একসময় বাংলাদেশে কফি মানেই ছিল আমদানিনির্ভর ইনস্ট্যান্ট কফি। কিন্তু গত দুই দশকে দেশে কফি পানের সংস্কৃতি যেমন বেড়েছে, তেমনি কফি চাষও ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় শুরু হলেও এখন সমতলেও কফি চাষ হচ্ছে।
ভারতের মতো বাংলাদেশের কফি চাষের কোনো দীর্ঘ ইতিহাস নেই। পার্বত্য চট্টগ্রামে কৃষকেরা ভারতের মিজোরাম থেকে কফির বীজ ও চারা এনে প্রথম চাষ শুরু করেন। ১৯৫০-এর দশকে বান্দরবানের লামায় প্রথম কফি চাষ শুরু হয়। নব্বইয়ের দশকে সরকারি উদ্যোগ বাড়ার পর ২০০১ সালে খাগড়াছড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কফি চাষ শুরু হয়। বর্তমানে বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটি কফি উৎপাদনের মূল কেন্দ্র।
বান্দরবান শহরের কাছে ম্রো অধ্যুষিত ম্রোলং পাড়ায় ২৫টি পরিবার এখন আমগাছের নিচে অ্যারাবিকা ও রোবাস্টা জাতের কফি চাষ করছেন।
কৃষক মাংপং ম্রো বলেন, ‘আম বা অন্যান্য ফলের ন্যায্য দাম পাওয়া যায় না। অবিক্রীত আম অনেক সময় বাগানেই পচে।’
তিন বছর আগে তিনি তার আমবাগানের অর্ধেক জায়গায় ৬০০ কফির চারা লাগান। প্রথম বছর ২ হাজার ৫০০ টাকা লাভ হলেও এখন তার বার্ষিক আয় ৪০ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে।
আরেক কৃষক রিতলাং ম্রো সরকারি ও স্থানীয় সংস্থার সহায়তা নিয়ে ৭০০ কফি গাছ লাগিয়েছেন। গত বছর ২০ কেজি কফি পেলেও এ বছর অন্তত এক মণ কফি পাওয়ার আশা করছেন তিনি।
বান্দরবানের উদ্যোক্তা চিং অং খুমী কফি চাষ সম্প্রসারণে ভূমিকা রেখেছেন। ২০১৪ সালে সম্ভাবনা যাচাই করে পরে তিনি ভারতে প্রশিক্ষণ নেন। ২০১৬ সালে চিম্বুক পাহাড়ের ১১টি গ্রামের ১১৬ জন ফলচাষিকে প্রশিক্ষণ ও চারা দেন তিনি।
চিং অং বলেন, ‘বান্দরবানের পাহাড়ি এলাকা অ্যারাবিকা ও রোবাস্টা—দুই জাতের কফি চাষেরই উপযোগী।’ তিনি এখন তার পাঁচ একরের আমবাগানে প্রায় ৩ হাজার কফিগাছের চাষ করছেন। পাশাপাশি পাহাড়ি কৃষকদের উৎপাদিত কফি কিনে প্রক্রিয়াজাত করে বিক্রি করছেন। তার মতে, তাদের লক্ষ্য শুধু কফি উৎপাদন নয়, বরং পাহাড়ি কৃষকদের জন্য একটা বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বান্দরবান কার্যালয়ের উপপরিচালক আবু নাঈম মো. সাইফুদ্দিন জানান, পাহাড়ের মাটি ও আবহাওয়া কফি চাষের জন্য বেশ উপযোগী। ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে তারা জেলার প্রায় ২ হাজার কৃষককে কফির চারা দিয়েছেন।
পাহাড় পেরিয়ে সমতলে
কফি চাষ শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামে সীমাবদ্ধ নেই। ২০২১ সাল থেকে সিলেটের গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজারে বাণিজ্যিকভাবে এর চাষ হচ্ছে। সমতলের জেলাগুলোর মধ্যে রংপুর, নীলফামারী, টাঙ্গাইলের মধুপুর গড় ও শেরপুরের মাটি কফি চাষের উপযোগী প্রমাণিত হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২১ সালে ১২০ হেক্টর জমিতে ৩৫ টন কফি উৎপাদিত হলেও ২০২৫ সালে তা বেড়ে প্রায় ২ হাজার হেক্টরে ৯৫ টনে দাঁড়িয়েছে।
সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে কফি উৎপাদন ১ হাজার ৫০০ টনে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যার বাজারমূল্য হবে প্রায় ৩০ কোটি টাকা। এ ছাড়া ১০০ কোটি ডলারের রপ্তানি বাজার তৈরিরও পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের ২১ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে ১৯টি জেলার ৪৫টি উপজেলায় কফি চাষ সম্প্রসারণের কাজ চলছে।
এই প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের অ্যারাবিকা ও রোবাস্টা জাতের উন্নত চারা, কৃষি উপকরণ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের সরঞ্জাম দেওয়া হচ্ছে। কৃষকরা কাঁচা কফি কেজিপ্রতি ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায় এবং প্রক্রিয়াজাত করা কফি ১ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি করতে পারবেন।
দেশে কফির বাজার বড় হলেও স্থানীয় উৎপাদন দিয়ে এখনো মোট চাহিদার মাত্র ৫ শতাংশ মেটানো সম্ভব হচ্ছে।
ঢাকাকেন্দ্রিক ক্যাফে ও রোস্টারিগুলো এখন সরাসরি পাহাড়ি কৃষকদের কাছ থেকে কফি কিনছে। নর্থ এন্ড কফি রোস্টারস সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে কফি কিনে ‘হিল ট্র্যাক্টস ব্লেন্ড’ নামে বিক্রি করছে। তারা এই কফি ২৫০ গ্রামের দাম ৮৯০ টাকা এবং ৪০০ গ্রামের দাম রাখছে ১ হাজার ৪২৫ টাকা। এ ছাড়া আবুল খায়ের গ্রুপ ও প্রাণ-আরএফএল গ্রুপও স্থানীয় বাজার থেকে কফি কিনছে।
ইস্ট বেঙ্গল কফি রোস্টারসের স্বত্বাধিকারী শারজিল আবদুল করিম বলেন, গত ৫ থেকে ১০ বছরে শহুরে ভোক্তাদের মধ্যে দেশি কফির চাহিদা বেড়েছে। তবে উৎপাদনের তুলনায় চাহিদা অনেক বেশি।
ঢাকার ‘বাতিঘর’ বুক ক্যাফের ব্যবস্থাপক জানান, তারা ২০২২ সাল থেকে পাহাড়ি কফি ব্যবহার করছেন। গ্রাহকদের সাড়াও ইতিবাচক বলে জানান তিনি।
কর্মসংস্থান ও পর্যটনের নতুন দুয়ার
কফি চাষ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ঘিরে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে। পাহাড়ের দুই হাজারের বেশি প্রান্তিক কৃষক এখন জুমচাষের বিকল্প হিসেবে কফি চাষ করছেন। বাগান পরিচর্যা, ফসল তোলা ও শুকানোর কাজে নারীদেরও কর্মসংস্থান হচ্ছে।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড ‘চা ও কফি পর্যটন’ মডেল তৈরির কাজ করছে।
কফি চাষে সবচেয়ে বড় দীর্ঘমেয়াদি হুমকি জলবায়ু পরিবর্তন। তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাওয়ায় ফলন ও মান ব্যাহত হচ্ছে। উন্নত মানের অ্যারাবিকা কফি ১৮-২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সবচেয়ে ভালো হয়, কিন্তু গরম আবহাওয়া গাছের ক্ষতি করছে।
এ ছাড়া চারা লাগানোর পর প্রথম ফলন পেতে তিন থেকে চার বছর সময় লাগে। অনেক প্রান্তিক কৃষকের জন্য এই সময়টা কঠিন। আধুনিক চাষাবাদ, সেচ ও বালাই দমনের প্রশিক্ষণ এবং মান নিয়ন্ত্রণের সঠিক ব্যবস্থার অভাবও একটি বড় বাধা। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় দ্রুত প্রক্রিয়াজাতকরণের সুবিধা না থাকায় কফির গুণগত মান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। সরাসরি বড় বাজারের সঙ্গে সংযোগ না থাকায় মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভর করতে হয় কৃষকদের।
এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও মাংপং বা রিতলাংয়ের মতো কৃষকদের কাছে কফি এখন আর কোনো পরীক্ষামূলক ফসল নয়; বরং নির্ভর করা যায় এমন ফসল হয়ে উঠছে এটি।
সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার