ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিক করতে নতুন কৌশল নিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। ইরান কর্তৃক আরোপিত অবরোধ ও মাইন আতঙ্ক কাটাতে এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু করতে যুক্তরাষ্ট্র এখন সামুদ্রিক ড্রোন ব্যবহার করছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এ খবর জানিয়েছে।
শনিবার ইরান পুনরায় হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে এবং তাদের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের প্রতিবাদে অন্তত দুটি বেসামরিক জাহাজে গুলি চালিয়েছে। এর আগে তেহরান নির্দেশ দিয়েছিল, যেসব জাহাজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করবে, তাদের অবশ্যই ইরানের উপকূলবর্তী নতুন রুট ব্যবহার করতে হবে। একই সঙ্গে তারা প্রধান জলপথে মাইন থাকার হুঁশিয়ারিও দিয়ে রেখেছে।
জাহাজগুলোর ওপর হামলার ঝুঁকিই বর্তমানে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের প্রধান বাধা। এ বিষয়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যে অসামঞ্জস্য থাকলেও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, কৌশলগত এই জলপথ ব্যবহারের জন্য মাইন অপসারণ করা একটি অপরিহার্য শর্ত। কারণ ইরানের উপকূলীয় রুটগুলো অনেক বেশি ধীরগতির ও যানজটপূর্ণ।
মার্কিন নৌবাহিনী তাদের পুরোনো মাইন-অপসারণকারী জাহাজগুলোকে এখন খুব বেশি ব্যবহার করছে না। তবে এসব নৌযানের পাশাপাশি এখন সামুদ্রিক ড্রোন ও সাবমেরিন ব্যবহার করছে। এই প্রযুক্তি সোনার ব্যবহার করে নাবিকদের জীবনের ঝুঁকি ছাড়াই সমুদ্রের তলদেশে মাইন শনাক্ত করতে পারে।
র্যান্ড করপোরেশনের জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী স্কট স্যাভিটজ নৌবাহিনীর মাইন যুদ্ধ কমান্ডে বিশ্লেষণমূলক সহায়তা প্রদান করতেন। তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি কম। মাইনফিল্ডে এই রোবটগুলো পাঠানো অনেক বেশি যুক্তিযুক্ত এবং কোনও ড্রোন হারিয়ে গেলেও তা সহজেই প্রতিস্থাপন করা সম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্রের এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা জানান, মাইন অপসারণ অভিযানে মানবচালিত ও চালকবিহীন প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো হচ্ছে। তবে তিনি অভিযানের নির্দিষ্ট কোনও কৌশল নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। নৌবাহিনী বর্তমানে হেলিকপ্টার, লিটোরাল কমব্যাট শিপ এবং সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী (ডলফিন) প্রশিক্ষণের মতো বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, যার পাশাপাশি এখন ড্রোনগুলো বড় ভূমিকা রাখছে।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে, আরটিএক্স-এর তৈরি কমন আনক্রুড সারফেস ভেসেল নামক ড্রোনটি একিউএস-২০ নামে একটি ভাসমান সোনার সিস্টেম টেনে নিয়ে যায়, যা সমুদ্রের তলদেশে ১০০ ফুট প্রশস্ত এলাকায় মাইন শনাক্ত করতে পারে। এছাড়া জেনারেল ডাইনামিকসের তৈরি এমকে১৮ মড ২ কিংফিশ ও নাইফফিশ ড্রোনগুলো ছোট নৌকা থেকে পানিতে ফেলে মাইন শনাক্ত করা সম্ভব।
সাবেক মার্কিন ভাইস অ্যাডমিরাল ও উপসাগরে দায়িত্বরত যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের সাবেক কমান্ডার কেভিন ডনিগান বলেন, আনম্যানড আন্ডারওয়াটার ভেহিক্যাল (ইউইউভি) ব্যবহার করে কয়েক সপ্তাহের বদলে মাত্র কয়েক দিনেই একটি ছোট চ্যানেল জরিপ করা সম্ভব। একবার একটি লেন অপসারণ করা গেলে, জাহাজ চলাচল শুরু হতে পারে এবং ধীরে ধীরে চ্যানেলটি বড় করা যাবে।
এই মাইন অপসারণ মিশন এমন সময়ে শুরু হলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরগুলোতে অবরোধ আরোপ করেছে। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরান নিয়ে নেওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর যুদ্ধ শেষ করার চাপ বাড়িয়েছে।
যদিও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শুক্রবার দাবি করেছিলেন, প্রণালিটি এখন ‘পুরোপুরি উন্মুক্ত’, যা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে আশ্বস্ত করেছিল। কিন্তু শনিবার ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর জানায়, জলপথটি আবার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং দুটি জাহাজে গুলি চালানো হয়। এটি প্রমাণ করে যে প্রণালিতে চলাচল আপাতত ইরানের সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে। লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্সের তথ্যমতে, ১৩ এপ্রিলের পর থেকে প্রণালি পার হওয়া ২৭টি বড় জাহাজের মধ্যে ১৫টিই ইরানের উপকূলবর্তী বাধ্যতামূলক রুট ব্যবহার করেছে।
হডসন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো ও নৌবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ব্রায়ান ক্লার্ক বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি মাইন শনাক্ত করে নিজের জাহাজ চলাচল শুরু করতে পারে এবং ইরান বুঝতে পারে যে তাদের নিয়ন্ত্রণ আলগা হয়ে আসছে, তবে তারা আলোচনার টেবিলে বসতে আরও আগ্রহী হতে পারে।
মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, ইরান প্রণালিতে মাইন বসিয়েছে, তবে এর সঠিক সংখ্যা বা ঝুঁকি এখনও অস্পষ্ট। ব্রায়ান ক্লার্কের মতে, সম্ভবত এক বা দুই ডজন মাইন বসানো হয়েছে, যা মাছ ধরার নৌকা বা ছোট কার্গো জাহাজের মাধ্যমে গভীর রাতে গোপনে স্থাপন করা হয়েছে।
মাইন অপসারণের এই প্রক্রিয়াটি কেবল বড় কনভয়ের পথ তৈরির প্রথম ধাপ। উপসাগরে জাহাজের জট খুলতে কয়েক সপ্তাহ বা মাসও লেগে যেতে পারে। এছাড়া কনভয় ব্যবস্থায় দিনে হয়তো ৫-১০টি জাহাজ নেওয়া সম্ভব হবে, যেখানে যুদ্ধের আগে দিনে প্রায় ১৩০টি জাহাজ যাতায়াত করত। ক্লার্কসনের তথ্যমতে, মার্চ মাস পর্যন্ত উপসাগরে অন্তত ১ হাজার ১২৯টি জাহাজ রয়েছে, যারা গত এক বছরে অন্তত একবার হলেও উপসাগরের বাইরের কোনও বন্দরে নোঙর করেছে।
এদিকে, শুক্রবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ইরান সব সামুদ্রিক মাইন সরিয়ে ফেলেছে বা সরাচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক শিপিং সংস্থা বিমকোর নিরাপত্তা কর্মকর্তা জ্যাকব লারসেন এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, বিশ্বাসযোগ্য প্রতিবেদনগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে মাইন থাকার ঝুঁকি এখনও বিদ্যমান এবং শিপিং কোম্পানিগুলোর উচিত এই এলাকা এড়িয়ে চলা।