ভেনেজুয়েলায় চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক অভিযানে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করার ঘটনা ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। কঠোর নিরাপত্তায় ঘেরা দুর্গসদৃশ সরকারি বাসভবন থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাকে সরিয়ে নেওয়া কীভাবে সম্ভব হলো—তা নিয়ে শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন ওঠে। অনেকের ধারণা, ভেতরের কারও সহায়তা ছাড়া এমন অভিযান বাস্তবায়ন করা প্রায় অসম্ভব।
এরপর রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, মাদুরোর ঘনিষ্ঠ একজন ব্যক্তি নিয়মিতভাবে তার অবস্থান ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএকে সরবরাহ করছিলেন। এর ফলে অভিযানের আগেই যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোর চলাফেরা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিস্তারিত ধারণা পায়। তবে ওই ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ না করায় জল্পনা আরও তীব্র হয়।
এ প্রেক্ষাপটে রয়টার্সের আরেকটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, মাদুরোকে গ্রেপ্তারের কয়েক মাস আগ থেকেই ভেনেজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেলোর সঙ্গে গোপন যোগাযোগ বজায় রাখছিল ট্রাম্প প্রশাসন। এমনকি অভিযানের পরও এই যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলো জানায়, যুক্তরাষ্ট্র কাবেলোকে সতর্ক করে দিয়েছিল যেন তার অধীনস্থ নিরাপত্তা বাহিনী বা ক্ষমতাসীন দলের সশস্ত্র সমর্থকদের ব্যবহার করে বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়ন চালানো না হয়। কাবেলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ এবং সামরিক বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা মাদুরো অপসারণের পরও প্রায় অপরিবর্তিতভাবে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, যে মাদক পাচার মামলায় মাদুরোকে আটক করা হয়েছে, সেই একই মামলায় কাবেলোর নামও রয়েছে। তা সত্ত্বেও অভিযানের সময় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। সূত্রগুলোর দাবি, ট্রাম্প প্রশাসনের শুরুর দিক থেকেই কাবেলোর সঙ্গে যোগাযোগ ছিল এবং মাদুরো অপসারণের ঠিক আগ মুহূর্ত পর্যন্ত এই আলোচনা চলেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কাবেলোর ভূমিকা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। ওয়াশিংটনের আশঙ্কা, কাবেলো যদি তার নিয়ন্ত্রণাধীন বাহিনী পুরোপুরি সক্রিয় করেন, তাহলে দেশজুড়ে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের অবস্থান দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাবেলোর আলোচনায় ভবিষ্যৎ সরকারব্যবস্থা নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়েছে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। প্রকাশ্যে তিনি রদ্রিগেজের প্রতি আনুগত্য দেখালেও বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি ও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখছেন বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
ভেনেজুয়েলায় দীর্ঘদিন ধরেই দিয়োসদাদো কাবেলোকে দ্বিতীয় সর্বাধিক ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে দেখা হয়। সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজের ঘনিষ্ঠ এই সহযোগী পরবর্তীতে মাদুরোর শাসনামলে দমননীতির প্রধান রূপকার হিসেবে পরিচিত হন। সামরিক ও বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থার ওপর তার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে এবং সরকারপন্থি সশস্ত্র মিলিশিয়া ‘কোলেকতিভো’দের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র কাবেলোর বিরুদ্ধে বহু বছর ধরে নিষেধাজ্ঞা জারি রেখেছে। ২০২০ সালে তাকে একটি বড় মাদক পাচার চক্রের শীর্ষ নেতা হিসেবে অভিযুক্ত করে তার মাথার দাম ঘোষণা করা হয়, যা পরে বাড়িয়ে ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার করা হয়। যদিও তিনি এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন।
মাদুরো অপসারণের পর মার্কিন রাজনীতিতেও প্রশ্ন ওঠে—কাবেলোকে কেন আটক করা হয়নি। কেউ কেউ মনে করেন, তিনি মাদুরোর চেয়েও বেশি বিপজ্জনক হতে পারেন। যদিও কাবেলো যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে নিরাপত্তা তল্লাশি কিছুটা কমেছে এবং রাজনৈতিক বন্দিমুক্তির ঘোষণা এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আপাতত ভেনেজুয়েলার স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং দেশটির তেলসম্পদ ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র কাবেলোর মতো প্রভাবশালী নেতাদের ওপর নির্ভর করছে। তবে তার অতীত ভূমিকা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ভবিষ্যতে ওয়াশিংটনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। সূত্র: রয়টার্স।