ব্যাংক স্টেটমেন্টসহ সব কাগজপত্র ঠিক ছিল, আইএলটিএস স্কোরও ভালো—তবু ভিসা হলো না। রিজেকশন লেটারে মাত্র একটি লাইন : ‘প্রকৃত শিক্ষার উদ্দেশ্য প্রমাণিত হয়নি।’ সেই একটি লাইনেই শেষ হয়ে গেল সব স্বপ্ন। পরিবারের মুখোমুখি হতে পারছি না।
দোষ আমার নয়—কিছু প্রতারক এজেন্সির কারণে আমাদের মতো সৎ শিক্ষার্থীরা আজ সন্দেহের কাঠগড়ায়।
এভাবেই নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানান চট্টগ্রামের সুমাইয়া আক্তার। একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করে অস্ট্রেলিয়ায় মাস্টার্সের স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ, বছরের প্রস্তুতি—পরিণতিতে শুধু একটি প্রত্যাখ্যানপত্র।
সিলেটের তানভীর হাসানের গল্প আরো কষ্টের। কোনো এজেন্টের দ্বারস্থ না হয়ে নিজেই সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অফার লেটার নিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘দালালের কাছে যাইনি, সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অফার লেটার নিয়েছিলাম। তবু ভিসা রিজেক্ট।
অথচ আমার প্রতিবেশী এক ছেলে প্রতারক এজেন্সির মাধ্যমে ডকুমেন্ট তৈরি করে অস্ট্রেলিয়া চলে গেছে। এসব প্রতারক এজেন্টের পাপের বোঝা এখন আমাদের বহন করতে হচ্ছে।’
শুধু ওই দুজনই নন—অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে পা রাখার আগেই থমকে যাচ্ছে হাজারো বাংলাদেশি তরুণের ভবিষ্যৎ। ভিসা আবেদনের ফাইল জমা দিয়ে মাসের পর মাস অপেক্ষার পর হাতে আসছে শুধু একটি প্রত্যাখ্যানপত্র। আর সেই একটি চিঠিতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে বছরের পর বছর ধরে লালিত স্বপ্ন।
ডিপার্টমেন্ট অব হোম অ্যাফেয়ার্সের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের অফশোর স্টুডেন্ট ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার পৌঁছেছে ৫১ শতাংশে। সামগ্রিকভাবে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার ৩২.৫ শতাংশ, যা গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশকে ‘এভিডেন্স লেভেল ৩’ বা উচ্চ-ঝুঁকির দেশের তালিকায় রাখা হয়েছে। ফলে প্রতিটি আবেদন এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি কঠোরভাবে যাচাই করা হচ্ছে। হোম অ্যাফেয়ার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়া থেকে জাল নথিপত্র দাখিল এবং ভিসার মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।
নতুন নিয়মে শিক্ষার্থীদের দিতে হচ্ছে তিন মাসের ব্যাংক স্টেটমেন্ট, ন্যূনতম ২৯ হাজার ৭১০ অস্ট্রেলিয়ান ডলারের আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ এবং ‘জেনুইন স্টুডেন্ট’ হওয়ার শক্তিশালী দলিল। ভিসা ফি বাড়িয়ে করা হয়েছে ২ হাজার অস্ট্রেলিয়ান ডলার।
অস্ট্রেলিয়ার আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিষয়ক সহকারী মন্ত্রী জুলিয়ান হিল বলেন, “প্রকৃত শিক্ষার্থীদের জন্য অস্ট্রেলিয়ার দরজা খোলা আছে। তবে অসাধু এজেন্ট ও জাল নথির বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান অব্যাহত থাকবে।”
অস্ট্রেলিয়ায় শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করা সিডনিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান স্কিলওয়েভ গ্লোবালের ডিরেক্টর নাসির উদ্দিন বলেন, “বাংলাদেশের একশ্রেণির অসাধু ভিসা এজেন্সি জাল নথিপত্র তৈরি করে আবেদন করানোর ফলে পুরো দেশের শিক্ষার্থীরা আজ সন্দেহের তালিকায় পড়ে গেছেন। অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনেও দক্ষিণ এশিয়া থেকে জাল নথিপত্র ও সততার অভাবকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশের সরকার যদি এখনই প্রতারক ভিসা এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে ও হাজারো মেধাবী শিক্ষার্থীর বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”