মহসিন কবির: জুলাই সনদ বাস্তবায়নে জনগণের মতামত জানতে আলোচনায় এখন ‘গণভোট’। বিএনপি চায় সংসদ নির্বাচনের ভোটের দিন পৃথক ব্যালটে গণভোট হোক। তবে জামায়াতসহ আরও কিছু দলের দাবি, সংসদ নির্বাচনের আগেই গণভোট করতে হবে। গণভোটের সময় নিয়ে আটকে আছে ঐক্য।
এ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো এখনো সমঝোতায় আসতে পারেনি। এমনকি খোদ নির্বাচন কমিশনেরও (ইসি) জানা নেই—কবে হবে এই গণভোট, কিংবা আদৌ হবে কি না। এখনো সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত বা বার্তাও পায়নি কমিশন।
রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করছেন রাজনৈতিক দল ও জোটসমূহের নেতারা। উপস্থিত রয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বুধবার সন্ধ্যা ৬টার কিছু সময় পর এ বৈঠক হয়।
গণভোট নিয়ে ইসির ‘ভাবনা’ জানতে চাইলে ইসি সচিব বলেন, এটির ব্যাপারে আমার কোনো বাড়তি মন্তব্য দেওয়ার সুযোগ নেই। অনেকেই অনেক কথা বলেন, আপনারাও (সাংবাদিকরা) জানতে চান। যখন নির্বাচন কমিশন কোনো ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয় তখন জানানো হয়। গণভোটের ব্যাপারেও একই কথা- যতক্ষণ না (সরকারের পক্ষ থেকে) ইসিকে কিছু বলা হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত এ বিষয়ে আমাদের কোনো কিছু বলার নেই।
আখতার আহমেদ বলেন, ইসি আসলে নির্বাচনটা ব্যবস্থাপনা করে, সিদ্ধান্তটা প্রাসঙ্গিকভাবে অন্য জায়গা থেকে আসে। গণভোট জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে আলাদা। বিষয় হচ্ছে সরকার যে সিদ্ধান্ত দেবে ইলেকশন কমিশন তা এক্সিকিউট করবে। গণভোটের ব্যাপারে সরকার সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে নিশ্চয়ই ইলেকশন কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করবে। আমার বিশ্বাস এটি তখন সেভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে গণভোটে রাজি হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। তবে এই ভোটে যাদি ‘না’ জিতে যায় তাহলে কী হবে, এমন প্রশ্ন রেখেছেন সিনিয়র সাংবাদিক মাসুদ কামাল। তিনি দাবি করেন, এই গণভোটে যদি ‘না’ জিতে যায় তাহলে সব সংস্কার কার্যক্রম ভেস্তে যাবে।
ফেসবুকে তিনি বলেন, ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে গণভোটের প্রস্তাব উঠেছে। সবাই রাজি গণভোটে। বিরোধ এখন—গণভোট কবে হবে, সেটা নিয়ে। বিএনপিসহ কয়েকটি দল বলছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে এই গণভোট হোক।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে জনগণের মতামত জানতে রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মতিতে গণভোটের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। এই গণভোট জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন হবে, নাকি আগেই হবে- এ বিষয়ে সরকারের তরফ থেকে এখনও কিছু স্পষ্ট করা হয়নি। অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এ নিয়ে মতানৈক্য রয়েছে। বিএনপি এবং এর সমমনা জোট ও দলগুলো চাইছে ভোটের দিনই গণভোট হোক। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীসহ সমমনা কিছু দল ভোটের আগেই গণভোট চাইছে।
এক্ষেত্রে বিশ্লেষকরা ভোটের আগে গণভোটের আয়োজনে অনেক সীমাবদ্ধতা দেখছেন। তারা বলছেন, এতে করে বাড়তি হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে সরকারের, যা জাতীয় নির্বাচনে ব্যয়ের কাছাকাছি। আর ভোটের দিন গণভোট আয়োজনে বাড়তি ব্যয় হবে মাত্র ১০ শতাংশের মতো।
এ পর্যন্ত বাংলাদেশে মোট তিনটি গণভোট হয়েছে। তার প্রথম দু’টিতে দেশের জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ হ্যাঁ-না ভোট করে নিজেদের শাসন কাজের বৈধতা নিয়েছিলেন। ১৯৭৭ সালের গণভোটে জিয়াউর রহমানের পক্ষে হ্যাঁ-তে ভোট পড়েছিল ৯৮ দশমিক ৮০ শতাংশ। এর আগে ওই বছরের এপ্রিলে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক থেকে প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন তিনি। ১৯৮৫ সালে দ্বিতীয় প্রশাসনিক গণভোটে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পক্ষে হ্যাঁ ভোট পড়েছিল ৯৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। এ নির্বাচনে বিষয়বস্তু ছিল এরশাদের নীতি ও কর্মসূচির প্রতি আস্থা এবং নির্বাচন হওয়া পর্যন্ত তার প্রেসিডেন্ট পদে থাকায় জনগণের সম্মতি আছে কি-না।
১৯৯১ সালে তৃতীয় গণভোটটি হয়েছিল। যেটি সাংবিধানিক গণভোট হিসেবে পরিচিতি পায়। এ ভোট নিয়ে তখন খুব একটা আলোচনা ছিল না। গণভোটটি হয়েছিল দ্বাদশ সংশোধনী বিল- যার ভিত্তিতে দেশ প্রেসিডেন্ট শাসিত থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরে। এ ব্যবস্থায় প্রেসিডেন্টের সম্মতি দেয়া উচিত কিনা সেটি জানতে চাওয়া হয় গণভোটে। ওই নির্বাচনেও ৮৪ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে। অবশ্য ভোটের এই হার নিয়ে তখন প্রশ্ন উঠেছিল। তবে এই ভোটের আগেই প্রায় সব দল সংসদীয় ব্যবস্থায় ফেরার পক্ষে মত দিয়েছিল।