মনজুর এ আজিজ: চট্টগ্রামে টানেল প্রকল্পের আওতায় নির্মিত বিলাসবহুল অতিথিশালা তিন বছরেও চালু হয়নি। ফলে সাত তারকা বা সেভেন স্টার মানের এই অতিথিশালায় এখনও পা পড়েনি কারও। নির্মাণের পর থেকে খালি পড়ে আছে। এটি নির্মাণ করতে গিয়ে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত টানেল প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে। প্রতিদিন বিপুল লোকসান দিচ্ছে টানেল। এ অবস্থায় অতিথিশালা ২৯ বছরের জন্য ইজারা দেওয়ার বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ইতিমধ্যে টেন্ডার আহ্বান করেছে সেতু কর্তৃপক্ষ। সর্বোচ্চ দরদাতা পাবেন এটি পরিচালনার দায়িত্ব।
সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, অতিথিশালাটিতে রয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার বর্গফুট আয়তনের আধুনিক সুসজ্জিত একটি বাংলো। এতে রয়েছে ছয়টি কক্ষ। সামনেই সুইমিংপুল। এটি নির্মাণ করা হয়েছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরের কথা মাথায় রেখে। তিনি গেলে সেখানে থাকবেন, এমন চিন্তা ছিল প্রকল্পের কর্মকর্তাদের। এই অতিথিশালা ছাড়াও নির্মাণ করা হয়েছে ৩০টি রেস্টহাউস।
সেতু বিভাগ বলছে, তিন বছর আগে অতিথিশালা তৈরি সম্পন্ন হলেও তা এখন পর্যন্ত চালু হয়নি। কারণ চালু করার মতো জনবল নেই। এটি নির্মাণে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকার মতো ব্যয় হয়েছে। এজন্য অতিথিশালা বাণিজ্যিক কার্যক্রমের জন্য ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এখন সেটি প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যাচ্ছে।
সেতু বিভাগ সূত্রে জানা যায়, কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত টানেল ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে চালু হয়। টানেলটি দিয়ে যানবাহন চলাচলের যে সম্ভাবনার কথা শোনানো হয়েছিল, তা এখন গালগল্পে পরিণত হয়েছে। ফলে টোল আদায়ও অনেক কম হচ্ছে।
টানেল সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই টানেল দিয়ে দৈনিক ১৭ হাজার ২৬০টি যানবাহন চলাচল করার কথা থাকলেও বর্তমানে চলছে তিন হাজার ৮৭৮টি। অর্থাৎ সমীক্ষার চেয়ে সাত ভাগের এক ভাগ গাড়ি চলছে। পাশাপাশি টানেলে যানবাহন চলাচল বাবদ দৈনিক ১১ লাখ ২২ হাজার টাকা আয় হলেও বর্তমানে ব্যয় হচ্ছে ২৩ লাখ টাকা।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ব্যয় কমিয়ে ২৩ লাখের মধ্যে আনলেও এর আগে দৈনিক ব্যয় হতো ৩৭ লাখ টাকা। টানেল দিয়ে গাড়ি চলাচল শুরু হয় ২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবর। শুরুর পর থেকে চলতি বছরের ২৯ জুন পর্যন্ত গাড়ি চলেছে ৩৭ লাখের বেশি। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে পার হয়েছে তিন হাজার ৮৭৮ গাড়ি। এই সময়ে আয় হয়েছে ১০৬ কোটি টাকা। সে হিসাবে প্রতিদিন গড়ে আয় হয়েছে ১১ লাখের বেশি। তবে আয়ের হিসাবে ব্যয় দ্বিগুণ।
পতেঙ্গা থেকে আনোয়ারা পর্যন্ত এই টানেল নির্মাণে ব্যয় হয় ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা। চীনা ঋণ এবং বাংলাদেশ সরকারের তহবিলের টাকায় এই টানেল নির্মাণ করে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিসিসিসি)। এখন টোল আদায় ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজও পেয়েছে তারা।
টানেল নির্মাণ প্রকল্পে যে জায়গায় অতিথিশালা নির্মাণ করা হয়েছে, সেটাকে বলা হয় ‘সার্ভিস এরিয়া’। প্রকল্পের শুরুতে ‘সার্ভিস এরিয়া’ ছিল না। মাঝপথে তা যুক্ত করে প্রায় ৭২ একর জায়গাজুড়ে নানা স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। এটি গড়ে তোলা হয়েছে চট্টগ্রামের আনোয়ারা এলাকায় টানেলের দক্ষিণ প্রান্তে পারকি খালের পাশে। সেখান থেকে কিছুটা দূরে সমুদ্রসৈকত। সার্ভিস এরিয়াজুড়ে বাংলো ও রেস্টহাউস ছাড়া রয়েছে টানেলের একটি রেপ্লিকা, সম্মেলনকেন্দ্র, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, হেলিপ্যাড, মসজিদ, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন। আরও রয়েছে চট্টগ্রামের ঐতিহ্য ও বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে একটি জাদুঘর। এসব স্থাপনায় শীতাতপনিয়ন্ত্রণ-ব্যবস্থা (এসি) বসানো হয়েছে ১ হাজার ১৮২ টন ক্ষমতার।
সেতু বিভাগ ও পর্যটন করপোরেশন সূত্র জানিয়েছে, আনোয়ারায় পারকি সৈকতের পাশে পর্যটন করপোরেশনের উদ্যোগে ১৩ একরের বেশি জমিতে ৭৯ কোটি টাকা ব্যয়ে অত্যাধুনিক পর্যটন কমপ্লেক্স নির্মাণ করছে পর্যটন করপোরেশন। এটি টানেলের অতিথিশালা থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে পর্যটন কমপ্লেক্স নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হয়। শেষ হওয়ার কথা ২০২২ সালের ডিসেম্বরে। যদিও এখন পর্যন্ত কাজ হয়েছে ৮০ শতাংশ। এই প্রকল্পের অধীন গড়ে তোলা হচ্ছে ১০টি একক বা সিঙ্গেল কটেজ, চারটি ডুপ্লেক্স কটেজ এবং তিনতলার একটি মাল্টিপারপাস (বহুমুখী ব্যবহার) ভবন। পর্যটন কমপ্লেক্সে হ্রদ ও শিশুদের খেলাধুলার জায়গাসহ নানা স্থাপনা থাকবে।
অতিথিশালা সম্পর্কে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সৈয়দ রজব আলী গণমাধ্যমকে বলেন, অতিথিশালা নির্মাণের পর থেকে এখন পর্যন্ত চালু করা হয়নি। এটি চালুর জন্য জনবল নেই। সরকারের সিদ্ধান্তে এখন বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের জন্য ২৯ বছরের জন্য ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ইতিমধ্যে টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। আগামী ১৩ জুলাই টেন্ডার জমা নেওয়া হবে। এরপর ২৯ বছরের জন্য সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে লিজ দেওয়া হবে।