ভারতের ওডিশা রাজ্যে পশ্চিমবঙ্গের এক মুসলিম তরুণকে ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে মারধর করা হয়েছে। এমনকি তাঁকে পুড়িয়ে ফেলার চেষ্টাও করা হয়। পরে তিনি পোড়ানোর ঠিক আগে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিয়ে প্রাণে রক্ষা পান। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
মারধরের শিকার পশ্চিমবঙ্গের ওই তরুণের নাম রহুল ইসলাম। শীতকালীন পোশাক বিক্রেতা ওডিশার গণজাম জেলার একটি গ্রামে গিয়ে গ্রামবাসীর মারধরের শিকার হন। কিল–ঘুষি আর লাথির পর যখন তাঁকে পুড়িয়ে মারার হুমকি দেওয়া হয়, তখন তিনি ভয়ে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিয়ে প্রাণে বাঁচেন।
২৪ বছরের রহুল ইসলাম পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের বাসিন্দা। শীতের পোশাক বিক্রি করতে তিনি ওডিশার গণজাম জেলার এক গ্রামে গিয়েছিলেন। সেখানে তাঁকে বাংলাদেশি বলে চিহ্নিত করে নির্যাতন করা হয়। এ বছর ওডিশায় পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর ধারাবাহিক পুলিশি আটক ও জনতার হামলার প্রেক্ষাপটে এই ঘটনা নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।
গত অক্টোবরে ওডিশায় শীতের পোশাক বিক্রি করতে যাওয়া রহুলের দুই সঙ্গীও গণজাম ও গজপতি জেলায় আলাদা জায়গায় ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে হামলার শিকার হন। তিনজনই বৃহস্পতিবার ওডিশা থেকে পালিয়ে আসতে বাধ্য হন।
পরিযায়ী শ্রমিকদের সংগঠন ‘পরিযায়ী শ্রমিক ঐক্য মঞ্চের’ সভাপতি এবং পশ্চিমবঙ্গ মাইগ্র্যান্ট ওয়ার্কার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের বোর্ড সদস্য রিপন এসব ঘৃণাজনিত অপরাধ নিয়ে শনিবার ওডিশার ডিরেক্টর-জেনারেল অব পুলিশের কাছে ই–মেইলে অভিযোগ করেছেন। রিপনের দাবি, ওডিশা পুলিশ ভুক্তভোগীদের সাহায্য করতে অস্বীকার করেছে এবং উল্টো তাদের রাজ্য ছাড়তে বলেছে।
টেলিগ্রাফকে রহুল ইসলাম বলেন, ‘ওডিশায় কাজ করতে যাওয়া কি অপরাধ?’ তিনি জানান, ২৪ নভেম্বর রাণিপদা গ্রামে উলের তৈরি জামা, মশারি আর অন্যান্য সামগ্রী বিক্রি করতে গেলে তাঁকে আক্রমণ করা হয়। তিনি বলেন, ‘হঠাৎ এক ব্যক্তি এসে জিজ্ঞেস করল কেন আমি সেখানে গিয়েছি। গালাগাল করতে করতে বলে, আমি নাকি বাংলাদেশি। এরপর আধার কার্ড দেখতে চাইল।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি কার্ড দেখাতেই বলল এটা নকল। তখন আরও লোক জড়ো হলো। সবাই মিলে আমাকে গালাগাল করতে লাগল। তাদের একজন বলল, ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে। প্রথমে রাজি হইনি। তারা আমাকে মারতে থাকে। পরে পেট্রল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার হুমকি দিলে প্রাণভয়ে ‘জয় শ্রীরাম’ বলি। তারপর তারা আমার মালপত্রসহ আমাকে ছেড়ে দেয়।’
স্থানীয় কোডালা থানার ওসি সুবাস বেহেরা বলেন, এ ধরনের কোনো ঘটনার খবর তার জানা নেই।
রহুল জানান, তাঁর দুই বন্ধু ২৫ ও ২৬ নভেম্বর গজপতির চাক্কা পাদার এবং গণজামের জগন্নাথ প্রসাদ এলাকায় একইভাবে হামলার শিকার হন। রহুলকে মারধরের ভিডিও রিপন পুলিশের কাছে পাঠিয়েছেন। এটি হামলাকারীদের কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলেছিল বলে জানা গেছে।
ডিজিপিকে পাঠানো ই–মেইলেে রিপন লিখেছেন, ‘রহুল ইসলামের বাবা মুকুল চাঁদ শেখ জানিয়েছেন, তারা স্থানীয় পুলিশকে বিষয়টি জানালেও পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বরং তাদের বাড়ি ফিরে যেতে এবং ওডিশায় আর ব্যবসা না করতে বলা হয়েছে। অন্য রাজ্যে গিয়ে কাজ করা কি বেআইনি? তাই তারা ২৭ নভেম্বর ফিরে আসেন।’
এ বছর আরও বহু পশ্চিমবঙ্গীয় শ্রমিক ওডিশায় পুলিশি হয়রানির মুখে পড়েছেন। মুর্শিদাবাদের শমশেরগঞ্জের মোহিসাস্থিল গ্রামের মো. সাইফুদ্দিন মোমিন টেলিগ্রাফকে বলেন, ‘দাড়ি রাখা কি অপরাধ? ওডিশায় কাজ করতে যাওয়া কি অপরাধ? এসব প্রশ্নের উত্তর আমার নেই।’ তিনি জানান, কয়েক সপ্তাহ আগে তিনি ও তাঁর সহকর্মীদের বাংলাদেশি সন্দেহে ওডিশার ভদ্রক পুলিশ তিন দিন ধরে আটকে রেখেছিল, সরকারি নথি দেখানোর পরও। শেষমেশ পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ পরিচয় নিশ্চিত করলে তারা ছাড়া পান।
সূত্র: আজকের পত্রিকা