শিরোনাম
◈ সাগর খালি, ঘাট নীরব: কক্সবাজারে সামুদ্রিক মাছের সংকট ◈ প‌রিচালক নাজমুল বি‌সি‌বি থে‌কে পদত‌্যাগ না করা পর্যন্ত  মাঠে নামবেন না ক্রিকেটাররা: সংবাদ স‌ম্মেল‌নে কোয়াব সভাপ‌তি ◈ সাফ ফুটসাল চ‌্যা‌ম্পিয়ন‌শি‌পে বাংলা‌দে‌শের কা‌ছে পাত্তাই পে‌লো না ভারত ◈ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনায় তাড়াহুড়ো কেন, প্রশ্ন সিপিডির  ◈ অনির্দিষ্টকালের জন্য বিপিএল স্থগিত করলো বিসিবি ◈ ইসলামী আন্দোলনের জন্য অপেক্ষা, ৫০ আসন ফাঁকা রেখেই সমঝোতা ১০ দলের! ◈ বিপিএলের ম্যাচ দেখতে না পারায় মিরপুর স্টেডিয়ামের বাইরে বিক্ষুব্ধ জনতার ভাংচুর (ভিডিও) ◈ দাবি আদায়ে বারবার সড়ক অবরোধের প্রবণতা, দায় কার? ◈ রাস্তায় দাঁড়িয়ে নিয়োগপ্রত্যাশী শিক্ষকদের কথা শুনলেন তারেক রহমান ◈ শহীদ হাদি হত্যা মামলায় নতুন মোড়, পুনঃতদন্তের নির্দেশ

প্রকাশিত : ১৫ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৬:৪৫ বিকাল
আপডেট : ১৫ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৮:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

ইরানের অস্থিরতা কেন ভারতের জন্য কৌশলগত দুশ্চিন্তার কারণ

অর্থনৈতিক সংকট ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ক্লান্তি থেকে সৃষ্ট গণবিক্ষোভ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্ব। এই প্রেক্ষাপটে ইরানের পরিস্থিতি গভীর উদ্বেগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে ভারত। কারণ, ভৌগোলিক বাস্তবতা, আঞ্চলিক ভারসাম্য ও কৌশলগত প্রয়োজনে নয়াদিল্লি ও তেহরানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।

আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় ভারতের স্থলপথ বন্ধ করে রেখেছে পাকিস্তান। এমন পরিস্থিতিতে পশ্চিমমুখী যোগাযোগের ক্ষেত্রে ইরানই ভারতের একমাত্র কার্যকর করিডর। পাশাপাশি তেহরানের শিয়া নেতৃত্ব পাকিস্তানের প্রভাবের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য রক্ষা করে এসেছে, যা ভারতের সুপরিকল্পিত পশ্চিম এশিয়া নীতির একটি স্থিতিশীল ভিত্তি।

এখন ইরান যদি দুর্বল হয়ে পড়ে বা রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়ে, তাহলে আঞ্চলিক রাজনীতিতে ভারতের কৌশলগত পরিসর আরও সংকুচিত হবে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তন, পাকিস্তান থেকে সন্ত্রাসী হুমকি, চীনের আঞ্চলিক বিস্তার ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির কারণে একের পর এক বৈশ্বিক সংকটে পড়েছে ভারত। এর মধ্যে ইরানের চলমান অস্থিতিশীলতা কূটনৈতিক সমীকরণ, বাণিজ্যপথ ও নিরাপত্তার হিসাব-নিকাশে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে—যা সামাল দিতে ভারতের বহু বছর সময় লেগে যাবে।

প্রশ্ন হতে পারে, কেন ইরান ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ? পাকিস্তানের বাধার কারণে আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে ভারতের সরাসরি স্থলযোগাযোগ নেই। এই প্রেক্ষাপটে ইরান ভারতের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য ‘ল্যান্ড ব্রিজ’। আর এই জায়গায় ভারতের পশ্চিমমুখী সংযোগের কেন্দ্রবিন্দু হলো ইরানের চাবাহার বন্দর। এই বন্দর ব্যবহার করে পাকিস্তানকে পাশ কাটিয়ে স্থল ও রেলপথে মধ্য এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে নয়াদিল্লি।

তবে যেকোনো সংযোগ করিডরের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। তেহরানে যদি শাসন পরিবর্তন বা ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুরু হয়, তাহলে এই প্রকল্প মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।

জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাজন কুমার দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়াকে বলেন, খামেনি-পরবর্তী ক্ষমতার লড়াই শুরু হলে চাবাহার কৌশলগত সম্পদ না হয়ে অস্থিরতায় জিম্মি হয়ে পড়তে পারে।

অন্যদিকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়া সত্ত্বেও ইরান ঐতিহাসিকভাবে পাকিস্তানের প্রভাবের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। তেহরানের শিয়া নেতৃত্ব পাকিস্তানে সক্রিয় সুন্নি চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর কড়া সমালোচক।

নব্বইয়ের দশক ও ২০০০-এর শুরুর দিকে ইরানের এই শিয়া অবস্থান ভারতের জন্য সহায়ক ছিল। তখন পাকিস্তানের সমর্থনে তালেবান আফগানিস্তানে ‘স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ’ বা কৌশলগত গভীরতা নিশ্চিত করতে চেয়েছিল। বিপরীতে ইরান ও ভারত তালেবানবিরোধী শক্তিগুলোকে সমর্থন দিচ্ছিল। এর ফলে আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে পাকিস্তানের একচেটিয়া প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি।

এমনকি ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে কাশ্মীর ইস্যুতে পাকিস্তান যখন ভারতের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চেষ্টা চালায়, তখন তেহরান দিল্লির পাশে দাঁড়ায়।

এমন পরিস্থিতিতে ইরান যদি অভ্যন্তরীণভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে পাকিস্তান পরোক্ষভাবে লাভবান হবে এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে বড় একটি প্রতিরোধক শক্তি হারাবে ভারত।

এ ছাড়া ইরান ভারতের অষ্টম বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। গত এক বছরে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৩০ কোটি থেকে ১৭০ কোটি মার্কিন ডলার। এর পাশাপাশি চাবাহার ও সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে ভারত এক বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার চাপে ভারত ইতিমধ্যে প্রকল্পের কিছু অংশ পুনর্গঠন করেছে। তবে শাসন পরিবর্তন হলে এই বিনিয়োগ সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়বে, যার প্রভাব পড়বে ভারতীয় করদাতাদের অর্থের ওপর।

এদিকে পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ইরান ভারতের পক্ষে ভারসাম্য রক্ষা করলেও চীনের প্রতি তেহরানের টান অস্বীকার করার উপায় নেই। ২০২১ সালে ইরান ও চীন ২৫ বছরের কৌশলগত সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে। এর প্রতিফলন বাণিজ্যেও দেখা যাচ্ছে।

২০২৫ সালে চীন ছিল ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। ওই বছর ১৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি ইরানি পণ্য রপ্তানি হয়েছে চীনে।

পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় ইরানের অর্থনীতি বিপর্যস্ত হওয়ায় ছাড়ে তেল বিক্রি ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগসহ বিভিন্ন খাতে তেহরান চীনের ওপর নির্ভর করছে। এই বাস্তবতায় চাবাহারে ভারতের উপস্থিতি চীনের প্রভাবের বিরুদ্ধে সীমিত হলেও গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য তৈরি করেছে। তাই ইরানে দীর্ঘস্থায়ী বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে বা নতুন সরকার এলেও তারা নিরাপত্তা ও বিনিয়োগের জন্য বেইজিংয়ের দিকেই ঝুঁকবে।

এই পরিস্থিতিতে ভারত তাহলে কী করতে পারে? সাবেক কূটনীতিক এবং যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও শ্রীলঙ্কায় ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করা নীরূপমা মেনন রাও বলছেন, ইরান ইস্যুতে ভারতের অবস্থান হওয়া উচিত পরিমিত ও সতর্ক।

এক্সে দেওয়া এক পোস্টে নীরূপমা লিখেছেন, ‘ইরানের পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে বাইরের শক্তিগুলো আর কোনোভাবে তাদের প্রভাবিত করতে পারবে না। তাই প্রথম দায়িত্ব হলো সুরক্ষা। ইরান ও আশপাশের অঞ্চলে থাকা ভারতীয় নাগরিকদের স্বার্থরক্ষা। ভারতকে সব দিক থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে, তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত এড়িয়ে চলতে হবে এবং একক পূর্বাভাস নয়, বরং একাধিক সম্ভাব্য দৃশ্যপট ধরে প্রস্তুতি নিতে হবে।’

নীরূপমা রাও আরও বলেন, ‘মূল বিষয় মন্তব্য নয়, প্রস্তুতি। পশ্চিম এশিয়ায় অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়লে তা জ্বালানি বাজার, নৌপথ, প্রবাসী নিরাপত্তা ও চরমপন্থীদের দ্রুত প্রভাবিত করে। দক্ষিণ এশিয়াও এর বাইরে নয়। তাই ভারতের কৌশল হওয়া উচিত—কৌশলগত সতর্কতা, ধারাবাহিক যোগাযোগ এবং নানাভাবে মূল্যায়ন; সংকটের মাঝে অতিরিক্ত বা অতিরঞ্জিত ব্যাখ্যা থেকে বিরত থাকা।’

তথ্যসূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া ও এনডিটিভি

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়