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলের সঙ্গে পুরোপুরি একাত্ম হবে না। তার মতে, এই সংকটে সবচেয়ে বেশি কূটনৈতিক চাপে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রই।

এদিকে তাইওয়ান প্রশ্নকে চীন দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের সবচেয়ে বড় উত্তেজনার উৎস হিসেবে দেখে। চীন স্বশাসিত দ্বীপটিকে নিজেদের অংশ দাবি করে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাইওয়ানের চারপাশে নিয়মিত সামরিক মহড়া ও নৌ টহল বাড়িয়েছে।

বিশেষ করে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম লাই চিংতে ক্ষমতায় আসার পর উত্তেজনা আরও বেড়েছে। কারণ তার দল তাইওয়ানকে কার্যত স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে দেখে।

যদিও যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে মূল ভূখণ্ডের চীনকেই স্বীকৃতি দেয়, তবু তাইওয়ানের আত্মরক্ষায় সহায়তার আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে ওয়াশিংটনের।

গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানকে কয়েকশ কোটি ডলারের অস্ত্র দিয়েছে। গত বছর ১ হাজার ১০০ কোটি ডলারের নতুন সামরিক সহায়তা প্যাকেজও ঘোষণা করা হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, বৈঠকের পর ট্রাম্প ও শি তাইওয়ান নিয়ে কী ভাষা ব্যবহার করেন, সেদিকে সবচেয়ে বেশি নজর থাকবে।

রেগিলমে বলেন, কথার ছোট পরিবর্তনও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ট্রাম্প তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন কি না, অস্ত্র বিক্রিতে অস্পষ্টতা রাখেন কি নান; এসবই গুরুত্বপূর্ণ।

তার মতে, বেইজিং চাইবে যুক্তরাষ্ট্র যেন তাইওয়ানের প্রতি সামরিক সহায়তা কমায় এবং স্বাধীনতার পক্ষে কোনো অবস্থান না নেয়। অন্যদিকে তাইওয়ানের আশঙ্কা, বড় শক্তিগুলোর সমঝোতার অংশ হয়ে যেতে পারে তারা।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের দীর্ঘদিনের বাণিজ্য সংঘাতের বড় অংশজুড়ে রয়েছে শুল্ক। গত বছর ট্রাম্প চীনা পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক আরোপ করলে বেইজিংও পাল্টা ব্যবস্থা নেয়।

এক পর্যায়ে কিছু পণ্যের শুল্ক ১০০ শতাংশের বেশি হয়ে যায়। এতে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়। পরে দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত আলোচনায় দুই দেশ সাময়িক সমঝোতায় পৌঁছায়।

চুক্তির অংশ হিসেবে চীন বেশি পরিমাণে মার্কিন কৃষিপণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দেয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র কিছু শুল্ক প্রত্যাহার করে।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের জন্য সফলতা মানে এমন কিছু অর্জন যা রাজনৈতিকভাবে সহজে দেখানো যায়। যেমন, চীনের মাধ্যমে মার্কিন পণ্য কেনা বাড়ানো, শুল্কে অগ্রগতি, ইরান ইস্যুতে সহযোগিতা বা বিরল খনিজ রপ্তানিতে সমাধান।

রেগিলমে বলেন, ট্রাম্পের কূটনৈতিক ধরন মূলত চুক্তিকে জনসমক্ষে সফলভাবে উপস্থাপনের ওপর নির্ভরশীল। তাই বাস্তব ফলাফলের মতো দৃশ্যমান সফলতাও গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে শি জিনপিংয়ের জন্য সফলতা হবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নতি স্বীকার না করেই স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং বিশ্বশক্তি হিসেবে চীনের অবস্থান আরও শক্ত করা।

বিশ্লেষকদের মতে, পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনা খুব কম। কারণ দুই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মূল কারণগুলো এখনও অমীমাংসিত। তবে সীমিত কিছু সমঝোতা হতে পারে। যেমন, শুল্ক সাময়িক স্থগিত, পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি, বিরল খনিজ রপ্তানি বা ভবিষ্যৎ আলোচনার কাঠামো তৈরি।

রেগিলমের ভাষায়, এ ধরনের সমঝোতা হয়তো সাময়িকভাবে উত্তেজনা কমাবে। কিন্তু মূল সমস্যা থেকেই যাবে। দুই অর্থনীতি একে অপরের ওপর নির্ভরশীল, অথচ দুই সরকারই সেই নির্ভরতাকে এখন কৌশলগত ঝুঁকি হিসেবে দেখছে।

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়