মনজুর এ আজিজ : বৈশ্বিক অর্থনীতি যখন মূল্যস্ফীতি, উচ্চ সুদের হার, সরকারি ঋণের চাপ ও ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার মঞ্চ হয়ে উঠছে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভায় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন অর্থায়ন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার কৌশল নিয়ে আলোচনা করছেন বিশ্বের নীতিনির্ধারকরা।
১২ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত অনুষ্ঠেয় এ সভা বাংলাদেশের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সভায় সোমবার প্রথম দিনে বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাবে জ্বালানি খাতে সৃষ্ট চাপ মোকাবিলা এবং বাড়তি ব্যয়ের বোঝা সামলাতে বিশ্বব্যাংকের সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ। এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা চলছে। দুই পক্ষের মধ্যে একটি কাঠামোগত চুক্তি নিয়ে কাজ চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বিশেষ করে আইএমএফের নতুন ঋণ কর্মসূচি, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং অর্থনীতিতে বিনিয়োগের গতি ফেরানোর বিষয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। নতুন ঋণ কর্মসূচির আওতায় আইএমএফের কাছ থেকে ৪৫০ কোটি থেকে ৫০০ কোটি ডলার পেতে চায় বাংলাদেশ। এ লক্ষ্যে ব্যাংককের বৈঠকগুলোতে সরকারের নিজস্ব সংস্কার পরিকল্পনা ও অর্থনৈতিক কর্মকৌশল তুলে ধরার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বার্ষিক সভার সাইডলাইনে আইএমএফের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে ঋণের শর্ত ও ভবিষ্যৎ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হবে। আগের ঋণ কর্মসূচির অসম্পূর্ণ শর্তগুলোও আলোচনায় আসতে পারে। এর মধ্যে বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, বিদ্যুৎ ও সারে ভর্তুকি কমানো এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। ব্যাংককের আলোচনায় অগ্রগতি হলে চলতি মাসের শেষ দিকে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকায় আসতে পারে।
বার্ষিক সভায় ইতোমধ্যে অংশ নিয়েছেন বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল। দলের সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান এবং অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার।
ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের বক্তব্য অনুযায়ী, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সামষ্টিক অর্থনীতির চাপ মোকাবিলায় সরকার বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের চাপিয়ে দেওয়া সংস্কারের পরিবর্তে দেশের বাস্তবতা বিবেচনায় নিজস্ব উদ্যোগে সংস্কার বাস্তবায়ন করতে চায়।
সরকারের যুক্তি, দায়িত্ব নেওয়ার সময় অর্থনীতি নানা চাপে ছিল। বেসরকারি বিনিয়োগে ধীরগতি, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় কম রাজস্ব আয় এবং ব্যাংকিং খাতের তারল্যসংকট অর্থনীতির অন্যতম দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় সরকার নিজস্ব কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বলে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের জানানো হবে।
সরকারের পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা। সমস্যাগ্রস্ত কয়েকটি ব্যাংক ও সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ উত্তোলন নিয়ে অনিশ্চয়তা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো, বন্ধ কলকারখানা চালু করা এবং উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরবে সরকার।
রাজস্ব আয় বাড়ানোও সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। অর্থ উপদেষ্টার বক্তব্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে জিডিপির তুলনায় রাজস্বের অনুপাত ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণে তিনটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। তবে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি, রাজস্ব বৃদ্ধির বাস্তবসম্মত পথ এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার সক্ষমতা আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ হবে।
বাংলাদেশের নতুন ঋণ আলোচনার পেছনে রয়েছে আগের কর্মসূচির অভিজ্ঞতা। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে আইএমএফের ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচি অনুমোদিত হয়। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কর্মসূচির ঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলার করা হয়েছিল। ওই কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ পাঁচ কিস্তিতে ৩৮০ কোটি ডলার পেয়েছে।
গত বছরের নভেম্বরে আলোচনা স্থগিত হওয়ার পর ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ ছাড় আটকে যায়। নির্বাচনের পর নতুন সরকারের সঙ্গে আলোচনা আবার শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয় আইএমএফ। তবে নতুন সরকার আগের কর্মসূচির পরিবর্তে নতুন ঋণ প্যাকেজের জন্য আবেদন করেছে বলে ৩ জুন দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছিলেন আইএমএফের বাংলাদেশ মিশনপ্রধান ইভো ক্রজনার।
উন্নয়ন প্রকল্পে বেসরকারি অনুদান-বিনিয়োগ বাড়াতে বিশ্বব্যাংকের নতুন উদ্যোগ: উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন বাড়ানো, নতুন ধারণা কাজে লাগানো এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করতে ‘ফিলানথ্রপি হাব’ নামে নতুন একটি প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ। এর মাধ্যমে দাতব্য সংস্থা, বেসরকারি বিনিয়োগকারী ও উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থ, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা একত্র করে বড় পরিসরে উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হবে।
সোমবার থাইল্যান্ডের ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সম্মেলন চলাকালে প্ল্যাটফর্মটি চালু করা হয়। একই সঙ্গে প্রথমবারের মতো বিশ্বব্যাংক গ্রুপের উদ্যোগে ফিলানথ্রপি ফোরাম অনুষ্ঠিত হয়। এতে দাতব্য সংস্থা, উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান, পারিবারিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন অংশীদার সংগঠনের ২০০ জনের বেশি প্রতিনিধি অংশ নেন। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের নতুন এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো, উন্নয়ন খাতে ছোট পরিসরে পরীক্ষামূলকভাবে নেওয়া কার্যকর উদ্যোগগুলোকে বড় পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়া। একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিচ্ছিন্ন কার্যক্রমকে সমন্বিত উদ্যোগে রূপ দেওয়া। এ জন্য দাতব্য সংস্থাগুলোর অর্থায়ন, কারিগরি জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে কোন খাতে কী ধরনের সহযোগিতা সবচেয়ে বেশি কার্যকর হবে, তা চিহ্নিত করবে ফিলানথ্রপি হাব।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে চাহিদা বাড়লেও সরকারি সম্পদের ওপর চাপ বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে উন্নয়ন কার্যক্রমে দাতব্য সংস্থাগুলোর ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এসব প্রতিষ্ঠান শুধু অনুদানই দিচ্ছে না, বিনিয়োগের অর্থ, বিশেষজ্ঞ জ্ঞান এবং বিভিন্ন অংশীদারকে একত্র করার সক্ষমতাও কাজে লাগাচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের বিদ্যুৎপ্রাপ্তি, স্বাস্থ্যসেবা ও পানি সরবরাহসংক্রান্ত বিভিন্ন উদ্যোগেও এসব প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা যুক্ত হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান জ্ঞান কর্মকর্তা প্যাসকাল ডোনোহু বলেন, উন্নয়নের চাহিদা বাড়ছে, অন্যদিকে সম্পদের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। এ অবস্থায় অংশীদারত্ব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দাতব্য সংস্থাগুলোর অভিজ্ঞতা ও নতুন সমাধান বিশ্বব্যাংকের কর্মসংস্থান ও উন্নয়ন লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তিনি বলেন, ফিলানথ্রপি হাবের মাধ্যমে বিভিন্ন ধারণা, অর্থায়ন ও অংশীদারকে এক জায়গায় যুক্ত করা হবে। এর ফলে কার্যকর উদ্যোগগুলো বড় পরিসরে বাস্তবায়ন করা এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের জন্য বাস্তব সুফল নিশ্চিত করা সহজ হবে।
স্বাস্থ্য, কৃষি ও পানি খাতে সহযোগিতা: ফিলানথ্রপি হাব চালুর পাশাপাশি এশিয়ার দুটি গুরুত্বপূর্ণ দাতব্য ও উন্নয়ন সহযোগী নেটওয়ার্কের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করেছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ। প্রতিষ্ঠান দুটি হলো এশিয়ান ভেঞ্চার ফিলানথ্রপি নেটওয়ার্ক (এভিপিএন) এবং টেমাসেক ট্রাস্টের ফিলানথ্রপি এশিয়া অ্যালায়েন্স।
এভিপিএনের আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে দাতব্য সংস্থা, সামাজিক বিনিয়োগকারী ও বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন উন্নয়ন উদ্যোগে একসঙ্গে কাজ করতে পারবে। পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকের ‘হেলথ ওয়ার্কস’ উদ্যোগে কারিগরি সহায়তা দেওয়ার জন্য একটি বিশেষ তহবিল গঠনের ঘোষণাও দিয়েছে এভিপিএন। হেলথ ওয়ার্কস উদ্যোগের লক্ষ্য হলো, ১৫০ কোটি মানুষের জন্য মানসম্মত ও সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে সহায়তা করা।
অন্যদিকে, টেমাসেক ট্রাস্টের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দাতব্য অর্থ সংগ্রহ, অংশীদারদের একত্র করা এবং নতুন অর্থায়ন পদ্ধতি তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর মাধ্যমে কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা ও পানি খাতে বিশ্বব্যাংকের অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্পগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি ও বড় পরিসরের সহযোগিতার মডেল গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ‘এগ্রিকানেক্ট’, ‘হেলথ ওয়ার্কস’ ও ‘ওয়াটার ফরওয়ার্ড’ উদ্যোগে এসব অংশীদারত্ব কাজে লাগানো হবে।
গবেষণা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর উদ্যোগ: ফিলানথ্রপি হাবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জ্ঞান ও গবেষণার ব্যবহার বাড়ানো। এ জন্য বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, পরামর্শক সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগীকে নিয়ে একটি জ্ঞানভিত্তিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হচ্ছে। এ নেটওয়ার্কে আফ্রিকার উন্নয়নবিষয়ক মো ইব্রাহিম ফাউন্ডেশন, লাতিন আমেরিকার লাতিমপ্যাক্টো, ফিলানথ্রপি এশিয়া অ্যালায়েন্স এবং সেন্টার ফর এশিয়ান ফিলানথ্রপি অ্যান্ড সোসাইটির মতো প্রতিষ্ঠান যুক্ত রয়েছে। এছাড়া বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপ, ব্রিজেসপ্যান, ডালবার্গ ও কোয়েফিশিয়েন্ট গিভিংয়ের মতো পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এবং লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের মার্শাল ইনস্টিটিউট ও ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের লিলি ফ্যামিলি স্কুল অব ফিলানথ্রপির মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও এ উদ্যোগে যুক্ত হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের লক্ষ্য, এসব প্রতিষ্ঠানের গবেষণা, উপাত্ত ও বাস্তব অভিজ্ঞতা উন্নয়ন প্রকল্পে কাজে লাগানো। এতে কোন উদ্যোগ কোথায় বেশি কার্যকর হতে পারে, তা নির্ধারণ এবং প্রকল্পের ফলাফল আরও ভালোভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের আশা, সরকারি অর্থায়নের সীমাবদ্ধতার মধ্যে বেসরকারি দাতব্য অর্থ, বিনিয়োগ, জ্ঞান ও দক্ষতাকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগিয়ে উন্নয়ন কার্যক্রমের পরিধি বাড়ানো যাবে। নতুন প্ল্যাটফর্মটি এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন অংশীদারের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে।
বিশ্ব অর্থনীতির নতুন দিকনির্দেশনা: ব্যাংককের কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠেয় সভায় বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, উন্নয়ন সংস্থার প্রধান ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। প্রায় ৩৫ বছর পর থাইল্যান্ডে ফিরছে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের এই বার্ষিক আয়োজন। সভায় অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলা এবং নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে আলোচনা হবে।
বিশেষ গুরুত্ব পাবে এআইয়ের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে শ্রমবাজারকে খাপ খাওয়ানো। একইসঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলা, দুর্যোগসহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য অর্থায়নের পথ খোঁজা হবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাদের পক্ষে শুধু সরকারি অর্থ দিয়ে উন্নয়ন ও জলবায়ু অভিযোজনের চাহিদা পূরণ করা কঠিন।
বিশ্বব্যাংকের আলোচনায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অবকাঠামো উন্নয়ন ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। অন্যদিকে আইএমএফের আলোচনায় বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, সুদের হার, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং সরকারি ঋণের ঝুঁকি প্রাধান্য পাবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিনিয়োগই বড় চ্যালেঞ্জ: বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে এখন কয়েকটি কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দুর্বল রাজস্ব আহরণ, ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম ও খেলাপি ঋণ, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং বেসরকারি বিনিয়োগে ধীরগতি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে বাধাগ্রস্ত করছে। এসব সমস্যা কাটিয়ে উঠতে শুধু বিদেশি ঋণ বা উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য স্থিতিশীল নীতিপরিবেশ নিশ্চিত করা। পাশাপাশি সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানো ও রাজস্ব ফাঁকি কমানোর কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
বাংলাদেশের রতানির আয়ের বড় অংশ তৈরি পোশাক খাতনির্ভর। এই নির্ভরতা কমাতে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ, হালকা প্রকৌশল এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। এ জন্য প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, সহজ অর্থায়ন এবং নতুন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়াতে হবে। একইসঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি ও তুলনামূলক কম সুদের অর্থায়ন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। উপকূলীয় অঞ্চলের সুরক্ষা, দুর্যোগসহনশীল অবকাঠামো এবং অভিযোজন প্রকল্পে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে পারে।
অর্থায়নের পাশাপাশি দরকার বাস্তবায়ন: ব্যাংককের বার্ষিক সভায় বাংলাদেশের জন্য সুযোগ তৈরি হলেও শুধু বৈঠকে অংশ নেওয়া বা নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি পাওয়াই অর্থনীতির সমস্যার সমাধান করবে না। ঋণের শর্ত, অর্থ ছাড়ের সময়সূচি এবং সংস্কারের অগ্রগতি দেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলবে। পাশাপাশি উন্নয়ন অর্থায়ন ও বিনিয়োগের সুযোগ কাজে লাগাতে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট প্রকল্প, কার্যকর পরিকল্পনা এবং অর্থের স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশের জন্য এবারের সভার গুরুত্ব তাই দ্বিমুখী। একদিকে নতুন ঋণ কর্মসূচির মাধ্যমে বৈদেশিক অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করা, অন্যদিকে নিজস্ব সংস্কার কর্মসূচির বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করা। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও রফতানি বাড়ানোর জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগীদের সঙ্গে নতুন উদ্যোগের পথ খুঁজতে হবে।
সব মিলিয়ে ব্যাংককের আলোচনা বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। নতুন ঋণ পাওয়া, সংস্কারের শর্ত নির্ধারণ এবং বিনিয়োগের সুযোগ তৈরির ক্ষেত্রে এই সভার ফলাফল তাৎপর্যপূর্ণ। তবে শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির গতিপথ নির্ভর করবে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত, সংস্কার বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর ওপর।
এদিকে থাইল্যান্ডে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সাধারণ সভায় অংশগ্রহণের শুরুতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনাকালে অর্থমন্ত্রী বলেন, এবারের আলোচনায় বাংলাদেশের সামনে বড় প্রশ্ন হলো—নতুন ঋণ পেতে কী ধরনের শর্তে রাজি হতে হবে এবং সেগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার কতটা নিজস্ব নীতি অনুসরণের সুযোগ পাবে। একইসঙ্গে ঋণের অর্থায়ন দেশের বৈদেশিক লেনদেনের চাপ কমানো, আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা আনা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল করতে কতটা সহায়ক হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। এর আগে গত সপ্তাহে আইএমএফের কঠিন শর্ত মেনে নতুন ঋণ নেওয়া হবে না বলে জানিয়েছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিদেশি ঋণদাতা সংস্থার অর্থের ওপর নির্ভর করে দেশ পরিচালনার প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে সরকার নতুন আর্থিক কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে বলে জানান তিনি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, আইএমএফের কঠিন শর্তযুক্ত ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যেই আগের কর্মসূচি থেকে সরে এসেছে সরকার। নতুন ঋণ কর্মসূচিতে কঠিন শর্ত দেওয়া হলে তা মেনে নেওয়া হবে না। তার ভাষায়, ‘বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ বা এডিবি টাকা দেবে আর আমরা দেশ চালাব—এই ধারায় আমরা পরিবর্তন আনছি। তিনি বলেন, দেশের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক চাহিদা পূরণে বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন। উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে পাওয়া সীমিত অর্থ দিয়ে সেই চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। এ জন্য আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার থেকে বিলিয়ন ডলার সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় পুঁজিবাজারকে কাজে লাগিয়ে বিকল্প অর্থায়নের নতুন কৌশল নেওয়া হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রীর এ বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণ নিয়ে আলোচনায় শুধু অর্থের পরিমাণ নয়, ঋণের শর্ত এবং অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে সরকারের স্বাধীনতার বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে। তবে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ঋণের ব্যয়, পরিশোধের সক্ষমতা এবং দেশের ঋণঝুঁকি বিবেচনায় নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে জ্বালানি খাতে বাড়তি ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। এ চাপ সামাল দিতে এক ধরনের আর্থিক সুরক্ষা প্রয়োজন। বিশ্বব্যাংক এ বিষয়ে সহযোগিতার ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। ভবিষ্যতেও সংস্থাটি বাংলাদেশের পাশে থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতার বিষয়টি শুধু বিদ্যমান তহবিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং জ্বালানি খাতে চলমান সংকটের প্রভাব মোকাবিলায়ও সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে। এ বিষয়গুলো নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে কাঠামোগত চুক্তি নিয়ে আলোচনা ও প্রক্রিয়াগত কাজ চলছে। দুই পক্ষের অংশীদারত্বের আওতায় কীভাবে সহযোগিতা আরও কার্যকর করা যায়, সে বিষয়েও আলোচনা হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, সরকারের ঘোষিত নির্বাচনি ইশতেহারের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে চলমান উদ্যোগগুলোর সামঞ্জস্যের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে পারস্পরিক সমন্বয়ের মাধ্যমে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনার অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি বলেন, বিষয়টি এখনো প্রক্রিয়াধীন। এ নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ সঠিক পথেই এগোচ্ছে।