সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুতে ৪৭ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় আঘাত পেল ইরানের নেতৃত্ব।
১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার আসনে বসেছিলেন খামেনি।
রোববার দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেসকিয়ান বলেছেন, খামেনিকে হত্যার প্রতিশোধ ইরান নেবে। আর প্রতিশোধ নেওয়াটা তাদের ‘দায়িত্ব ও বৈধ অধিকার’।
অন্যদিকে মার্কিন হামলাকে ইরানিদের জন্য ‘মুক্তির ক্ষণ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।
খামেনির মৃত্যুকে বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘মাথা’ সরিয়ে দিলে ‘শরীর’ নিথর হতে খুব বেশি সময় লাগে না।
তবে ইরানের যে বাস্তবতা, তা ট্রাম্পের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি জটিল।
ইরান যুদ্ধে সম্পৃক্ত ব্যক্তি, সামরিক বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে আল জাজিরার বিশ্লেষণ বলছে, ইরানের শীর্ষ নেতার ‘মাথা’ সরিয়ে দেওয়ার ফলটা পশ্চিমাদের কল্পনার সঙ্গে নাও মিলতে পারে।
সেখানে এমন এক রাষ্ট্রের আবির্ভাব ঘটতে পারে, যার অর্থনীতি কিংবা রাজনীতি— সব ক্ষেত্রেই সামরিক বাহিনীর একচ্ছত্র আধিপত্য দেখা দেবে। আর এ ধরনের রাষ্ট্রে রাজনৈতিক সীমারেখা বলে কিছুই থাকবে না।
‘শিরশ্ছেদের’ সীমাবদ্ধতা: ইরানে হামলা চালানো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মূল বোঝাপড়াটা হলো, তেহরান এতটাই দুর্বল যে, সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু হলে তারা আর টিকে থাকতে পারবে না। ফলে খামেনির মৃত্যুর পরেই সেখানে ‘বিকল্প’ নেতা বসানোর হিসাব-নিকাশ শুরু করে দিয়েছেন ট্রাম্প।
সিবিএস নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছেন, খামেনির বিকল্প হিসেবে ‘ভালো কিছু প্রার্থী’ আছেন। তবে কারা সেই প্রার্থী, তা তিনি খোলাসা করেননি।
সামরিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, শুধু বিমান হামলা চালিয়ে কিংবা শীর্ষ নেতাকে হত্যার মাধ্যমে একটা দেশের শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটানো যায়— ট্রাম্পের এমন ধারণা ভুল প্রমাণিত হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রতিরক্ষা উপসহকারী সচিব মাইকেল মালরয় মনে করেন, মাঠে যদি প্রতিপক্ষের স্থলবাহিনী না থাকে কিংবা পুরোপুরি সশস্ত্র অভ্যুত্থান না ঘটে, তাহলে একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা কেবল নিজেদের ঐক্য ধরে রাখার মাধ্যমেই টিকে থাকতে পারে।
“শুধু বিমান হামলার মাধ্যমে শাসন পরিবর্তন সম্ভব নয়। কথা বলার মতো যদি কেউ জীবিত থাকে, তাহলে বুঝতে হবে শাসনব্যবস্থা এখনো বলবৎ আছে।”
স্বল্পমেয়াদের কোনো যুদ্ধ ইরানের গতিপথ পাল্টাতে পারবে না বলে মনে করেন মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক ফারজান সাবেত।
ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, “আমার মতে, কোনো একক নেতাকে হত্যা করলেই সঙ্গে সঙ্গে পুরো ব্যবস্থার পতন ঘটবে না।”
জেনেভা গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউটের এ গবেষক মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে হামলা চালাতে পারে, সেটা ইরানও জানত।
“তারা প্রায় দেড় মাস ধরে সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় পেয়েছে। গত বছরের জানুয়ারিতে যে হামলা হয়েছিল, সেখান থেকেও তারা শিক্ষা নিয়েছে।”
এ কারণে ইরানজুড়ে ছোট ছোট যেসব সামরিক ইউনিট রয়েছে, সেগুলো সদর দপ্তরের সরাসরি নির্দেশনা ছাড়াও যুদ্ধ চালিয়ে নিতে সক্ষম বলে মনে করেন সাবেত।
“ইরানের বিকেন্দ্রীকৃত কাঠামো তাদের কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে সহায়তা করবে,” যোগ করেন এ বিশ্লেষক।
শনিবার স্থানীয় সময় সকালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা শুরুর ঘণ্টা তিনেকের মধ্যে পাল্টা হামলা চালায় ইরান। তারা ইসরায়েলের পাশাপাশি সৌদি আরব, কাতার, ওমান, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতেও মার্কিন ঘাঁটিকেও নিশানা বানিয়েছে।
সাউথ ফ্লোরিডা ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক প্রভাষক আরমান মাহমুদিয়ানের পর্যবেক্ষণ হলো, তেহরানের পক্ষে মার্কিন বা ইসরায়েলি বাহিনীকে পরাস্থ করা সম্ভব নয়।
“তবে ইরান যুদ্ধকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষই যুদ্ধের ইতি টানতে বাধ্য হবে।”
তার মতে, “ইরানের লক্ষ্য হলো পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলে শত্রুপক্ষের যুদ্ধের খরচ সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া।”
সেক্ষেত্রে তেহরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখা, ইরাকের হাশদ আল-শাবি কিংবা ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের লেলিয়ে দেওযার মতো কৌশল নিতে পারে।
ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্সের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গবেষক সারা কেরমানিয়াম বলছেন, “ইরানের শাসক গোষ্ঠী টিকে থাকার জন্য লড়ছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা না থাকায় মানবিক বা আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে তাদের অভ্যন্তরীণ চাপ তুলনামূলক কম।”
তিনি আরও বলেন, “ইরান যদি অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এড়িয়ে এই সংঘাতে টিকে থাকতে পারে, তাহলে সেটাই তাদের সাফল্য ধরা হবে। আর যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, যুক্তরাষ্ট্র তত বেশি চাপের মুখে পড়তে পারে।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের শাসনব্যবস্থার এই টিকে থাকার সক্ষমতার মূলে রয়েছে দ্বৈত সামরিক কাঠামো।
সেখানকার নিয়মিত সেনাবাহিনীই (আরতেশ) কেবল সরকারকে সুরক্ষা দেয় না। পাশাপাশি রয়েছে ইসলামিক রেভোলুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)।
এটি ইরানের একটি শক্তিশালী সমান্তরাল সামরিক বাহিনী, যাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব হলো ‘ভেলায়াত-ই-ফকিহ’ বা দেশটির ইসলামী শাসনব্যবস্থার মূল নীতির সুরক্ষা দেওয়া।
এদের পাশাপাশি রয়েছে বিশাল আধাসামরিক স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী— বাসিজ, যার উপস্থিতি প্রায় প্রতিটি মহল্লায় বিস্তৃত। অভ্যন্তরীণ ভিন্নমত দমন ও অনুগতদের সংগঠিত করার বিষয়ে বাসিজ সদস্যদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
তেহরানের রাজনৈতিক বিশ্লেষক হোসেইন রয়ভারান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা বলয় ধ্বংস হয়ে গেছে। খামেনির উপদেষ্টাসহ নবগঠিত সুপ্রিম ডিফেন্স কাউন্সিলের অনেকেই নিহত হয়েছেন।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি আলি লারিজানির ভাষ্য, রোববারই সেখানে নতুন নেতৃত্বের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন হবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনে তিনি বলেছেন, “শিগগিরই একটা অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিষদ গঠন করা হবে। নতুন নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট, বিচার বিভাগের প্রধান ও গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন ইসলামি আইনজ্ঞ যৌথভাবে দায়িত্ব পালন করবেন।”
প্রেসিডেন্ট, বিচার বিভাগের প্রধান ও গার্ডিয়ান কাউন্সিলের আইনজ্ঞের মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্ব পরিষদ গঠন করাকে ইরানের শাসনব্যবস্থা টিকে থাকার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
রয়ভারান বলেন, “ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থাটা এমনভাবে সাজানো, যা ব্যক্তিনির্ভর নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক। অর্থাৎ রাজনৈতিক নেতৃত্ব হঠাৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও রাষ্ট্রব্যবস্থা ‘স্বয়ংক্রিয় পদ্ধদিতে’ চলতে সক্ষম।”
কোনো কোনো বিশ্লেষক বলছেন, ইরান কোন দিকে যাচ্ছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সেন্টার ফর মিডল ইস্ট স্ট্র্যাটিজিক স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক আব্বাস আসলানি বলেন, “ইরানের কর্মকর্তারা বোঝাতে চাইছেন যে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকরভাবে কাজ করছে।”
আল জাজিরাকে তিনি বলেন, “আজও (রোববার) রাজধানী তেহরানসহ ইরানের অন্যান্য শহরের সামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বিমান হামলা চালিয়েছে। এ ধরনের হামলা অব্যাহত থাকতে পারে, এমনকি আরও তীব্র হতে পারে।”
তবে এ ধরনের হামলা বেশির ভাগ ইরানির কাছে গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে করেন এই বিশ্লেষক।
টিকে থাকতে ধর্মতন্ত্র থেকে জাতীয়তাবাদে: মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার প্রেক্ষাপটে ইরানের শাসনব্যবস্থায় তাৎক্ষণিক পরিবর্তনটা হলো, ধর্ম থেকে সরে গিয়ে জাতীয়তাবাদে ঝুঁকে পড়া।
কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারা মনে করছেন, খামেনির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জনগণের একটি বড় অংশের সঙ্গে তাদের আধ্যাত্মিক বন্ধন ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। তাই এ যুদ্ধকে তারা 'ধর্মতন্ত্র রক্ষার' পাশাপাশি ইরানের 'আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষার’ লড়াই হিসেবেও দেখাতে চাইছেন।
ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়ার অন্যতম প্রধান ব্যক্তি ও রক্ষণশীল প্রভাবশালী নেতা লারিজানি এরই মধ্যে ইরানিদের উদ্দেশে বলেছেন, ইসরায়েলের মূল লক্ষ্য হলো ইরানকে ‘বিভক্ত করে ফেলা’।
বিভক্ত করে ফেলার এই ভয় দেখিয়ে ইরানের নেতৃত্ব চাইছে, দেশের জনগণ যেন বাইরের শত্রুদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই কৌশল যুক্তরাষ্ট্রের হিসাব-নিকাশকে বেশ জটিল করে তুলেছে।
খামেনির মৃত্যুতে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে ইরান। এই সিদ্ধান্তকে আদতে বিরোধীদের জন্য পাতা একটি ‘ফাঁদ’ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানী সালেহ আল-মুতাইরি।
তিনি বলছেন, এতে করে রাস্তাঘাট লাখ লাখ শোকার্ত মানুষে পূর্ণ থাকবে, যা সরকারের জন্য মানবঢাল হিসেবে কাজ করবে। ফলে সরকারবিরোধী আন্দোলন দানা বাঁধাটা কঠিন হয়ে পড়বে।
শেষ হতে পারে 'কৌশলগত ধৈর্য্য': বিশ্লেষকদের মতে, হামলার প্রাথমিক ধাক্কা সামলে নিতে পারলে যে নতুন ইরানের উদয় ঘটবে, তা সম্ভবত আগের চেয়ে আক্রমণাত্মক হবে। কারণ, বছরের পর বছর ধরে খামেনি যে ‘কৌশলগত ধৈর্য্য’ দেখিয়েছেন, তাতে যুদ্ধ এড়াতে তিনি অনেক আঘাতই সহ্য করেছেন।
তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাসান আহমাদিয়ান বলেন, “সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর সঙ্গে সেই যুগের বিদায় ঘটেছে।”
আল জাজিরাকে তিনি বলেন, "গেল জুনের যুদ্ধ থেকে ইরান একটা কঠিন শিক্ষা পেয়েছে। সেটা হলো, সংযম দুর্বলতা হিসেবে গণ্য হয়।
“তেহরানের নতুন রণকৌশল সম্ভবত ‘ধ্বংসাত্মক নীতির’ পথেই হাঁটতে যাচ্ছে।”
আহমাদিয়ার ভাষ্য, “সিদ্ধান্ত এরই মধ্যে নেওয়া হয়ে গেছে— যদি আক্রান্ত হয়, তবে ইরান সবকিছু জ্বালিয়ে দেবে।"
তার মতে, ইরানের এবারের প্রতিক্রিয়া আগের যেকোনো সংঘাতের চেয়ে অনেক বেশি ব্যাপক ও তীব্র হবে।
এমনটা ঘটলে ইরানে এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে, যেখানে মাঠ পর্যায়ের কমান্ডাররা ধর্মীয় নেতৃত্বের সংযম দেখানোর মতাদর্শ থেকে বেরিয়ে উগ্রতার সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়বে। উৎস: বিডিনিউজ24