জীবনযাত্রায় যৌন আকাঙ্ক্ষা ও জৈবিক তাড়না স্বাভাবিক বিষয়। তবে এই সহজাত অনুভূতি যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং তীব্র যৌন চিন্তা, ফ্যান্টাসি ও বাধ্যতামূলক আচরণে পরিণত হয়, তখন তা ব্যক্তির স্বাভাবিক জীবনযাপন, কাজ, সম্পর্ক ও মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোচনায় এ ধরনের সমস্যাকে হাইপারসেক্সুয়ালিটি বা অনিয়ন্ত্রিত যৌন আচরণ হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
‘হেলথ ডটকম’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, হাইপারসেক্সুয়ালিটি সব ক্ষেত্রে আলাদা কোনো মানসিক রোগ হিসেবে স্বীকৃত না হলেও, নিয়ন্ত্রণহীন যৌন আচরণ ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পেশাজীবন ও আর্থিক জীবনে গুরুতর সমস্যা তৈরি করতে পারে।
হাইপারসেক্সুয়ালিটির লক্ষণ কী?
সাধারণ যৌন আকাঙ্ক্ষা ও অনিয়ন্ত্রিত যৌন আচরণের মধ্যে পার্থক্য করা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি লক্ষণের মাধ্যমে সমস্যাটি চিহ্নিত করা যেতে পারে।
নিয়ন্ত্রণহীন যৌন চিন্তা ও ফ্যান্টাসি:
বারবার যৌন চিন্তা বা ফ্যান্টাসি মাথায় আসা এবং তা দৈনন্দিন কাজ, পড়াশোনা কিংবা পেশাগত দায়িত্ব পালনে মনোযোগের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করা।
পুনরাবৃত্তিমূলক যৌন আচরণ:
পর্নোগ্রাফি দেখা বা হস্তমৈথুনের মতো আচরণ যখন ব্যক্তিগত আনন্দের চেয়ে মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা অস্বস্তি কমানোর জন্য বাধ্যতামূলকভাবে বারবার করা হয়।
আচরণ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা:
নিজের আচরণ কমানো বা বন্ধ করার চেষ্টা করেও বারবার একই আচরণে ফিরে যাওয়া এবং এর নেতিবাচক পরিণতি সম্পর্কে জানার পরও তা চালিয়ে যাওয়া।
অপরাধবোধ ও মানসিক অস্বস্তি:
যৌন আচরণের পর তীব্র অপরাধবোধ, লজ্জা, হতাশা বা একাকিত্ব তৈরি হওয়া।
কেন হাইপারসেক্সুয়ালিটি হতে পারে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে একাধিক মানসিক ও আচরণগত কারণ থাকতে পারে।
বাইপোলার ডিসঅর্ডার:
বাইপোলার ডিসঅর্ডারের ম্যানিয়া বা হাইপোম্যানিয়া পর্যায়ে কিছু মানুষের যৌন আকাঙ্ক্ষা ও ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ বেড়ে যেতে পারে। তবে অতিরিক্ত যৌন আকাঙ্ক্ষা থাকলেই যে কারও বাইপোলার ডিসঅর্ডার রয়েছে, এমন নয়।
মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও বিষণ্ণতা:
কেউ কেউ উদ্বেগ, একাকিত্ব, মানসিক চাপ বা বিষণ্ণতা থেকে সাময়িক স্বস্তি পাওয়ার জন্য যৌন আচরণকে ব্যবহার করতে পারেন। সময়ের সঙ্গে এটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
শৈশবের ট্রমা ও মানসিক আঘাত:
কিছু ক্ষেত্রে অতীতের মানসিক আঘাত বা দীর্ঘস্থায়ী প্রতিকূল অভিজ্ঞতা পরবর্তী জীবনে আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও আচরণগত সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে এটি সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
আচরণগত আসক্তি:
কিছু অনিয়ন্ত্রিত যৌন আচরণকে আচরণগত আসক্তির কাঠামোর মধ্যে দেখা হয়। পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ সাময়িকভাবে স্বস্তি বা উত্তেজনা তৈরি করায় ব্যক্তি বারবার একই আচরণে ফিরে যেতে পারেন।
চিকিৎসা কী?
সমস্যাটি ব্যক্তির দৈনন্দিন জীবন বা সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসার ধরন ব্যক্তির কারণ ও উপসর্গের ওপর নির্ভর করে।
কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (CBT) এবং অন্যান্য সাইকোথেরাপি কিছু মানুষের ক্ষেত্রে চিন্তা ও আচরণের ধরন পরিবর্তনে সহায়ক হতে পারে। পাশাপাশি মানসিক চাপ, বিষণ্ণতা, উদ্বেগ বা অন্য কোনো মানসিক সমস্যার উপস্থিতি থাকলে চিকিৎসক সেটিরও চিকিৎসা করতে পারেন।
কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ ব্যবহার করা হতে পারে। তবে নিজে থেকে অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট বা অন্য কোনো ওষুধ গ্রহণ করা উচিত নয়।
কখন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত?
যদি যৌন চিন্তা বা আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যায়, কাজ বা পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটে, সম্পর্ক নষ্ট হতে থাকে, ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ বাড়তে থাকে কিংবা এসব কারণে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক অস্বস্তি তৈরি হয়—তাহলে একজন নিবন্ধিত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা সাইকোথেরাপিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
হাইপারসেক্সুয়ালিটি নিয়ে লজ্জা বা আত্মদোষারোপ না করে বিষয়টিকে মানসিক স্বাস্থ্য ও আচরণগত সমস্যা হিসেবে দেখা গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক মূল্যায়ন ও পেশাদার সহায়তার মাধ্যমে এর নিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসা সম্ভব।