ভারতের মুম্বাইয়ে মর্মান্তিক এক ঘটনায় একই পরিবারের চার সদস্যের মৃত্যু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, খাদ্য বিষক্রিয়ায় তাদের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। বিষয়টি নিয়ে ভারতজুড়ে চলছে জোর আলোচনা।
কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এনডিটিভি জানিয়েছে, ওই পরিবারের সদস্যরা তাদের কিছু আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে বাড়িতে রাতের খাবারে বিরিয়ানি খেয়েছিলেন এবং পরে সেই রাতে, আত্মীয়রা চলে যাওয়ার পর বাড়িতে থাকা তরমুজ খান। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে চারজনই অসুস্থ বোধ করতে শুরু করেন এবং বমি ও পাতলা পায়খানার মতো উপসর্গ দেখা দেয়।
পরে তাদের দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে পরিবারের চার সদস্যই মারা যান। পুলিশ জেজে মার্গ থানায় একটি আকস্মিক মৃত্যুর মামলা দায়ের করেছে এবং জানিয়েছে, মেডিকেল ও ফরেনসিক রিপোর্টের মাধ্যমে মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে।
যদিও রান্না করা খাবারে দূষণের ঝুঁকি বেশি থাকায় বিরিয়ানি থেকে খাদ্যে বিষক্রিয়ার ঘটনা বিরল নয়, তবে তরমুজও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মুম্বাইয়ের এই ঘটনাটির পর প্রশ্ন উঠেছে, তরমুজের মতো একটি সাধারণ ফল থেকে খাদ্যে বিষক্রিয়া হতে পারে কি না এবং এর পরিণতি এতটা গুরুতর (মৃত্যুর মতো) হতে পারে কি না।
তরমুজ খেয়ে বিষক্রিয়ার কারণে কি মৃত্যু হতে পারে?
পরামর্শক পুষ্টিবিদ রূপালী দত্তের মতে, তরমুজ থেকে খাদ্য বিষক্রিয়া হতে পারে এবং পরিস্থিতিভেদে গুরুতর ক্ষেত্রে তা মারাত্মক স্বাস্থ্য জটিলতা, এমনকি মৃত্যুর কারণও হতে পারে।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, তরমুজে উচ্চ মাত্রায় পানি এবং প্রাকৃতিক চিনি থাকায়, দূষণ ঘটলে এটি এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে যেখানে ব্যাকটেরিয়া দ্রুত বংশবৃদ্ধি করতে পারে।
এছাড়াও অনেক সময় অভিযোগ পাওয়া যায়, তরমুজের মিষ্টতা বা সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য এতে গ্লুকোজ পানি বা চিনির পানি ইনজেক্ট করা হয়। রূপালী দত্তের মতে, যদি কোনো দূষিত তরমুজে এই ধরনের তরল প্রবেশ করানো হয়, তাহলে তা ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
তরমুজ থেকে খাদ্য বিষক্রিয়া হওয়া অস্বাভাবিক নয়
পুষ্টিবিদ এবং সার্টিফায়েড ডায়াবেটিস এডুকেটর ড. অর্চনা বাত্রার মতে, ঝুঁকি তখনই দেখা দেয় যখন ফলটি (তরমুজ) সালমোনেলা সংক্রমণ, লিস্টেরিওসিস বা ই. কোলাই সংক্রমণের রোগ সৃষ্টিকারী স্ট্রেনের মতো ক্ষতিকারক জীবাণুর মাধ্যমে দূষিত হয়।
এই সংক্রমণগুলোর ফলে তীব্র পানিশূন্যতা, সিস্টেমিক সংক্রমণ (সেপসিস) বা গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গে জটিলতা দেখা দিতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে এই ধরনের জটিলতা হতে পারে প্রাণঘাতী।
তরমুজ থেকে খাদ্য বিষক্রিয়া হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়, যার ফলে প্রায়শই ডায়রিয়া, বমি এবং পেটে তীব্র ব্যথা হয়। তবে, এর তীব্রতা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট ব্যাকটেরিয়া বা দূষকের ধরণ, ব্যক্তির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং দ্রুত চিকিৎসা সেবা নেয়ার মতো বিষয়ের ওপর।
গুরুতর ক্ষেত্রে, বিশেষ করে তীব্র ডায়রিয়া ও পেটের সমস্যায় ভোগা শিশুদের মধ্যে, এই অবস্থাটি প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। তবে একই সাথে চিকিৎসকরা সতর্ক করেছেন, পরীক্ষার ফলাফল ছাড়া কোনো একটি নির্দিষ্ট খাবারকে চিহ্নিত করা কঠিন। রূপালী দত্তের মতে, দূষিত ফল, অনুপযুক্তভাবে সংরক্ষিত খাদ্য, বা অনিরাপদ অবস্থায় দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষিত জিনিসপত্র থেকে খাদ্য বিষক্রিয়া হতে পারে।
জানা যায়, মুম্বাইয়ের ভুক্তভোগী পরিবারটি গভীর রাতে তরমুজ খেয়েছিল। ফলে প্রশ্ন ওঠে, সময় কি এক্ষেত্রে কোনো ফ্যাক্টর? চলুন, জেনে নেয়া যাক।
তরমুজ খাওয়ার সেরা সময় কখন?
রূপালী দত্ত উল্লেখ করেছেন, তরমুজ খাওয়ার সময়টা গুরুত্বপূর্ণ। তার পরামর্শ, গভীর রাতে, বিশেষ করে রাত ৮টার পর ফল বা ভারি খাবার এড়িয়ে চলা উচিত, কারণ ঘুমের সময় হজম প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়।
চিকিৎসকদের মতে, তরমুজ খাওয়ার সেরা সময় হলো: সকালে, খাবারের মাঝে এবং দিনের বেলায় নাস্তা হিসেবে।
পুষ্টিবিদ রূপালী দত্ত জোর দিয়ে বলেন, গভীর রাতে ফল খেলেই যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে খাদ্য বিষক্রিয়া হবে এমনটা নয়, তবে ফলটি দূষিত হলে বা শরীর তা হজম করতে কম সক্ষম হলে এটি হজমের সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
তদন্ত অব্যাহত থাকায়, মুম্বাইয়ের এই মর্মান্তিক ঘটনার সঠিক কারণ নির্ণয়ের জন্য কর্মকর্তারা ডাক্তারি প্রতিবেদনের অপেক্ষায় আছেন। আর বিশেষজ্ঞরা খাদ্য স্বাস্থ্যবিধি, নিরাপদ সংরক্ষণ এবং নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে তাজা পণ্য গ্রহণের গুরুত্বের ওপরই জোর দিচ্ছেন। সূত্র: এনডিটিভি