মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হারতে পছন্দ করেন না। কিন্তু ইরান যুদ্ধে জয়ের সম্ভাবনা যখন ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে, তখন বিশ্ব সম্ভবত এক অস্থির প্রেসিডেন্টের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, ট্রাম্প যদি নিজেকে কোণঠাসা মনে করেন, তবে তার প্রতিক্রিয়া এই সংঘাতকে আরও বিপজ্জনক করে তুলতে পারে।
ইরান যুদ্ধের চ্যালেঞ্জগুলো প্রতিদিন বাড়ছে। যদিও মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ও নৌ-সক্ষমতা ধ্বংসে অনেকাংশে সফল হয়েছে, কিন্তু দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক প্রভাব এখনও অটুট। উল্টো ঝুঁকি বাড়ছে যে, তেহরান নিজেকে রক্ষায় পারমাণবিক অস্ত্রের দিকে আরও ঝুঁকে পড়তে পারে। ভেনেজুয়েলার মতো মসৃণ ক্ষমতা বদল বা গণঅভ্যুত্থানের যে আশা ওয়াশিংটন করেছিল, তা-ও ফিকে হয়ে গেছে।
অতীতের রেকর্ড বলছে, ট্রাম্প যখনই সংকটে পড়েন, তিনি কিছু নির্দিষ্ট কৌশল অবলম্বন করেন। এর মধ্যে রয়েছে অধীনস্তদের ওপর চড়াও হওয়া, অন্যের ওপর দোষ চাপানো, তথ্য গোপন করা এবং ব্যর্থ কৌশলকেই আরও জেদ নিয়ে আঁকড়ে ধরা।
২০২০ সালের নির্বাচনে হারের পর তার এই আচরণ সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা গিয়েছিল। তখন তিনি নিজের নির্বাচনি কর্মকর্তাদের বক্তব্য অস্বীকার করেছিলেন, জর্জিয়ার সেক্রেটারি অব স্টেটকে ভোট ‘খুঁজে বের’ করার চাপ দিয়েছিলেন এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সকে ফলাফল প্রত্যয়িত না করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এমনকি যারা তার সঙ্গে একমত হননি, যেমন নির্বাচন কর্মকর্তা ক্রিস ক্রেবস, তাদের বরখাস্ত করেছিলেন।
নব্বইয়ের দশকে ব্যবসায়িক দেউলিয়াত্ব থেকে শুরু করে ট্রাম্প ইউনিভার্সিটির কেলেঙ্কারি; সবক্ষেত্রেই ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া ছিল আক্রমণাত্মক। ২০১৬ সালের শপথ অনুষ্ঠানে ভিড় কম হওয়া নিয়ে তিনি হোয়াইট হাউস প্রেস সেক্রেটারি শন স্পাইসারকে দিয়ে মিথ্যা বলাতে বাধ্য করেছিলেন। ই জেন ক্যারোলের ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের মামলার ক্ষেত্রেও তিনি বিচারকের ওপর নজিরবিহীন আক্রমণ চালিয়েছিলেন।
ইরান যুদ্ধেও ট্রাম্পের সেই পুরোনো কৌশলের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। যুদ্ধ শুরুর আগে মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনের সতর্কবার্তা ট্রাম্প উপেক্ষা করেছিলেন বলে খবর পাওয়া গেছে। জেনারেল কেইন পর্যাপ্ত গোলাবারুদ ও মিত্রদের সমর্থনের অভাব নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিলেন। ট্রাম্পের পুরোনো অভ্যাস অনুযায়ী, দ্বিমত পোষণকারী কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়া বা বরখাস্ত করার ভয় এখন সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রভাবিত করতে পারে।
যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাণঘাতী হামলার জন্য ট্রাম্প ইরানকে দায়ী করেছিলেন, যা পরে মার্কিন তদন্তকারীরাই মার্কিন বাহিনীর ভুল বলে শনাক্ত করেন। এছাড়া এফসিসি চেয়ারম্যান ব্রেন্ডন কার গণমাধ্যমের লাইসেন্স বাতিলের হুমকি দিয়েছেন যদি তারা প্রশাসনের ভাষ্যের বাইরে কোনও সংবাদ প্রচার করে।
হরমুজ প্রণালি রক্ষায় জাহাজ পাঠাতে অস্বীকৃতি জানানোয় ট্রাম্প ইতোমধ্য মিত্রদের ওপর ক্ষোভ ঝেড়েছেন। ব্যর্থতা প্রকট হলে তিনি মার্কিন সামরিক বাহিনী, উপসাগরীয় মিত্র, চীন, রাশিয়া কিংবা ডেমোক্র্যাটদের ওপর দোষ চাপাতে পারেন।
যদি ট্রাম্প নিজেকে ফাঁদে পড়া বা মরিয়া অনুভব করেন, তবে তিনি বেপরোয়াভাবে স্থল সেনা মোতায়েন বা অপ্রচলিত মারণাস্ত্র ব্যবহারের মতো চরম সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এটি সংঘাতকে একটি দীর্ঘস্থায়ী বৈশ্বিক যুদ্ধে রূপ দিতে পারে। এমনকি ইরান থেকে মনোযোগ সরাতে তিনি কিউবা বা অন্য কোনও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করতে পারেন।
২০২০ সালের মতো এবার ট্রাম্পের হাতে আরও তিন বছর সময় আছে। ফলে তার অবাস্তব বা ক্ষতিকর নির্দেশ অমান্য করা কর্মকর্তাদের জন্য তাৎক্ষণিক প্রতিশোধের ঝুঁকি থাকবে। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বা ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টের মতো তুলনামূলক স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বরগুলো যদি কোণঠাসা হয়ে পড়েন, তবে পেশাদারিত্বের মান আরও ভেঙে পড়বে।
শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের মন্ত্রিসভা, জেনারেল এবং উপদেষ্টারা যদি প্রেসিডেন্টের ভুল জেদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে না পারেন, তবে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা আগামী কয়েক দশকের জন্য বড় সংকটে পড়বে।
মার্কিন সাময়িকী ফরেন পলিসি অবলম্বনে।
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন