পার্সটুডে : পর্তুগাল দক্ষিণ-পশ্চিম ইউরোপে অবস্থিত একটি দেশ, যেটি অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের মতো ঔপনিবেশিক ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত। পর্তুগালের ঔপনিবেশিক শাসনামলে অ্যাঙ্গোলা, মোজাম্বিক, ব্রাজিল, কেপ ভার্দ, পূর্ব তিমুর এবং ভারতের কিছু অংশ পর্তুগিজদের অধীনে ছিল। এই নিবন্ধে পর্তুগিজ বাহিনীর অ্যাঙ্গোলায় ঔপনিবেশিক ইতিহাস নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।
পর্তুগিজ উপনিবেশিকরা ১৪৮৩ সালে বর্তমান অ্যাঙ্গোলায় প্রবেশ করে। তখন অ্যাঙ্গোলা ছিল আফ্রিকার সবচেয়ে সম্পদশালী দেশগুলোর অন্যতম, যেখানে সমৃদ্ধ কৃষি, খনিজ সম্পদ (বড় আকারের সোনা ও হীরার খনি), এবং বৃহৎ তেলক্ষেত্র ছিল। ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে এটি দক্ষিণ আফ্রিকার ঘটনাবলীতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।
একদিকে ছিল পর্তুগালের উপনিবেশিক প্রকল্প, অন্যদিকে অ্যাঙ্গোলা, যা সতেরো ও আঠারো শতকে পর্তুগালের জন্য দাস ব্যবসার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ছিল।
প্রায় পাঁচশত বছর ধরে পর্তুগাল অ্যাঙ্গোলার ওপর শাসনকার্য পরিচালনা করে। এই সময়ে, পর্তুগিজ শাসকগোষ্ঠী খনিজ এবং তেল সম্পদ লুটের পাশাপাশি, দাস বাণিজ্যও প্রসার করে। প্রায় পাঁচ শতকের মধ্যে আঙ্গোলার প্রায় আট মিলিয়ন মানুষ দাস হিসেবে শোষিত হয়।
আঠারো শতকে পশ্চিম আফ্রিকা থেকে মোট রপ্তানি করা দাসের সংখ্যা আনুমানিক ৬ লাখ ১১ হাজার বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু একই সময়কালে, পর্তুগাল কেবল অ্যাঙ্গোলা থেকেই যে পরিমাণ দাস রপ্তানি করেছিল তা মোট রপ্তানির দ্বিগুণেরও বেশি ছিল, অর্থাৎ ১৪ লাখ ১৪ হাজার জন!
এছাড়া, অনেক অ্যাঙ্গোলীয় মানুষকে জোরপূর্বক কৃষি খামারে শ্রম দিতে বাধ্য করা হয়েছিল। ধীরে ধীরে, অ্যাঙ্গোলার মানুষ পর্তুগালের ঔপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। স্থানীয় বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাথমিক পর্যায়ের সহিংসতা ১৯৬১ সালের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। জানুয়ারি মাসের ৩ ও ৪ তারিখে সংঘটিত নৃশংস হত্যাকাণ্ডে পর্তুগিজ সৈন্যরা কমপক্ষে ৫,০০০ অ্যাঙ্গোলীয় নাগরিককে হত্যা করে।
অ্যাঙ্গোলায় পর্তুগিজ বাহিনী
সেই বছরের মার্চ মাসে অ্যাঙ্গোলার কিছু কৃষক উত্তরাঞ্চলের মজুরির শর্তাবলী সংশোধন করার দাবি জানালে পর্তুগালি সেনারা অ্যাঙ্গোলার কিছু এলাকা (ইকোলো বেঙ্গো ও বায়া দেকাসাঞ্জ) বোমাবর্ষণ করে ১৭টি গ্রাম ধ্বংস করে। এই নৃশংস হামলায় প্রায় ২০,০০০ অ্যাঙ্গোলীয় নিহত হয়। বিভিন্ন সূত্র মতে, ১৯৬১ সালের প্রথম আট মাসে পর্তুগিজদের হাতে নিহত অ্যাঙ্গোলীয়দের সংখ্যা ৫০,০০০-এ পৌঁছায়।
পর্তুগিজদের অপরাধযজ্ঞের বর্ণনা পশ্চিমা সংবাদ মাধ্যম 'লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস'-এর প্রতিবেদনের প্রকাশিত হয়েছে; যা যেকোনো মানুষের হৃদয়কে ব্যথিত করে। এই মার্কিন সংবাদমাধ্যম লিখেছে, পর্তুগিজ বাহিনী অ্যাঙ্গোলার মুক্তিযোদ্ধাদের মাথা কেটে রাস্তার দুই পাশের গাছে ঝুলিয়ে দিত। পর্তুগিজরা শত শত বন্দিকে নির্যাতন করে হত্যার পর তাদের গণকবরে পুঁতে ফেলত।
অ্যাঙ্গোলার মুক্তি আন্দোলনের বিকাশের চিত্র
পর্তুগিজরা না কেবল ঘাস দিয়ে তৈরি ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিত না, বরং তারা আফ্রিকার পরিবেশের প্রতিও নির্দয় আচরণ করত। জ্বলন্ত রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে বনাঞ্চল জ্বালিয়ে দিত।
এই নৃশংসতা ও অমানবিক নিপীড়ন না কেবল অ্যাঙ্গোলার মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে ভাঙতে পারেনি, বরং তা ছাইচাপা আগুনের মতো ক্রোধ ও ঐক্যকে উসকে দিয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত আফ্রিকার ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা করেছিল। দশকব্যাপী প্রতিরোধ ও ত্যাগের পর, অ্যাঙ্গোলার মানুষ শেষ পর্যন্ত ১৯৭৫ সালের ১১ নভেম্বর স্বাধীনতা লাভ করে এবং পর্তুগালের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি পায়।