বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলা সুনামগঞ্জের জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র টাঙ্গুয়ার হাওরে একাংশে হাউসবোটসহ পর্যটকবাহী সব ধরনের নৌযান চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে জেলা প্রশাসন।
ইঞ্জিনচালিত নৌকাগুলোর অনিয়ন্ত্রিত চলাচল এবং পর্যটকদের ফেলা দেওয়া ময়লা-আবর্জনা হাওরের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য নষ্ট করায় অনির্দিষ্টকালের এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
"তবে এর মানে এই নয় যে, কেউই এখন হাওরে বেড়াতে আসতে পারবেন না। বরং হাওরের যে অংশটুকু প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে পরিচিত, শুধু সেখানেই পর্যটকবাহী নৌযান চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. মতিউর রহমান খান।
এর আগে, গত বছরের জুন মাসে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একই ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পর্যটকবাহী অনেক নৌকা অমান্য করছিল।
এ অবস্থায় গত নভেম্বরে 'টাঙ্গুয়ার হাওর ও হাকালুকি হাওর সুরক্ষা আদেশ, ২০২৫' জারি করে সরকার। সেটির আলোকেই এবার নতুন করে নির্দেশনা জারি করে সেটি কঠোরভাবে প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
পর্যটকবাহী যত নৌকা হাওরটিতে চলাচল করছে, একটি শৃঙ্খলার মধ্য আনার জন্য সেগুলোকে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করতে বলা হয়েছে।
সেইসঙ্গে, পর্যটকদের নিরাপত্তায় প্রতিটি নৌকায় লাইফ জ্যাকেট, লাইফবয় রিং ও অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখাসহ আরও বেশকিছু নির্দেশনা দিয়েছে জেলা প্রশাসন।
এসব নির্দেশনা অমান্য করলে জেল-জরিমানা ভোগ করতে হবে বলে সতর্ক করেছেন কর্মকর্তারা।
সরকারের এমন পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন পর্যটকরা।
"হাওরে যাওয়ার পর আমার নিজেও মনে হয়েছে যে, এত সুন্দর জায়গাটাতে মানুষজন ঘুরতে এসে যেভাবে নোংরা করছে, সেটার বিষয়ে সরকারের নজর দেওয়া উচিৎ। প্রশাসনের পক্ষ থেকে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেগুলো যতযতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে আমি মনে করি, হাওরের সৌন্দর্য রক্ষা করা সম্ভব হবে," বলছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফয়সাল আহমেদ, যিনি সম্প্রতি টাঙ্গুয়ার হাওরে ঘুরতে গিয়েছিলেন।
পর্যটকবাহী নৌকার মালিকরাও সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি করছেন না। তবে জারি করা সব নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য যে ধরনের প্রস্তুতি থাকা দরকার, সেটি জেলা প্রশাসনের কতটুকু আছে- সেই প্রশ্নও তুলেছেন কেউ কেউ।
নতুন নির্দেশনায় কী আছে?
টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশ রক্ষায় গত রোববার একটি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও হাওর সুরক্ষা বাস্তবায়ন ও পরীক্ষণ কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমানের জারি করা ওই গণবিজ্ঞপ্তিতে ডজনখানেক নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সেখানে বলা হয়েছে, অনিবন্ধিত কোনো পর্যটকবাহী বোট হাওরে চলতে পারে না বলে জানানো হয়েছে। ব্যবসা চালু রাখতে হলে হাউসবোটসহ সব ধরনের যাত্রীবাহী নৌকাকে আগামী ১০ই অগাস্টের মধ্যে জেলা প্রশাসনের কাছে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করার নির্দেশনা দিয়েছেন কর্মকর্তারা।
হাওরে ঘুরতে গিয়ে উচ্চস্বরে গানবাহনা করা, মাইক বাজানো কিংবা হৈ হুল্লোড় করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ভ্রমণের সময় সিঙ্গেল ইউজ বা একবার ব্যবহার করে ফেলা দেওয়া হয়- এমন প্লাস্টিক সঙ্গে না নেওয়ার জন্য পর্যটকসহ সবার প্রতি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পর্যটকদের সুবিধার্থে নৌকায় পানি বিশুদ্ধকারী ফিল্টার, সেপটিক ট্যাংক এবং অন্তত দু'টি করে ডাস্টবিন রাখা বাধ্যতামূলক করেছে প্রশাসন।
সেইসঙ্গে, হাউসবোটের দৈর্ঘ্য সর্বোচ্চ ১০০ ফুটের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা এবং প্রতিটি নৌকায় পর্যাপ্ত সংখ্যক লাইফ জ্যাকেট, লাইফবয় রিং, অগ্নিনির্বাপণযন্ত্র ও গ্যাস সিলিন্ডারের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করার নির্দেশনা দিয়েছেন কর্মকর্তারা।
ভ্রমণকালে হাওরে যে কোনো ধরনের ময়লা ফেলা নিষিদ্ধ করে বোটে পর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এখানেই শেষ নয়, হাওরে অবস্থানকালে পর্যটকদের আচরণবিধি কেমন হবে, ট্যুর শুরুর আগেই সেটি তাদের জানিয়ে দিতে বলা হয়েছে। নৌকায় এ বিষয়ে নোটিশও টানানো নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।
একইসঙ্গে, স্থানীয় পুলিশ, প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস এবং হাসপাতালের জরুরি নম্বর সম্বলিত পোস্টার বা ব্যানার দৃশ্যমান স্থানে সাটিয়ে রাখতে বলা হয়েছে।
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে পর্যটক পরিবহন বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। এছাড়া ঝড়-বৃষ্টি বা বজ্রপাতের সময় পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দিয়েছে জেলা প্রশাসন।
২০২৫ সালে জারি করা 'টাঙ্গুয়ার হাওর ও হাকালুকি হাওর সুরক্ষা আদেশ' অনুযায়ী দেওয়া এসব নির্দেশনা অবশ্যই মেনে চলতে হবে বলে গণবিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
"এগুলো নিয়ে এর আগেও বà¦