মনিরুল ইসলাম: বাংলাদেশের বিনোদন অঙ্গনে নতুন করে আলোচনায় এসেছে একটি পুরোনো প্রশ্ন—গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কে বেশি আলোচনায় থাকছেন, আর প্রকৃত অর্থে কারা শিল্পচর্চা করছেন? বর্তমান সময়ে ভাইরাল কনটেন্ট, অস্বাভাবিক কর্মকাণ্ড ও আলোচিত নানা ঘটনা অনেক সময় শিল্পমানের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাম্প্রতিক সময়ে ঢালিউড অভিনেতা জায়েদ খানকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা এ বিতর্ককে আরও সামনে এনেছে। বিদেশে অবস্থানকালে তাঁর বিভিন্ন স্টেজ শো, পারফরম্যান্স ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও নিয়মিতই আলোচনার বিষয় হয়ে উঠছে।
জায়েদ খান ২০২৪ সালের জুলাই থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও স্টেজ শোতেও অংশ নিয়েছেন তিনি। এসব কর্মকাণ্ডের বেশ কিছু ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
ভাইরাল কনটেন্ট বনাম শিল্পমান
বর্তমান মিডিয়া ইকোসিস্টেম অনেকটাই ভিউ, ক্লিক ও এনগেজমেন্টনির্ভর। ফলে যে কনটেন্ট দ্রুত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, সেটিই অনেক সময় সংবাদ ও আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। এর ফলে শিল্পীর কাজের মান, সৃজনশীলতা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি অবদান অনেক ক্ষেত্রে আড়ালে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গণমাধ্যমে ভাইরাল বিষয়গুলো গুরুত্ব পাওয়ার পেছনে দর্শক-শ্রোতার আগ্রহও বড় একটি কারণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ভিডিও বা ঘটনা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে সেটি দ্রুত সংবাদে পরিণত হয়। ফলে অনেক সময় গণমাধ্যমও ট্রেন্ড অনুসরণ করতে বাধ্য হয়।
তবে এর বিপরীতে প্রশ্ন উঠছে—ভাইরাল হওয়াই কি একজন শিল্পীর জনপ্রিয়তা বা গুরুত্বের একমাত্র মানদণ্ড হওয়া উচিত?
সময়ের সঙ্গে বদলেছেন শাকিব খান
ঢালিউডের শীর্ষ তারকা শাকিব খানের ক্যারিয়ারকে এ ক্ষেত্রে একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়। তাঁর ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে বিদেশি লোকেশনে গান, অতিরঞ্জিত নাচ ও চমকপ্রদ দৃশ্য দর্শক আকর্ষণের অন্যতম উপকরণ ছিল।
তবে সময়ের সঙ্গে দর্শকের রুচি ও চলচ্চিত্রের বাজারে পরিবর্তন এসেছে। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজের অভিনয়, চরিত্র নির্বাচন ও কাজের ধরনেও পরিবর্তন এনেছেন শাকিব খান।
চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্টদের মতে, একজন শিল্পীর দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
আলোচনার বাইরে থেকে যাচ্ছেন অনেক প্রতিভাবান শিল্পী
দেশে অসংখ্য প্রতিভাবান সংগীতশিল্পী, অভিনেতা ও নির্মাতা রয়েছেন, যাঁরা নিয়মিত ভালো কাজ করছেন। কিন্তু তাঁদের অনেকের কাজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল না হওয়ায় মূলধারার আলোচনায় পর্যাপ্ত জায়গা পাচ্ছে না।
ফলে শিল্পাঙ্গনে নতুন প্রতিভাদের সামনে আসার সুযোগ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব শিল্পী প্রচারের চেয়ে নিজেদের কাজের ওপর বেশি গুরুত্ব দেন, তাঁদের অনেকেই আলোচনার বাইরে থেকে যাচ্ছেন।
অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাময়িকভাবে ভাইরাল হওয়া কোনো কর্মকাণ্ড একজন শিল্পীকে দ্রুত পরিচিত করে তুলতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সেই জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে হলে প্রতিভা, কাজের মান ও ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ।
গণমাধ্যমের ভূমিকা কতটা?
গণমাধ্যম শুধু কোনো শিল্পীকে জনপ্রিয় করে তোলার মাধ্যম নয়; মানুষের রুচি ও সাংস্কৃতিক চর্চায়ও এর প্রভাব রয়েছে। তাই বিনোদন সংবাদে ভাইরাল কনটেন্টের পাশাপাশি ভালো কাজ, নতুন প্রতিভা ও সৃজনশীল উদ্যোগকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দর্শকের আগ্রহকে উপেক্ষা করা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি কেবল ভিউ বা ক্লিকের ভিত্তিতে বিনোদন সংবাদ নির্ধারণ করাও দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে না।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকেই যায়—বিনোদন অঙ্গনে গণমাধ্যম কি শুধু ভাইরাল কনটেন্টের পেছনে ছুটবে, নাকি প্রকৃত শিল্প ও মেধাকেও সমান গুরুত্ব দেবে? এই ভারসাম্যই ভবিষ্যতের বিনোদন সাংবাদিকতা ও শিল্পচর্চার গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।