শিরোনাম
◈ ভোট গণনায় আসামে এগিয়ে হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ◈ “জুলাই হত্যাকাণ্ডে বিচার বিলম্ব নিয়ে প্রশ্ন: প্রমাণ নেই, আটক ও জামিন সংকটে রাজনৈতিক স্বার্থের অভিযোগ সারা হোসেনের” ◈ পর্যটন খাতে বড় পরিকল্পনা, আসছে পূর্ণাঙ্গ মাস্টারপ্ল্যান : বিমানমন্ত্রী ◈ চ্যাম্পিয়ন আবাহনী পরাজয় দি‌য়ে শুরু কর‌লো ঢাকা প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগ  ◈ বাংলা‌দেশ নারী ক্রিকেট দ‌লের অ‌ধিনায়ক জ্যোতি‌কে শা‌স্তি দি‌লো আইসি‌সি ◈ মমতার বিদায়ের ইঙ্গিত? বিজেপি জিতলে কে হতে পারেন মুখ্যমন্ত্রী ◈ হাম ও উপসর্গে মৃতের সংখ্যা বাড়ছেই, একদিনেই ১৭ শিশুর মৃত্যু ◈ দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে জটিলতা কমানোর নির্দেশ দিলেন প্রধানমন্ত্রী ◈ মা‌য়ের সোনার গহনা আর বাবার ৪টা দোকান বেচে কার্তিক শর্মা হ‌লেন ক্রিকেটার ◈ সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সুখবর, এগোচ্ছে নবম পে-স্কেল পরিকল্পনা

প্রকাশিত : ০৪ মে, ২০২৬, ০৭:১৩ বিকাল
আপডেট : ০৪ মে, ২০২৬, ১০:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

১৭ বছরেই বাবাকে হারানো থেকে মুখ্যমন্ত্রী—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর লড়াকু উত্থান

২৫ আগস্ট, ১৯৭৫; ভারতে জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ জোরদার হচ্ছে। এই আন্দোলনের মুখ জয়প্রকাশ নারায়ণ তখন কলকাতায়। ছাত্র রাজনীতির আঁতুড়ঘর কলেজ স্ট্রিটে তার গাড়ি আটকে দেয় কিছু যুব কংগ্রেস কর্মী। হঠাৎই এক তরুণী সুতির শাড়ি পরে গাড়ির বোনেটে উঠে পড়েন এবং ওই প্রবীণ গান্ধীবাদীর বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকেন। সংবাদমাধ্যমের ফটোগ্রাফাররা সেই মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি করেন। তখনও তারা জানতেন না এই সাহসী তরুণীর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী হতে চলেছে। সেই তরুণীই হলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই দিন থেকে আজ পর্যন্ত রাজপথই তার প্রধান শক্তির জায়গা।

তবে অনেকেই মনে করছেন এবার মমতার লড়াই কঠিন। বর্তমানে ৭১ বছর বয়সী তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা নেত্রী টানা তিন দফা মুখ্যমন্ত্রী। তার দলের বিরুদ্ধে রয়েছে শাসনবিরোধী মনোভাব ও ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ। প্রধান বিরোধী বিজেপি সর্বশক্তি দিয়ে পাল্টা লড়াইয়ের চেষ্টা করছে, আর পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। তবে মমতার রাজনৈতিক যাত্রা দেখিয়েছে—কঠিন লড়াই এলেই তিনি সবচেয়ে বেশি লড়াকু হয়ে ওঠেন।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বয়স যখন ১৭, তখন তার বাবা প্রমিলেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায় মারা যান। তিনি বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলেছেন, চিকিৎসার অভাবেই তার বাবার মৃত্যু হয়, কারণ তার বাবার প্রাপ্য বিল সরকারি দপ্তর থেকে মেটানো হয়নি। বাবার মৃত্যুর পরদিন তাদের হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের বাড়িতে ৬০ হাজার টাকার একটি চেক আসে। ২০১২ সালে ‘আউটলুক’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘এই চেকটা নিরর্থক ছিল; এটা আমার বাবাকে ফিরিয়ে আনতে পারেনি।’

কলেজজীবনে তার জীবন ছিল অন্যরকম। ভোরে উঠে পাঁচ ভাইবোন ও মায়ের জন্য রান্না করে তারপর কলেজে যেতেন। যেখানে সহপাঠীরা নতুন পোশাকে আগ্রহী ছিল, সেখানে তার সামর্থ্য ছিল শুধু সুতির শাড়ি; যা পরে ‘ব্র্যান্ড মমতা’-র অংশ হয়ে ওঠে।

রাজনীতিতে হাতেখড়ি: ১৯৭০ সালে স্কুল পাস করে তিনি কলকাতার জোগমায়া দেবী কলেজে ভর্তি হন। কিশোরী বয়সেই কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠন ছাত্রী পরিষদের নেতৃত্ব দেন এবং কলেজ নির্বাচনে জয় পান। ১৯৭৬ সালে তিনি মহিলা কংগ্রেস (ইন্দিরা)-র বঙ্গ ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক হন।

১৯৮৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ২৯ বছর বয়সে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। যাদবপুরে তিনি প্রবীণ বাম নেতা সোমনাথ চ্যাটার্জিকে হারান। ১৯৮৯-এ পরাজয়ের পর ১৯৯১-এ কলকাতা দক্ষিণ কেন্দ্র থেকে আবার জিতে সংসদে ফেরেন এবং টানা ২০ বছর এই আসন ধরে রাখেন।

কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে উত্থান: ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর পি ভি নরসিমা রাও-এর সরকারে সবচেয়ে কমবয়সী মন্ত্রী হন। পরে রাজ্য কংগ্রেস নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সরব হন এবং তাদের সিপিএমের হাতিয়ার বলে অভিযোগ করেন। এই দ্বন্দ্ব বাড়তে বাড়তে ১৯৯৭ সালে তিনি অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯৯৯ সালে এনডিএ জয়ের পর অটল বিহারী বাজপেয়ী-এর সরকারে রেলমন্ত্রী হন। ২০০১ সালে তেহেলকা স্টিং অপারেশন কাণ্ডে পদত্যাগ করেন। ২০০৩-এ আবার মন্ত্রিসভায় ফিরে কয়লা ও খনি মন্ত্রী হন।

২০০৪ সালে এনডিএ হারার পর তৃণমূল বড় ধাক্কা খায়। পরে ইউপিএ সরকারে আবার রেলমন্ত্রী হন এবং ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর পদ ছাড়েন।

রাজপথের যোদ্ধা: রাজনীতির শুরু থেকেই আন্দোলন ছিল তার শক্তি। ১৯৯২ সালে তিনি ধর্ষণের অভিযোগে ন্যায়বিচারের দাবিতে এক প্রতিবন্ধী কিশোরীকে নিয়ে রাইটার্স বিল্ডিংসে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জয়তি বাসুর সঙ্গে দেখা করতে যান। সাক্ষাৎ না পেয়ে সেখানে অবস্থান বিক্ষোভ করেন এবং পুলিশি হস্তক্ষেপে তাকে টেনে হিঁচড়ে সরানো হয়। তিনি প্রতিজ্ঞা করেন, মুখ্যমন্ত্রী না হওয়া পর্যন্ত আর রাইটার্সে ঢুকবেন না—১৯ বছর পর তা পূরণ করেন।

২১ জুলাই ১৯৯৩ সালে ভোট কারচুপির অভিযোগে রাইটার্সের দিকে মিছিল ডাকেন। পুলিশি গুলিতে ১৩ জন নিহত হন। এরপর থেকে দিনটি ‘শহিদ দিবস’ হিসেবে পালন করে তৃণমূল।

সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম অধ্যায়: ২০০০ সালে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর শিল্পায়নের উদ্যোগে জমি অধিগ্রহণ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। সিঙ্গুরে টাটা মোটরস-এর কারখানার বিরোধিতায় ২০০৬ সালে ২৬ দিনের অনশন করেন মমতা। তার শারীরিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এ পি জে আব্দুল কালাম ও প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং তাকে অনশন ভাঙার অনুরোধ জানান।

নন্দীগ্রামে ২০০৭ সালের ১৪ মার্চ পুলিশের গুলিতে ১৪ জন নিহত হন। এই আন্দোলন মমতার রাজনৈতিক শক্তি বাড়ায় এবং ২০১১ সালে ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে তিনি ক্ষমতায় আসেন।

সমালোচকরা বলেন, টাটা মোটরসের প্রস্থান রাজ্যের শিল্প ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তবে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট সিঙ্গুরের জমি অধিগ্রহণকে অবৈধ ঘোষণা করে, যা মমতার অবস্থানকে বৈধতা দেয়।

মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে: ২০১১ সালে তিনি মুখ্যমন্ত্রী হন এবং গত ১৫ বছরে পশ্চিমবঙ্গের প্রধান রাজনৈতিক মুখ হয়ে উঠেছেন। তিনি গ্রামাঞ্চলে নাচে অংশ নেওয়া থেকে শুরু করে মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে নিজেকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য হিসেবে তুলে ধরেন যা তার রাজনীতির অংশ।

নারী ভোটব্যাংক গড়তে কন্যাশ্রী ও লক্ষ্মীর ভান্ডারের মতো প্রকল্প চালু করেন। তবে সমালোচনাও রয়েছে। নারী নির্যাতনের ঘটনা, যেমন পার্ক স্ট্রিট ধর্ষণ মামলা ও আরজি কর হাসপাতালের ঘটনার পর ব্যাপক প্রতিবাদ হয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগেও তার দল চাপে পড়ে, বিশেষ করে পার্থ চ্যাটার্জিকে ঘিরে নগদ অর্থ উদ্ধারের ঘটনায়। শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতিও সুপ্রিম কোর্টে প্রশ্নের মুখে পড়ে।

মমতা বারবার দাবি করেছেন, কেন্দ্রীয় সংস্থার তদন্ত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং নরেন্দ্র মোদি সরকারের ষড়যন্ত্রের অংশ।

২০২৬-এর লড়াই: ১৫ বছরের শাসনের পর এবার তার বিরুদ্ধে প্রবল শাসনবিরোধী হাওয়া। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির তুলনায় তৃণমূল কংগ্রেস পিছিয়ে রয়েছে। আজ সোমবার (৪ এপ্রিল) দুপুর নাগাদ বিজেপির জয় অনেকটাই নিশ্চিত হয়ে গেছে। তবে এখনই হার মানতে নারাজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দুপুর সাড়ে বারোটা নাগাদ জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি বা তার দল পরাজয় মেনে নিতে এখনও প্রস্তুত নন। তিনি বলেন, কাউন্টিং এজেন্টরা কেউ গণনাকেন্দ্র থেকে সরে আসবেন না। তৃণমূল কংগ্রেস এখনো ৭০ থেকে ১০০ আসনে এগিয়ে আছে, যেগুলো দেখাচ্ছে না। নির্বাচনি ফলাফলের নামে ‘গোটাটাই মিথ্যে জিনিস খাওয়াচ্ছে’ বলেও তিনি দাবি করেন।

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়