শিরোনাম
◈ সিরাজগঞ্জে হত্যা মামলায় ৪ জনের যাবজ্জীবন ◈ ট্রাম্পের সেই গোপন ফ্লাইটে কারা ছিলেন? ◈ লিও‌নেল মে‌সি শোক কাটিয়ে মাঠে ফিরলেন, বাবার উদ্দেশে আবেগঘন বার্তা ◈ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: ইসিতে মনোনয়নপত্র দাখিল হয়েছে তিনটি ◈ মির্জা ফখরুলের পর বিএনপির মহাসচিব কে, আলোচনায় তিন নাম ◈ ভারতে ভ্রমণে যাত্রীদের জন্য নতুন নির্দেশনা ◈ আপাতত লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা এবং অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই: বিদ্যুৎমন্ত্রী ◈ শিক্ষকতা থেকে রাষ্ট্রপতি পদে, মির্জা ফখরুলের বর্ণিল রাজনৈতিক যাত্রা ◈ এনআইডির জন্মতারিখ সংশোধনের ক্ষমতা পেলেন মাঠ কর্মকর্তারা ◈ প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর এখনো চূড়ান্ত হয়নি: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

প্রকাশিত : ১৩ আগস্ট, ২০২৬, ০৬:২৫ বিকাল
আপডেট : ১৩ আগস্ট, ২০২৬, ০৭:০০ বিকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

ব্যাংক অ্যাকাউন্ট না খুলেও অপরাধীর তালিকায় নাম, ভুয়া হিসাবে লেনদেন লাখ লাখ টাকা

সরকারি বাঙলা কলেজের অনার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী ইমরান হাফিজ। গত ৬ জুন দুপুরে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন পান। অন্য পাশের ব্যক্তি নিজেকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) পরিচয় দেন। নাম সুমিত দাশ।

ইমরানকে তিনি জানান, চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাইবার ট্রাইব্যুনালে তার নামে একটি সাইবার পিটিশন মামলা হয়েছে। সিটি ব্যাংকে তার নামে একটি অ্যাকাউন্ট আছে, যাতে বড় অংকের আর্থিক লেনদেন হয়েছে। অ্যাকাউন্ট খুলতে ব্যবহার করা হয়েছে ইমরানের নামে থাকা ট্রেড লাইসেন্স। মুহাম্মদ মনজুর মোর্শেদ নামে এক ভুক্তভোগী মামলাটি করেন।

আচমকা এমন তথ্যের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না ইমরান। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন তার নামে সিটি ব্যাংকে কোনো অ্যাকাউন্ট নেই, তিনি কখনো সিটি ব্যাংকে যাননি। আর ট্রেড লাইসেন্স থাকার তো প্রশ্নই ওঠে না।

কথোপকথনের এক পর্যায়ে ওই পুলিশ কর্মকর্তা পরিচয় দেওয়া ব্যক্তি চট্টগ্রামে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে বলেন। এতে দৃঢ় হয় তার সন্দেহ। ইমরানের কাছে এটি কোনো প্রচারণামূলক বা প্রতারণামূলক ফোনকল বলেই মনে হয়। ফলে বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে কাউকে জানাননি।

এর প্রায় এক মাস পরের ঘটনা। ১২ জুলাই আবারও একটি অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন আসে ইমরানের কাছে। অন্য পাশ থেকে পরিচয় দেন এএসআই বুলবুল, উত্তরা পূর্ব থানা।

বুলবুল ফোনে ইমরানকে জানান, তার নামে যে ব্যাংক অ্যাকাউন্টটি খোলা হয়েছে, সেখানে বর্তমান ঠিকানা হিসেবে উত্তরা রানাভোলা এলাকার একটি ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইমরান স্পষ্টভাবে জানান, তিনি কখনো ওই ঠিকানায় বসবাস করেননি। ওখানে যাননি কখনো।

১২ জুলাই এএসআই বুলবুলের ফোন পাওয়ার পর বিষয়টি ইমরান গুরুত্বের সঙ্গে নেন। জানান পরিবারকে। ১৫ জুলাই তদন্তের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট থানার এএসআই ফজলুল করিম ইমরানের সাতক্ষীরার স্থায়ী ঠিকানায় উপস্থিত হন। এতে আরও দিশাহারা হয়ে পড়েন ইমরান। বাবা অসুস্থ, কর্মক্ষম নন। টিউশনি করে নিজের খরচ চালান। এর মধ্যে এই উটকো ঝামেলা তার স্বাভাবিক জীবন কেড়ে নিয়েছে। চিন্তিত তার পরিবারও।

একপর্যায়ে বিষয়টি জাগো নিউজকে জানান ভুক্তভোগী ইমরান। সব শুনে ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে অনুসন্ধানে নামেন প্রতিবেদক।

অনুসন্ধান চলার মধ্যেই ইমরান বেশকিছু কাজ এগিয়ে নেন ব্যক্তিগত সুরক্ষায়। তিনি সিটি ব্যাংকের কাস্টমার কেয়ারে যোগাযোগ করেন। সেখান থেকে ইমরানকে নিকটস্থ যে কোনো সিটি ব্যাংক শাখায় গিয়ে তথ্য জানতে পরামর্শ দেন। সেই পরামর্শ অনুযায়ী গত ১৬ জুলাই সিটি ব্যাংক, মিরপুর-১ শাখায় যান। সেখানে শাখা ব্যবস্থাপক যাচাই করে জানান ইমরানের নামে সিটি ব্যাংকে কোনো অ্যাকাউন্ট নেই। আরও ধন্ধে পড়ে যান ইমরান।

পরবর্তীসময়ে ইমরানের উপস্থিতি, অনুমতি ও যাচাই ছাড়া কীভাবে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা হলো- এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে সিটি ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে ই-মেইল করেন। ইমরান জানতে চান, তার নামে হিসাবটি কোন নথির ভিত্তিতে খোলা হয়েছে, কীভাবে Know your customer-KYC (আপনার গ্রাহককে জানুন) সম্পন্ন হয়েছে এবং হিসাব খোলার আবেদনপত্র, পরিচয় যাচাই-সংক্রান্ত নথি ও সংশ্লিষ্ট রেকর্ড তদন্তের আওতায় আনা হবে কি না।

একই সঙ্গে ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর অবহেলা বা সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানান তিনি।

পরে ফিরতি মেইলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে জানালেও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কোনো সন্তোষজনক জবাব বা ব্যাখ্যা দেয়নি।

একই সঙ্গে ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর অবহেলা বা সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তিনি।

এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও নিজের নিরাপত্তার জন্য গত ২৬ জুলাই গুলশান মডেল থানায় সিটি ব্যাংক, গুলশান-১ শাখার বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। ৩০ জুলাই তার নামে থাকা ট্রেড লাইসেন্সের বিষয়ে তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে মিরপুর শাহ আলী থানায় দায়ের করেন আরেকটি লিখিত অভিযোগ।

পাশাপাশি সিটি ব্যাংকের কাস্টমার কেয়ার ও ই-মেইলের মাধ্যমে যোগাযোগ করেও কোনো ব্যাখ্যা না পাওয়ায় ব্যাংকটির বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেন ইমরান।

জাগো নিউজের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসতে থাকে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাইবার ট্রাইব্যুনালে ইমরান হাফিজের নামে সাইবার পিটিশন মামলার কপি, সাইবার ট্রাইব্যুনাল থেকে ইমরান হাফিজের ব্যাংক হিসাব সংক্রান্ত তথ্য জানতে চেয়ে সিটি ব্যাংক গুলশান-১ শাখা বরাবর পাঠানো চিঠি হাতে আসে জাগো নিউজের।

মামলার আবেদনে যা বলা হয়েছে

মামলার বাদী মুহাম্মদ মনজুর মোর্শেদের অভিযোগ, ২৪ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে টেলিগ্রামে ‘@Noor_Alishal’ আইডি থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। অনলাইনে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে কাজ করে আয় এবং বিনিয়োগের মাধ্যমে অধিক মুনাফার প্রলোভন দেখানো হয় তাকে।

প্রতারকদের কথায় বিশ্বাস করে তিনি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীসময়ে প্রতারকদের দেওয়া বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব ও বিকাশ নম্বরে ধাপে ধাপে মোট ৪২ লাখ ৭৩ হাজার ৮৪৬ টাকা পাঠান। পরে আরও অর্থ বিনিয়োগের চাপ দেওয়া হলে তার সন্দেহ হয় এবং তিনি বুঝতে পারেন যে এটি একটি সংঘবদ্ধ অনলাইন প্রতারক চক্র।

এরপর তিনি অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তদন্তের অংশ হিসেবে সিএমপি সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে সংশ্লিষ্ট হিসাবধারীর পরিচিতি ও লেনদেনের তথ্য চায়। এরপরই তদন্তে উঠে আসতে শুরু করে কীভাবে ভুয়া তথ্য ব্যবহার করে ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছিল এবং সেই হিসাবে সন্দেহজনক লেনদেন পরিচালিত হয়।

পরে এ মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে মামলাকারী মনজুর মোর্শেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি প্রতারণা শিকার হয়ে মামলা করেছি। এখন তদন্ত চলমান। আপনার কোনো প্রশ্ন-জিজ্ঞাসা থাকলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কথা বলতে পারেন, এটা নিয়ে আমি আর কথা বলতে চাচ্ছি না।’

এক মাসেই ২৪ লাখ টাকার লেনদেন

ব্যাংক থেকে সরবরাহ করা নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৫ সালের ৬ এপ্রিল সিটি ব্যাংকের গুলশান-১৩০ শাখায় হিসাবটি খোলা হয়। ৯ এপ্রিল হিসাব অনুমোদন দেওয়া হয় এবং ১৪ এপ্রিল থেকে লেনদেন শুরু হয়। একই মাসের ২৯ এপ্রিল বিভিন্ন ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে প্রায় ২১ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। বড় অঙ্কের টাকা তাৎক্ষণিক ট্রান্সফার করার পদ্ধতি আরটিজিএস-এর মাধ্যমে অ্যাকাউন্টে ১৯ লাখ ১৮ হাজার ৫০০ টাকা মেসার্স এমএম ফারুকী এন্টারপ্রাইজ থেকে অ্যাকাউন্টে জমা হয়। পরে একই দিন ধাপে ধাপে ছয়টি আলাদা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে তাৎক্ষণিক আন্তঃব্যাংক কার্ড ও অ্যাকাউন্ট লেনদেনে ব্যবহৃত এনপিএসবির মাধ্যমে সব টাকা তুলে নেওয়া হয়। পুরো এপ্রিল মাসে হিসাবটিতে মোট লেনদেন হয় ২৪ লাখ টাকার বেশি। অ্যাকাউন্টটি বর্তমানে ফ্রিজ করা। এসব লেনদেনের মেইল বা মেসেজ কোনোটি ইমরান হাফিজের কাছে যায়নি। তার নামে ব্যবহৃত ভুয়া মোবাইলে কোনো মেসেজ গেছে কি না সেটা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

আবেদনপত্রে যে তথ্য মিলেছে

হিসাব খোলার আবেদনপত্রে ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার স্বাক্ষর রয়েছে। সেখানে দুটি মোবাইল নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে। এর একটি নম্বর ব্যাংকের রিটেইল কর্মকর্তা রেজাউল কবিরের। অন্য নম্বরটি (হিসাবধারী হিসেবে এ নম্বরটি দেওয়া) ট্রুকলার অ্যাপে মাদারীপুরের ডাসার উপজেলার একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সালাহ উদ্দিন আকনের নামে নিবন্ধিত দেখা যায়।

এছাড়া হিসাবে নমিনি ফেনসি আক্তার। সম্পর্কের স্থানে লেখা হয়েছে ‘আন্টি’।

হিসাব খোলার ফরমে ইমরানকে একজন ব্যবসায়ী হিসেবে দেখানো হয়েছে। তার মাসিক আয় উল্লেখ করা হয়েছে ৫০ হাজার টাকা। তার নামে একটি ট্রেড লাইসেন্সও আছে। বাস্তবে তিনি একজন কলেজ শিক্ষার্থী। কখনো ব্যবসা করেননি। টিউশনি করে তার মাসিক আয় পাঁচ হাজার টাকার মতো।

ফরমে বর্তমান ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ‘ফাহাদ টেলিকম, ৪-এ, রানাভোলা, ১৫ নম্বর বাসা’। স্থায়ী ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে জাতীয় পরিচপত্র অনুযায়ী।

ভুক্তভোগী ইমরান হাফিজের দাবি

ইমরান হাফিজ জাগো নিউজের কাছে দাবি করেন, তিনি জীবনে কখনো সিটি ব্যাংকের কোনো শাখায় যাননি কিংবা কোনো ব্যাংক হিসাব খোলেননি। অথচ তার নামে একটি ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে, যেখানে ব্যবহার করা হয়েছে একের পর এক মিথ্যা তথ্য। হিসাব খোলার ফরমে যে তথ্য দেওয়া হয়েছে তার কোনোটিই সঠিক নয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, ইমরান হাফিজের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) থেকে তার মুখের ছবি সংগ্রহ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির মাধ্যমে টাই-কোট পরিহিত একটি নতুন ছবি তৈরি করা হয়েছে। একইভাবে এনআইডিতে থাকা স্বাক্ষরের সঙ্গে বাস্তব স্বাক্ষরের কোনোভাবেই মিল নেই।

এছাড়া ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের যে ঠিকানা বর্তমান ঠিকানা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে সেখানে তিনি কখনো যাননি বা চেনেন না বলে দাবি ইমরানের। আর ট্রেড লাইসেন্সে যে ছবি ব্যবহার করা হয়েছে সেটি কলেজের বিভিন্ন কাজে এবং এক বন্ধুকে ই-লার্নার করতে দেওয়া ছাড়া কাউকে কখনো দেননি।

ব্যাংকের তথ্য ও ইমরানের দাবি: অনুসন্ধানে যা পাওয়া গেলো

অ্যাকাউন্ট ইমরানের, মোবাইল নম্বর মাদারীপুরের শিক্ষকের

সিটি ব্যাংকের ফরমে দুটি নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, একটি নম্বর ব্যাংকের রিটেইল কর্মকর্তা রেজাউল কবিরের। আরেকটি নম্বর (যেটি হিসাবধারীর নম্বর হিসেবে ব্যবহৃত) মাদারীপুরের একজন শিক্ষকের।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিটি ব্যাংকের রিটেইল কর্মকর্তা রেজাউল কবির জাগো নিউজকে বলেন, ‘অ্যাকাউন্টটি আমি করেছি। তাই আমার নম্বর দেওয়া আছে। ইমরান হাফিজ আমার ক্লায়েন্ট। তিনিই এসে স্বাক্ষর করেছেন এবং চেকবই নিয়েছেন। তবে বিষয়টি নিয়ে শাখা ব্যবস্থাপকের সঙ্গে কথা বলে বিস্তারিত জানাতে পারবো।’

তিনি আরও বলেন, ‘গ্রাহক এসেছিলেন বলেই হিসাব খুলেছি। তখন এমন কোনো জটিলতার বিষয় বুঝতে পারিনি।’

অনুসন্ধানে জানা যায়, ট্রুকলারে পাওয়া নাম ধরে অপর নম্বরটি মাদারীপুরের ডাসার উপজেলার বীরমোহন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সালাহ্ উদ্দিন আকনের বলে নিশ্চিত হয় জাগো নিউজ। এলাকায় খোঁজ নিয়েও তার নাম-পরিচয় সঠিক বলে নিশ্চিত হওয়া যায়।

পরে এ বিষয়ে সালাহ্ উদ্দিন আকন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি ইমরান হাফিজ নামে কাউকে চিনি না। কিছুদিন আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে তদন্তের স্বার্থে আমাকে ফোন করা হয়েছিল। তখন বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। এখন আপনার কাছ থেকেই জানতে পারলাম, আমার নম্বর ব্যবহার করে একটি ভুয়া ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে। আমি এ প্রতারক চক্রের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’

ইমরানের বাড়ি সাতক্ষীরা, নমিনি তার ‘আন্টি’ থাকেন গাইবান্ধা

ব্যাংক হিসাবে গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার ফেনসি আক্তারকে নমিনি দেখানো হয়েছে। তাকে ইমরান হাফিজের ‘আন্টি’ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও বাস্তবে তাদের মধ্যে কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই।

ইমরান হাফিজ জানান, তিনি কখনো ফেনসি আক্তারকে চেনেন না। এমনকি মো. সালাহ্ উদ্দিন আকনও তাদের কাউকেই ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না। দুজনের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলে ও একজনের এলাকায় খোঁজ নিয়ে এ তথ্যের সত্যতা মিলেছে।

জাগো নিউজের হাতে আসা নমিনি ফেনসি আক্তারের জাতীয় পরিচয়পত্র থেকে জানা যায় তার বাড়ি গাইবান্ধা। ফেনসির খোঁজে জাগো নিউজ পাড়ি জমায় ফেনসির বাড়ি গাইবান্ধার ফুলছড়ির ঝাঞ্জার কানঝইড় গ্রামে। কিন্তু সেখানে গিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্রে থাকা ঠিকানায় ফেনসিকে পাওয়া যায়নি। তার বাবার নাম উল্লেখ আছে মো. শাজাহান। পরে এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায় নদীভাঙনে তাদের ভিটামাটি হারালে এলাকা ছেড়ে চলে যান। আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গেও যোগাযোগ নেই।

ফুলছড়ি ইউনিয়নের ইউপি সদস্য (ঝাঞ্জার কানঝইড়) বেলাল হোসেনের সঙ্গে কথা হলে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘নদীভাঙনে ফেন্সি আক্তারের পরিবারের ঘর-বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়। পরে তারা কাজের সন্ধানে অন্য জায়গায় চলে যায়। তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও তার আত্মীয়-স্বজনের কারও যোগাযোগ নেই বলে জানি।’

বর্তমান ঠিকানা ‘ভুয়া’, ‘অস্তিত্বহীন’ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান

হিসাব খোলার নথিতে ইমরান হাফিজের বাসা ও ব্যবসার ঠিকানা হিসেবে উত্তরার রানাভোলা এলাকার বিভিন্ন ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে।

ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ‘ফাহাদ টেলিকম, ৪-এ, রানাভোলা, ১৫ নম্বর বাসা’।

এই ঠিকানায় আসলে এই নামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে কি না তা জানতেও অনুসন্ধান চালায় জাগো নিউজ। সরেজমিনে উত্তরা গিয়ে দেখা যায়, ওই এলাকায় ‘৪-এ’ নামে কোনো সড়ক নেই। তবে ৪ নম্বর সড়ক থাকলেও সেখানে ১৫ নম্বর কোনো বাসা নেই। এছাড়া ‘ফাহাদ টেলিকম’ নামে কোনো প্রতিষ্ঠানও খুঁজে পাওয়া যায়নি। সড়কটির সবশেষ বাড়ি নম্বর ১২। এর পরই রাস্তা শেষ হয়ে গেছে।

বর্তমান ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে রানাভোলার ৪ নম্বর সেক্টরের ১৬ নম্বর রোডের ১৯ নম্বর বাসা। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ১৬ নম্বর সড়কটি আসলে ১০ নম্বর সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত। ওই বাসার নিচের দোকানি ও ভাড়াটিয়া সোহাইব জাগো নিউজকে জানান, সেখানে ইমরান হাফিজ নামে কোনো ব্যক্তি কখনো বসবাস করেননি। বাড়ির মালিকও একই তথ্য নিশ্চিত করেন।

ই-ট্রেড লাইসেন্স খুলেও প্রতারণা

ইমরান হাফিজের অজান্তেই তার নামে ২০২৪ সালের ১১ জুলাই একটি ই-ট্রেড লাইসেন্স খোলা হয়েছে। সেখানে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ফাহাদ টেলিকম’, যার কোনো বাস্তব অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ট্রেড লাইসেন্স খুলতে ব্যক্তির সশরীরের উপস্থিতি জরুরি নয় বলে জানা যায়। প্রতারকরা এ সুযোগ নিতে পারেন বলে ধারণা।

ট্রেড লাইসেন্সে মালিকের বর্তমান ঠিকানা হিসেবে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার জালালপুর উল্লেখ করা। ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বর্তমান ঠিকানা ঢাকা ব্যবহার করলেও ট্রেড লাইসেন্সে ব্যবহার করা হয়েছে সুনামগঞ্জ। সেখানে যে মোবাইল নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে সেটি আবার আলাদা। সেটাও ইমরান হাফিজের না

এ বিষয়ে ইমরান হাফিজ জানান, তিনি জীবনে কখনো সুনামগঞ্জ যাননি। তার গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরায় এবং তিনি প্রায় পাঁচ বছর ধরে ঢাকার মিরপুরে বসবাস করছেন।

সিটি ব্যাংকে জমা দেওয়া ট্রেড লাইসেন্সের কপিতে ব্যাংকের পক্ষ থেকে হাতে লেখা একটি প্রত্যয়ন রয়েছে, যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘আমি ফিজিক্যালি কাস্টমারের কাছ থেকে সব ডকুমেন্টস ও কাস্টমারের অথেনটিক ই-ট্রেড লাইসেন্সের অরিজিনাল কপি দেখে সংগ্রহ করেছি।’

এ প্রত্যয়নে টিম লিডার রাহেল ইসলাম, ডেপুটি ইউনিট হেড মো. সালেহ উদ্দিন এবং টিপিএমও মো. রেজাউল কবিরের স্বাক্ষর রয়েছে।

পুরো বিষয়টি নিয়ে সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাসরুর আরেফিনের মতামত জানতে তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে গত ২১ জুলাই হোয়াটসঅ্যাপে লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হয়। তবে তিনি সিন করলেও কোনো মন্তব্য করেননি। পরে ১৩ আগস্ট সন্ধ্যায় ফোন দিলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।

যে প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো মিলছে না

একজন ব্যক্তি উপস্থিত না থাকলে তার নামে কীভাবে ব্যাংক হিসাব খোলা হলো? হিসাব খোলার সময় পরিচয় যাচাই, মোবাইল নম্বর যাচাই ও প্রয়োজনীয় KYC প্রক্রিয়া কীভাবে সম্পন্ন করা হয়েছিল? ব্যবহৃত ট্রেড লাইসেন্স, ছবি, স্বাক্ষর ও অন্য নথি যাচাইয়ে কোনো অসঙ্গতি ধরা পড়েনি কেন? নাকি এটি পরিচয় চুরির একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, অথবা এর পেছনে আরও বড় কোনো প্রতারণার নেটওয়ার্ক কাজ করেছে?

প্রাথমিক তদন্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যা পেল

ঘটনাটি বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তাধীন। এ ঘটনায় চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাইবার ট্রাইব্যুনালে সাইবার পিটিশন মামলা নং-২৩/২০২৫ দায়ের হয়েছে। মামলাটির তদন্ত করছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট।

আমরা ইমরান হাফিজের বিষয়ে অনুসন্ধান করেছি। তবে হিসাব খোলার ফরমে যে ঠিকানা দেওয়া হয়েছে সেখানে তার কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। তদন্তে আমরা যেটুকু পেয়েছি, সেটিই প্রতিবেদনে উল্লেখ করবো।-এএসআই বুলবুল

তদন্তের স্বার্থে সিএমপি সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবধারীর পরিচিতি ও ১ মার্চ ২০২৫ থেকে ৩০ মে ২০২৫ পর্যন্ত আর্থিক লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে।

তদন্ত কর্মকর্তা সিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের পুলিশ পরিদর্শক সঞ্জয়। অন্যদিকে, হিসাবে ব্যবহৃত ঠিকানা উত্তরার হওয়ায় ছায়া তদন্ত করছে উত্তরা পশ্চিম (বা সংশ্লিষ্ট) থানা। এ তদন্তের দায়িত্বে রয়েছেন সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) বুলবুল।

তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে এএসআই বুলবুল জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা ইমরান হাফিজের বিষয়ে অনুসন্ধান করেছি। তবে হিসাব খোলার ফরমে যে ঠিকানা দেওয়া হয়েছে সেখানে তার কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। তদন্তে আমরা যেটুকু পেয়েছি, সেটিই প্রতিবেদনে উল্লেখ করবো।’

ইমরান হাফিজের স্থায়ী ঠিকানায়ও পুলিশ ছায়া তদন্ত করে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ থানার সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) ফজলুল করিম গত ১৬ জুলাই ইমরান হাফিজের গ্রামের বাড়ি স্বরাব্দীপুর গ্রামে যান।

জাগো নিউজকে ফজলুল করিম বলেন, ‘সাইবার ক্রাইমে যে মামলাটি হয়েছে এজন্য তার ঠিকানা সঠিক আছে কি না এটা দেখতে গিয়েছিলাম। কারণ এলাকার লোক হিসেবে ছেলেটি কেমন ছিল বা তার নাম-ঠিকানা সব কিছু সঠিক আছে কি না কেবল এটুকু দেখার দায়িত্ব ছিল। এলাকার সবাই তাকে ‘ভালো’ বলেছে।

তবে কোনো আর্থিক লেনদেন বা গোয়েন্দা সংস্থার বিষয়ে তার কোনো অ্যাক্সেস নেই এবং তদন্তের মূল বিষয়টি সাইবার ক্রাইম ভালো বলতে পারবেন বলে জানান।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন (সিএমপি) পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. শামীম হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘যে কোনো ভুক্তভোগীর অভিযোগের ভিত্তিতে সাইবার অপরাধের ঘটনাগুলো সাইবার সাপোর্ট সেন্টারের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়। অভিযোগের প্রকৃতি অনুযায়ী প্রয়োজন হলে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়, আর আমলযোগ্য (কগনিজেবল) অপরাধের ক্ষেত্রে মামলা করার পরামর্শ দেওয়া হয়।’

তিনি বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট ঘটনায় যদি ইতোমধ্যে সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা হয়ে থাকে, তাহলে তদন্তকারী কর্মকর্তা মামলাটি তদন্ত করবেন। তদন্তে জালিয়াতির প্রমাণ ও অভিযুক্তকে শনাক্ত করা গেলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিয়ে আদালতে প্রসিকিউশন করা হবে।’

জাল নথি ব্যবহারের শাস্তি যাবজ্জীবন বা সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড

মানবাধিকার কর্মী ও বিশিষ্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট আখতারুজ্জামান ডালিম জাগো নিউজকে বলেন, ‘অন্যের এনআইডি ব্যবহার করে ভুয়া ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, সই জাল করা বা এআই দিয়ে নথি জাল করার অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর।’

জাল নথি ব্যবহার করলে ৪৭১ ধারাও প্রযোজ্য হতে পারে, যেখানে জাল দলিলকে আসল হিসেবে ব্যবহার করাও অপরাধ। যদি কোনো ব্যাংক কর্মকর্তা বিশ্বাসভঙ্গ বা ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে এতে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে পরিস্থিতিভেদে ৪০৯ ধারায় (বিশ্বাসভঙ্গ) মামলা হতে পারে, যার শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানা।-মানবাধিকার কর্মী ও বিশিষ্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট আখতারুজ্জামান ডালিম

অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে এটি দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৪৬৭ ধারায় (মূল্যবান দলিল বা নিরাপত্তা-সংক্রান্ত জালিয়াতি) শাস্তিযোগ্য অপরাধ, যার শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং জরিমানা হতে পারে বলে জানান এই আইনজীবী।

আখতারুজ্জামান ডালিম বলেন, ‘জাল নথি ব্যবহার করলে ৪৭১ ধারাও প্রযোজ্য হতে পারে, যেখানে জাল দলিলকে আসল হিসেবে ব্যবহার করাও অপরাধ। যদি কোনো ব্যাংক কর্মকর্তা বিশ্বাসভঙ্গ বা ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে এতে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে পরিস্থিতিভেদে ৪০৯ ধারায় (বিশ্বাসভঙ্গ) মামলা হতে পারে, যার শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানা।’

তাই নিরপেক্ষ তদন্ত, ফরেনসিক স্বাক্ষর পরীক্ষা ও ডিজিটাল আলামতের বিশ্লেষণের মাধ্যমে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

‘ব্যাংকের ওপর আস্থা হারাবে গ্রাহক’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এবং অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. আবদুল বায়েস বলেন, অন্যের এনআইডি ব্যবহার করে ভুয়া ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে প্রতারণা করা গুরুতর অপরাধ। তবে শুধু কোনো অ্যাকাউন্টে বড় অংকের লেনদেন দেখেই কাউকে অপরাধী বলা উচিত নয়। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমেই সত্য বের করতে হবে। তবে ভুয়া হিসাবের এমন ঘটনায় ব্যাংক ইমেজ সংকটে পড়বে। গ্রাহকেরও আস্থা হারানোর আশঙ্কা আছে।

‘গ্রাহকের অজান্তে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা ফৌজদারি অপরাধ’

কারও জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে তার অজান্তে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা একটি মারাত্মক অপরাধ ও জালিয়াতি। এটি কেবল ব্যাংক বা গ্রাহকের বিষয় নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকেও একটি ফৌজদারি অপরাধ (ক্রিমিনাল কেস)।-বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘কারও জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে তার অজান্তে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা একটি মারাত্মক অপরাধ ও জালিয়াতি। এটি কেবল ব্যাংক বা গ্রাহকের বিষয় নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকেও একটি ফৌজদারি অপরাধ (ক্রিমিনাল কেস)।’

এটি দুই উদ্দেশ্যে হতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, হয় অ্যাকাউন্টে অবৈধ লেনদেন ও জালিয়াতি করা, অথবা ওই নির্দোষ ব্যক্তি বা শিক্ষার্থীকে বিপদে ফেলা। এটি একটি গুরুতর অপরাধ এবং শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরে নয়, এটি দেশের আইন অনুযায়ী একটি ফৌজদারি মামলা হিসেবে বিবেচ্য।’

ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহক বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিসেস ডিপার্টমেন্টে (এফআইসিএসডি) সরাসরি অভিযোগ জানাতে পারেন। এছাড়া গভর্নর বরাবর লিখিত অভিযোগের মাধ্যমেও প্রতিকার চাওয়া সম্ভব বলে জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের এই মুখপাত্র।

ইমরান হাফিজ লিখিত অভিযোগ জানানোর সপ্তাহখানেক পর আরিফ হোসেন খানের কাছে অগ্রগতি জানতে চাইলে বলেন, যে কোনো অভিযোগ দেওয়ার পরই আমাদের সংশ্লিষ্ট বিভাগ সেটা নিয়ে কাজ শুরু করে। ইমরান হাফিজের অভিযোগের বিষয়েও একই।

তিনি এ বিষয়ে এর বেশিকিছু বলেননি।

‘ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ছাড়া অন্যের এনআইডি ব্যবহার করে হিসাব খোলা সম্ভব নয়’
ভুয়া অ্যাকাউন্ট খোলা বা আর্থিক জালিয়াতি দাপ্তরিক নিয়মের লঙ্ঘন। ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ছাড়া অন্যের এনআইডি ব্যবহার করে ব্যাংক হিসাব খোলা সম্ভব নয়। কারও এনআইডি ব্যবহার করে অ্যাকাউন্ট খোলা শুধু ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার নয়, এটি ব্যাংকিং ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।-আইটি বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা

এ বিষয়ে আইটি বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা জাগো নিউজকে বলেন, ‘ভুয়া অ্যাকাউন্ট খোলা বা আর্থিক জালিয়াতি দাপ্তরিক নিয়মের লঙ্ঘন। ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ছাড়া অন্যের এনআইডি ব্যবহার করে ব্যাংক হিসাব খোলা সম্ভব নয়। কারও এনআইডি ব্যবহার করে অ্যাকাউন্ট খোলা শুধু ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার নয়, এটি ব্যাংকিং ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তোলে। তাই ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ যাচাই ব্যবস্থা আরও কঠোর করা প্রয়োজন।’

তিনি বলেন, ‘নিবন্ধিত ভোটারসহ বিপুলসংখ্যক এনআইডি তথ্য ডার্ক ওয়েবে ফাঁস হয়েছে। সরকারি ওয়েবসাইট, ক্যাবিনেট ও সামরিক-সংশ্লিষ্ট সংবেদনশীল তথ্য এবং পরিচয়পত্রের তথ্যও সেখানে ছড়িয়ে পড়েছে। পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও হেলথ কার্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবার সার্ভার বা ডোমেইনে হামলার জন্য ডার্ক ওয়েবে ম্যালওয়্যার ও পেলোড প্রস্তুত রাখা হয়েছে।’

বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সেবার সঙ্গে এসব কার্ড যুক্ত করার আগে সম্ভাব্য সাইবার ঝুঁকি এড়াতে প্রয়োজনীয় সতর্কতা নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

‘ব‍্যাংক কর্তৃপক্ষ কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারে না’

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, ‘এমন জালিয়াতি করে অ্যাকাউন্ট খুলে সন্দেহজনক লেনদেন ও তার মাধ্যমে সম্পূর্ণ নিরপরাধ ব্যক্তির হয়রানিসহ বহুস্তরীয় অপরাধে যারা জড়িত তাদের দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহি নিশ্চিত করা অপরিহার্য।’

একইভাবে পুরো প্রক্রিয়ার শুরু থেকে, অর্থাৎ ব‍্যক্তিগত তথ্য ফাঁস যারা করেছেন ও ফাঁসের সুযোগ করে দিয়ে লাভবান হয়েছেন এবং ব‍্যাংক কর্তৃপক্ষও কোনোভাবেই অ্যাকাউন্ট খোলার পূর্বশর্ত হিসেবে কাস্টমার সম্পর্কে যথাযথ তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি তথ‍্যের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে ব‍্যর্থতার দায় এড়াতে পারে না বলে জানান তিনি।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘বহুমাত্রিক এই জালিয়াতি চক্রের পুরো প্রক্রিয়ায় যারা জড়িত তাদের সবার কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।’

একজন কলেজ শিক্ষার্থীর নামে ভুয়া ব্যাংক হিসাব খুলে লাখ লাখ টাকার লেনদেন হওয়া শুধু একটি প্রতারণার ঘটনা নয়; এটি দেশের ব্যাংকিং KYC ব্যবস্থা, পরিচয় সুরক্ষা ও আর্থিক নিরাপত্তা কাঠামোর কার্যকারিতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। 

বি.দ্র: প্রতিবেদনটি তৈরি করতে সহায়তা করেছেন জাগো নিউজের নিজস্ব প্রতিবেদক চট্টগ্রামের মো. ইকবাল হোসেন, গাইবান্ধা প্রতিনিধি আনোয়ার আল শামিম ও মাদারীপুর প্রতিনিধি আয়শা সিদ্দিকা আকাশী।

সূত্র: জাগো নিউস ২৪ 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়