শিরোনাম
◈ নতুন পাঁচজনকে নিয়ে মন্ত্রিসভায় রদবদল, কে কোন দায়িত্ব পাচ্ছেন? ◈ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি: রয়টার্সকে প্রেস সচিব ◈ ইতালির তৃতীয় বিভাগ ক্লাব রাভেনা এফসির অংশীদার হলেন রোনালদিনহো ◈ রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ◈ ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুলের শপথ আজ: বঙ্গভবনে অতিথিদের ভিড়, জোরদার নিরাপত্তা ◈ ইউরোপে অনিয়মিত অভিবাসন কঠিন, ঝুঁকিতে বাংলাদেশি তরুণদের স্বপ্ন ◈ বিমান থেকে সরানো হচ্ছে আফরোজাকে, পাচ্ছেন যে মন্ত্রণালয় ◈ সৌদি-পাকিস্তান-তুরস্ক সামরিক জোটে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান নিয়ে যা বলছে ভারত ◈ রাজস্থানে ককরোচ পার্টির ওপর হামলা, বিজেপির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ◈ তারেক রহমানের সফরের প্রস্তুতির খবর দিয়ে আবার প্রত্যাহার করল ভারত

প্রকাশিত : ০২ জুলাই, ২০২৬, ০৮:৫৮ রাত
আপডেট : ১৮ আগস্ট, ২০২৬, ০৯:০০ রাত

প্রতিবেদক : মনজুর এ আজিজ

গ্যাস-বিদ্যুৎসহ ১১টি বড় প্রকল্পে ৯.২১ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব চীনের

চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল: দেড় লাখ কর্মসংস্থান, বদলে যাবে দেশের অর্থনীতি

মনজুর এ আজিজ: বাংলাদেশে নতুন শিল্পায়নের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার নাম এখন চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল। প্রায় এক দশকের দীর্ঘ অপেক্ষা, প্রশাসনিক জটিলতা ও নীতিগত স্থবিরতা কাটিয়ে অবশেষে চট্টগ্রামের আনোয়ারা এবং বাগেরহাটের মোংলাকে কেন্দ্র করে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়নের পথে বড় অগ্রগতি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরে স্বাক্ষরিত চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) এই প্রকল্পগুলোকে নতুন গতি দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে শুধু বিদেশি বিনিয়োগই বাড়বে না, দেশের শ্রমবাজারে সৃষ্টি হবে বিপুল কর্মসংস্থান। তাছাড়া গ্যাস অনুসন্ধান, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, স্মার্ট মিটার, ই-বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, কোল্ড-চেইন লজিস্টিকস, টেক্সটাইল, লিথিয়াম ব্যাটারি, রেলওয়ের যন্ত্রাংশ, কারিগরি শিক্ষা, আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং ভেষজ শিল্পসহ ১১টি বড় প্রকল্পে ৯.২১ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছে চীন। 

সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, আনোয়ারা চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলে এক লাখ এবং মোংলা পোর্ট অর্থনৈতিক অঞ্চলে আরও প্রায় ৫০ হাজার মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান হবে। অর্থাৎ এই দুই অর্থনৈতিক অঞ্চল থেকেই প্রায় দেড় লাখ মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। পরিবহন, নির্মাণ, আবাসন, সরবরাহ ব্যবস্থা, ব্যাংকিং, বীমা, হোটেল-রেস্তোরাঁ, লজিস্টিকস ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাসহ সংশ্লিষ্ট খাতগুলোতে আরও কয়েক লাখ মানুষের পরোক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। 

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। কিন্তু শিল্পে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না থাকায় কাঙ্ক্ষিত হারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। ফলে নতুন এই অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে নয়, বরং কর্মসংস্থান সংকট মোকাবিলার অন্যতম বড় উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।  

এক দশকের অপেক্ষার অবসান: বাংলাদেশে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালে। ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঢাকা সফরের সময় সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) ভিত্তিতে এই বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়। এরপর চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ভূমি অধিগ্রহণও শুরু হয়েছিল। কিন্তু ডেভেলপার নির্বাচন, অর্থায়ন, নকশা পরিবর্তন, প্রশাসনিক জটিলতা এবং নীতিগত সিদ্ধান্তে বিলম্বের কারণে প্রকল্পটি প্রায় এক দশক ধরে অগ্রসর হয়নি।

প্রথমে চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিকে (সিএইচইসি) দায়িত্ব দেওয়ার আলোচনা হলেও পরে চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনকে (সিআরবিসি) নতুন ডেভেলপার হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ও চীনা প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে প্রকল্প বাস্তবায়নের নতুন কাঠামো তৈরি হয়। 

বর্তমান সরকার কর্মসংস্থান ও বিদেশি বিনিয়োগকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ায় দীর্ঘদিনের এই স্থবির প্রকল্পটি আবারও গতি পেয়েছে। সম্প্রতি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকার সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা সহজ শর্তের ঋণ হিসেবে দেবে চীন সরকার এবং বাকি অর্থ বহন করবে বাংলাদেশ সরকার। 

আনোয়ারায় এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের স্বপ্ন: চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার প্রায় ৮০০ একর জমির ওপর গড়ে উঠবে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল। কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের কাছাকাছি হওয়ায় এটি দেশের অন্যতম কৌশলগত শিল্পাঞ্চলে পরিণত হতে যাচ্ছে। এই শিল্পাঞ্চলে বস্ত্র, তৈরি পোশাক, ওষুধ, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, মোবাইল ফোন, জুতা, বৈদ্যুতিক পণ্য, ক্রীড়া সামগ্রী, মেডিক্যাল ডিভাইস, রাসায়নিক শিল্পসহ বিভিন্ন রফতানিমুখী কারখানা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। 

বেজার তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে অন্তত এক লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান হবে। এর পাশাপাশি কাঁচামাল সরবরাহ, ট্রাক ও কনটেইনার পরিবহন, গুদামজাতকরণ, ব্যাংকিং, বীমা, খাদ্য সরবরাহ, আবাসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন খাতে আরও কয়েক লাখ মানুষের কাজের সুযোগ সৃষ্টি হবে। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে এটি হবে সবচেয়ে বড় শিল্প কর্মসংস্থানের কেন্দ্রগুলোর একটি। মোংলায় আরও ৫০ হাজার চাকরির সম্ভাবনা: চট্টগ্রামের পাশাপাশি বাগেরহাটের মোংলা পোর্ট অর্থনৈতিক অঞ্চল নিয়েও বড় অগ্রগতি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ সেমিনারে মোংলা বন্দরের পাশে চীন-বাংলাদেশ মোংলা পোর্ট অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নের বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। 

চীনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (সিসিইসিসি) মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চল, বন্ডেড ওয়্যারহাউস এবং আধুনিক লজিস্টিকস হাব নির্মাণে ৬৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। 

সরকারি হিসাবে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে আরও প্রায় ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। মোংলা বন্দরকেন্দ্রিক রফতানি, কোল্ড-চেইন, গুদামজাতকরণ ও পরিবহন খাতেও ব্যাপক কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। 

শুধু দুটি প্রকল্পেই দেড় লাখ চাকরি: সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী আনোয়ারা চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলে ১ লাখ কর্মসংস্থান ও মোংলা পোর্ট অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৫০ হাজার কর্মসংস্থান তৈরি হবে। অর্থাৎ শুধু এই দুটি প্রকল্প থেকেই প্রায় দেড় লাখ মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। শিল্পাঞ্চলকে ঘিরে গড়ে ওঠা সহায়ক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিবেচনায় নিলে কর্মসংস্থানের প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হবে। 

৯.২১ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব: চীন সফরের আরেকটি বড় অর্জন হলো বিভিন্ন খাতে প্রায় ৯ দশমিক ২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব। গ্যাস অনুসন্ধান, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, স্মার্ট মিটার, ই-বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, কোল্ড-চেইন লজিস্টিকস, টেক্সটাইল, লিথিয়াম ব্যাটারি, রেলওয়ের যন্ত্রাংশ, কারিগরি শিক্ষা, আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং ভেষজ শিল্পসহ ১১টি বড় প্রকল্পে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে চীনের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো। এছাড়া কেরানীগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলে হান্ডা ইন্ডাস্ট্রিজ ২২০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে নতুন কারখানা স্থাপন করবে, যেখানে প্রায় ১৩ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। প্রতিষ্ঠানটির মিরসরাই কারখানায় ইতোমধ্যে প্রায় ১২ হাজার মানুষ কাজ করছেন। 

বিশ্বব্যাপী উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলে পরিবর্তনের কারণে চীনের অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন উৎপাদন কেন্দ্র খুঁজছে। তুলনামূলক কম শ্রম ব্যয়, বড় অভ্যন্তরীণ বাজার, সমুদ্রবন্দর, দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগ এবং রফতানি সুবিধার কারণে বাংলাদেশ এখন চীনা বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠছে। 

সরকারও চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য আলাদা অর্থনৈতিক অঞ্চল, বিডার চীন অফিস, বিশেষ ‘চায়না রিলেশনশিপ ডেস্ক’ এবং চীনা ভাষাভিত্তিক ডিজিটাল বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্ম চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। 

অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু সমঝোতা স্মারক বা বিনিয়োগের ঘোষণা যথেষ্ট নয়। অতীতেও অনেক বড় প্রকল্প কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ ছিল। তাই এবার প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে নির্ধারিত সময়ে অবকাঠামো নির্মাণ, গ্যাস-বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা, দক্ষ জনবল তৈরি, দ্রুত প্রশাসনিক অনুমোদন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখার ওপর। বিশেষ করে আনোয়ারা প্রকল্পটি প্রায় দশ বছর বিলম্বিত হওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। 

বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি। প্রতিবছর লাখ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে এলেও পর্যাপ্ত শিল্প না থাকায় অনেকেই বেকার বা স্বল্প আয়ের কাজে যুক্ত হচ্ছেন। এই বাস্তবতায় আনোয়ারা ও মোংলার চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল শুধু দুটি শিল্প প্রকল্প নয়; বরং দেশের শিল্পায়ন, রপ্তানি বৈচিত্র্য, প্রযুক্তি স্থানান্তর, বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে পারে।

যদি ঘোষিত বিনিয়োগগুলো বাস্তবে রূপ নেয় এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী শিল্পাঞ্চলগুলো গড়ে ওঠে, তাহলে শুধু দেড় লাখ মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থানই নয়, বরং কয়েক লাখ মানুষের জীবিকা সৃষ্টি করে চট্টগ্রাম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে নতুন শিল্প অর্থনীতির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশ বৈশ্বিক উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়