রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সিদ্দিক মাস্টার ঢাল এলাকার একটি বটগাছের নিচে বসেছে ছোট্ট একটি পাঠশালা। মাটিতে পাতা মাদুরে বসে কয়েকজন কিশোর-কিশোরী মন দিয়ে খাতায় অক্ষর আঁকছে। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক তরুণ স্বেচ্ছাসেবক বোর্ডে লিখছেন- ‘অ, আ, ক, খ’। পাশে বসে থাকা এক বৃদ্ধা ধীরে ধীরে সেই অক্ষরগুলো উচ্চারণ করার চেষ্টা করছেন। দৃশ্যটি কেবল একটি পাঠশালার নয়; এ যেন সমাজ বদলের এক নীরব গল্প।
বাংলাদেশে এখনও অনেক মানুষ আছেন, যারা কখনও স্কুলের চৌকাঠ পেরোনোর সুযোগ পাননি। সেই বাস্তবতাকে সামনে রেখে অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার পরিধি আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন শিক্ষা ও প্রাথমিক গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তার মতে, শ্রেণিকক্ষের বাইরেও শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে পারলে নিরক্ষরতামুক্ত বাংলাদেশের লক্ষ্য বাস্তবায়ন আরও দ্রুত সম্ভব হবে।
শিক্ষার আলো শুধু শ্রেণিকক্ষে নয় : সম্প্রতি রাজধানীর মহাখালীতে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর কার্যালয় পরিদর্শনের সময় কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় মন্ত্রী বলেন, দেশে আনুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী হলেও সমাজের একটি বড় অংশ এখনও শিক্ষার বাইরে রয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘শিক্ষার আলো যদি শুধু শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সমাজের অন্ধকার পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়। আমাদের এমন উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে প্রত্যন্ত গ্রাম, শ্রমজীবী মানুষ ও পথশিশুরাও শিক্ষার সুযোগ পায়।’
মন্ত্রী বিশেষভাবে গুরুত্ব দেন এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার পরবর্তী সময়কে কাজে লাগানোর ওপর। তার মতে, পরীক্ষার্থীদের স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষক হিসেবে যুক্ত করা গেলে নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে শিক্ষাদানের একটি কার্যকর কর্মসূচি গড়ে তোলা সম্ভব।
তরুণদের হাতেই আলোর প্রদীপ : মন্ত্রী মনে করেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তরুণদের মধ্যেও সামাজিক দায়িত্ববোধ তৈরি হবে। তিনি বলেন, সমাজে কিশোর গ্যাংয়ের উত্থান কিংবা মাদকাসক্তির মতো বড় সমস্যার কারণে অনেক তরুণ শিক্ষার বাইরে চলে যায়। তাদের শিক্ষার ধারায় ফিরিয়ে আনতে পারলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
সরকারের লক্ষ্য শতভাগ নিরক্ষরতামুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা। এ লক্ষ্য অর্জনে নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন মন্ত্রী।
মাঠপর্যায়ে আশার গল্প : ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রতি শুক্রবার বসে একটি অনানুষ্ঠানিক বিদ্যালয়ের ক্লাস। ত্রিপলের ওপর বসে কয়েকজন শিশু- কিশোর এবং দিনমজুর অক্ষরের হাতেখড়ি নিচ্ছেন। এই বিদ্যালয়ের শিক্ষক সেলিনা আক্তার বলেন, ‘এদের অনেকেই জীবনে প্রথমবারের মতো নিজের নাম লিখতে শিখছেন। যখন তারা খাতায় নিজের নাম লিখতে পারেন, তখন তাদের চোখে যে আনন্দ দেখি, সেটি সত্যিই অনন্য।’
তার মতে, পরীক্ষার্থীদের স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষক হিসেবে যুক্ত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এমন উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হবে। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও মানবিকতা ও নেতৃত্বের গুণাবলি বিকশিত হবে।
ঝরে পড়াদের ফিরিয়ে আনার সুযোগ : অনানুষ্ঠানিক স্কুলের শিক্ষক আবদুল হালিম দীর্ঘদিন ধরে ঝরে পড়া শিশুদের নিয়ে কাজ করছেন। তার অভিজ্ঞতায়, বিকল্প শিক্ষার সুযোগ না থাকলে অনেক শিশুই ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। তিনি বলেন, ‘অনেক শিশু দারিদ্র্য বা পারিবারিক সমস্যার কারণে স্কুল ছাড়তে বাধ্য হয়। কিন্তু তাদের শেখার আগ্রহ থাকে। যদি বিকল্প শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা যায়, তাহলে তারা আবারও শিক্ষার ধারায় ফিরতে পারে।’
সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ : প্রাথমিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার মানোন্নয়নে পরামর্শক কমিটির আহ্বায়ক ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মনজুর আহমদ মনে করেন, অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার বিস্তৃত কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে শিক্ষাক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। তিনি বলেন, আনুষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে থাকা মানুষদের কাছে পৌঁছাতে অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা অত্যন্ত কার্যকর মাধ্যম। বিশেষ করে প্রাপ্তবয়স্ক ও ঝরে পড়া কিশোরদের শিক্ষার আওতায় আনা গেলে সামাজিক বৈষম্য কমবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। পরীক্ষার্থীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও পাঠ্যসামগ্রী নিশ্চিত করা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে শিক্ষায় সম্পৃক্ত করা- এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে সাত বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাক্ষরতার হার প্রায় ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ এখনও প্রায় ২২ শতাংশ মানুষ নিরক্ষর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ নিশ্চিত করা গেলে অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার এই কর্মসূচি নিরক্ষরতামুক্ত বাংলাদেশের পথে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে। সূত্র: দৈনিক আমাদের সময়