চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ) তাদের ডিজিটাল রূপান্তরের পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে কার্গো ডেলিভারি ডকুমেন্টেশনের জন্য পূর্ণাঙ্গ স্বয়ংক্রিয় 'টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম' চালু করেছে। এর ফলে কন্টেইনার খালাস প্রক্রিয়ায় এখন থেকে আর কোনো কাগজের প্রয়োজন হবে না এবং পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সম্পন্ন হবে।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) এই উন্নত সিস্টেমটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। বন্দর কর্তৃপক্ষের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, এখন থেকে ডেলিভারি অর্ডার আবেদন জমা দেওয়া থেকে শুরু করে কার্গোর চূড়ান্ত গেট-আউট পর্যন্ত প্রতিটি স্তর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমেই সম্পন্ন হবে।
যদিও চট্টগ্রাম বন্দরে ২০১১ সাল থেকে জাহাজ চলাচল এবং কন্টেইনার হ্যান্ডলিং ব্যবস্থাপনায় টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহৃত হয়ে আসছিল, তবে গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্টেশন প্রক্রিয়াগুলো আংশিকভাবে হাতে-কলমে পরিচালিত হতো। এর আগে কেবল ইলেকট্রনিক ডেলিভারি অর্ডার আবেদন এবং জেনারেশন অনলাইনে করা যেত, বাকি নথিপত্রগুলো শারীরিকভাবে জমা দিতে হতো। নতুন এই আপগ্রেডেশনের ফলে কার্গো ডেলিভারির পুরো ডকুমেন্টেশন প্রক্রিয়া এখন একক ডিজিটাল টিওএস ইকোসিস্টেমের আওতায় চলে এসেছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই নতুন প্ল্যাটফর্মে একটি সুশৃঙ্খল 'সিকোয়েন্সিয়াল ওয়ার্কফ্লো' বা পর্যায়ক্রমিক কাজের ধারা প্রবর্তন করা হয়েছে, যা ব্যবহারকারীদের কোনো ধাপ এড়িয়ে যেতে দেবে না। আমদানিকারক এবং সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের প্রতিটি পর্যায় সফলভাবে সম্পন্ন ও যাচাই করতে হবে, যার পর সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরবর্তী ধাপের অনুমতি দেবে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সাথে সমন্বয় ও কমপ্লায়েন্স শক্তিশালী করতে এই টিওএস সিস্টেমটিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) 'অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড' সিস্টেমের সাথে রিয়েল-টাইমে যুক্ত করা হয়েছে। এই ইন্টিগ্রেশনের ফলে শুল্ক কর্তৃপক্ষ যদি কোনো কন্টেইনারকে যেকোনো পর্যায়ে 'হোল্ড' বা ব্লক করে দেয়, তবে সেই নির্দেশনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্দরের টিওএস সিস্টেমে চলে আসবে। যতক্ষণ না কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স পাওয়া যাবে, ততক্ষণ সিস্টেমটি ওই কন্টেইনারের পরবর্তী সকল প্রসেসিং স্থগিত রাখবে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (সিপিএ) মতে, এই অটোমেশনের ফলে বন্দরের অপারেশনাল দক্ষতা বাড়বে, প্রক্রিয়াকরণের সময় কমবে এবং দেশের সামুদ্রিক বাণিজ্য ইকোসিস্টেমে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে। নথিপত্র শারীরিকভাবে জমা দেওয়া এবং এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে ঘোরার প্রয়োজনীয়তা দূর হওয়ায় সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, আমদানিকারক এবং অন্যান্য বন্দর ব্যবহারকারীদের মূল্যবান সময় বাঁচবে। একই সাথে কাগজ ও প্রিন্টিং খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
কর্তৃপক্ষ আরও জানায়, প্রতিটি ধাপের ডিজিটাল ভেরিফিকেশন বা যাচাইকরণ ব্যবস্থা নথিপত্র জালিয়াতি, জালিয়াতিপূর্ণ কাগজপত্র এবং প্রশাসনিক অনিয়ম রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ব্যবহারকারীরা যেকোনো স্থান থেকে তাদের অ্যাকাউন্টে লগ-ইন করে রিয়েল-টাইমে কার্গো খালাসের অগ্রগতির তথ্য জানতে পারবেন।
সিপিএ এই রূপান্তরকে একটি 'মাইলফলক' হিসেবে বর্ণনা করেছে, যা চট্টগ্রাম বন্দরকে একটি পূর্ণাঙ্গ 'পেপারলেস' পোর্টে পরিণত করতে এবং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি আধুনিক, স্বচ্ছ ও দক্ষ গেটওয়ে হিসেবে এর অবস্থানকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে।
চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, যা দেশের সমুদ্রপথের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ পরিচালনা করে। এই বন্দর নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল, চিটাগাং কন্টেইনার টার্মিনাল, জেনারেল কার্গো বার্থ এবং পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল-সহ বেশ কয়েকটি টার্মিনাল পরিচালনা করে থাকে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যের চাপ সামাল দিতে এবং দক্ষতা বাড়াতে বন্দর কর্তৃপক্ষ ডিজিটালাইজেশন ও অটোমেশনে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বন্দরটি তার ইতিহাসের সর্বোচ্চ পারফরম্যান্স রেকর্ড করেছে, যেখানে ৩.৫২ মিলিয়ন টিইউএস কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করা হয়েছে। এছাড়া কার্গো হ্যান্ডলিং, জাহাজ আগমন এবং রাজস্ব আদায়েও রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেমের এই সর্বশেষ সংস্কার মূলত চট্টগ্রাম বন্দরকে একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক বন্দরে রূপান্তর করার কৌশলগত পরিকল্পনারই অংশ।
সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড