বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের পরিবেশ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংগঠনের পর্যবেক্ষকরা। একই সঙ্গে ভোট কেন্দ্রে মানুষ উচ্ছ্বাসের সঙ্গে ভোট দিয়েছে বলেও কেউ কেউ মত দিয়েছেন। তারা বলছেন, বিতর্কিত হওয়ার মতো বড় কোনো অনিয়ম তাদের চোখে ধরা পড়েনি।
গতকাল রাজধানীর ভিকারুন নিসা নূন স্কুল কেন্দ্রে ভোটগ্রহণের কার্যক্রম সরজমিন পরিদর্শন করেন কমনওয়েলথ নির্বাচন পর্যবেক্ষক দলের প্রধান ও ঘানার সাবেক প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম নানা আকুফো-আদ্দো। এ সময় তিনি সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত (তিনি যখন পরিদর্শন করেন) ভোটের পরিবেশ অত্যন্ত চমৎকার এবং তিনি এতে খুবই সন্তুষ্ট।’ তিনি জানান, কেন্দ্রটিতে তিনি শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিতে দেখেছেন।
ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও উদ্দীপনায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান ইভার্স ইজাবস। গতকাল দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল ভোট কেন্দ্র পরিদর্শনের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, ‘দুপুর পর্যন্ত আমরা ভোটারদের মধ্যে যথেষ্ট উদ্দীপনা দেখছি। আমরা চাই বাকি সময়ও এই উদ্দীপনা থাকুক।’
সকালে সহযোগীদের নিয়ে রাজধানীর বেইলি রোডের সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজ কেন্দ্র পরিদর্শনে যান ইভার্স ইজাবস। সেই সময় তিনি বলেন, ‘আমরা একটি অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন প্রত্যাশা করছি। আমরা নিবিড়ভাবে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করছি। আমরা পুরোপুরি নিরপেক্ষভাবে কাজ করছি। কোনো রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছি না। এ নির্বাচন কীভাবে পরিচালিত হয়েছে, তা নিয়ে ১৪ ফেব্রুয়ারি আমাদের প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ করব।’
নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর হয়েছে এমন মন্তব্য করেছেন ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের (আইআরআই) পর্যবেক্ষক ডেভিড ড্রেয়ার। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়েও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সাবেক এ মার্কিন কংগ্রেসম্যান।
গতকাল গুলশানের মানারাত ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভোট কেন্দ্র পরিদর্শনের পর গণমাধ্যমকে জানান, তিনি একটি সুশৃঙ্খল ভোটের পরিবেশ এবং জনগণের মধ্যে প্রবল উৎসাহ ও উদ্দীপনা লক্ষ করেছেন।
তিনি বলেন, ‘আমি দেখতে পাচ্ছি জনগণের মধ্যে উন্মাদনা, আনন্দ এবং উৎসবের আমেজ।’ তিনি সহকর্মীদের সঙ্গে একাধিক ভোট কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন এবং ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়াকে সুসংগঠিত ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হতে দেখেছেন।
পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশনের মহাপরিচালক নিঘাত সিদ্দিকীও নির্বাচনের পরিবেশকে অত্যন্ত ইতিবাচক ও আন্তরিক বলে অভিহিত করেছেন। বেশ কয়েকটি কেন্দ্র পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, ‘মানুষ অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে ভোট দিচ্ছেন। পরিবর্তনের পক্ষে এই “হ্যাঁ-না” ভোটে ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে। বিশেষ করে নারী, তরুণ ও প্রবীণদের দীর্ঘ সারি প্রমাণ করে যে নির্বাচনটি অংশগ্রহণমূলক হচ্ছে।’
তিনি আরো যোগ করেন, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন পুরো ব্যবস্থাপনাটি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করেছে।
এর আগে গত বুধবার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বিষয়ে গণভোটে পর্যবেক্ষণে ৩৯৪ জন আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষক এবং ১৯৭ জন বিদেশী সাংবাদিক দেশে এসেছেন।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে ৮০ জন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি, ২৪০ জন দ্বিপক্ষীয় দেশগুলোর প্রতিনিধি, যার মধ্যে স্বতন্ত্র ইউরোপীয় পর্যবেক্ষকও রয়েছেন এবং ৫১ জন ব্যক্তি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বা বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
প্রেস উইং জানায়, পর্যবেক্ষক আসা গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনস (এএনএফরেল) থেকে ২৮ জন, কমনওয়েলথ সেক্রেটারিয়েট থেকে ২৭ জন, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই) থেকে ১৯ জন এবং ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউট (এনডিআই) থেকে একজন। এছাড়া ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) ও ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অব এশিয়ান পলিটিক্যাল পার্টিজ (আইসিএপিপি) থেকে দুজন করে এবং ইউরোপিয়ান এক্সটারনাল অ্যাকশন সার্ভিস থেকে একজন প্রতিনিধি এসেছেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি ২১টি দেশ থেকেও পর্যবেক্ষকরা এসেছেন। এর মধ্যে রয়েছে পাকিস্তান (৮), ভুটান (২), শ্রীলংকা (১১), নেপাল (১), ইন্দোনেশিয়া (৩), ফিলিপাইনস (২), মালয়েশিয়া (৬), জর্ডান (২), তুরস্ক (১৩), ইরান (৩), জর্জিয়া (২), রাশিয়া (২), চীন (৩), জাপান (৪), দক্ষিণ কোরিয়া (২), কিরগিজস্তান (২), উজবেকিস্তান (২), দক্ষিণ আফ্রিকা (২) ও নাইজেরিয়া (৪)।
এছাড়া ভয়েস ফর জাস্টিস, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল, এসএনএএস আফ্রিকা, সার্ক হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন ও পোলিশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের প্রতিনিধিরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে দেশে আসেন।
সূত্র: বণিক বার্তা