শিরোনাম
◈ ‘ভারত যা চাইবে তাই পাবে’: মোদিকে নিয়ে ট্রাম্পের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা ◈ কারখানা প্রস্তুত, নেই গ্যাস: ঋণের চাপে দিশেহারা শিল্প উদ্যোক্তারা, থমকে গেছে হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ ◈ পুঁজিবাজারে নতুন বড় কোম্পানি: বিআরবি ক্যাবলের আইপিওর প্রস্তুতি শুরু ◈ বাংলাদেশে ধর্ষণ ও হত্যার আলোচিত ছয়টি মামলা কী অবস্থায় আছে?  ◈ কোরবানির পরবর্তী সাতদিন ঢাকার বাইরে থেকে চামড়া ঢাকায় প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকবে ◈ ট্রাম্পের 'পাগলামি' ও বিশ্বরাজনীতিতে আমেরিকার একাকীত্ব  ◈ কুয়েতে ২৪০ টন খাদ্য সহায়তা দিচ্ছে বাংলাদেশ ◈ চিনিযুক্ত পণ্যে কর কমানোর ভাবনা, স্বয়ংক্রিয় ট্যাক্স রিফান্ড চালুর পরিকল্পনা এনবিআরের ◈ ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে রডবোঝাই ট্রাক খাদে উল্টে নিহত ১৫ ◈ ঈদে জাতীয় ঈদগাহে থাকছেন তারেক রহমান, নিজ নিজ এলাকায় নামাজ পড়বেন মন্ত্রীরা

প্রকাশিত : ২৫ মে, ২০২৬, ০১:১২ দুপুর
আপডেট : ২৫ মে, ২০২৬, ০১:৫৩ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

কারখানা প্রস্তুত, নেই গ্যাস: ঋণের চাপে দিশেহারা শিল্প উদ্যোক্তারা, থমকে গেছে হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ

টিবিএস রিপোর্ট: প্রায় ছয় বছর আগে মুন্সীগঞ্জে হোসেন্দী ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠা করে সিটি গ্রুপ। প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে সেখানে ছয়টি বড় শিল্প ইউনিট নির্মাণে করে। কিন্তু গ্যাস সংযোগ না থাকায় কারখানাগুলো এখনও উৎপাদনে যেতে পারেনি।

এই অর্থনৈতিক অঞ্চল থেকে এখনও কোনো রিটার্ন আসতে শুরু করেনি। তবে এই বিপুল বিনিয়োগের জন্য ব্যাংক থেকে নেওয়া বিশাল অঙ্কের ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধ এরইমধ্যে শুরু করতে হয়েছে কোম্পানিটিকে।

দেশের বেসরকারি খাত নতুন নতুন কারখানায় হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে স্টিল প্ল্যান্ট, তৈরি পোশাক কারখানা, সিমেন্ট কারখানা ও সিড ক্রাশিং (বীজ মাড়াই) প্ল্যান্ট। এসব কারখানা উৎপাদন, কর্মসংস্থান তৈরি ও চাহিদা মেটাতে প্রস্তুত। কিন্তু গ্যাস সংযোগের অপেক্ষায় বেশিরভাগ কারখনাই এখন অলস পড়ে আছে।

টিবিএসের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্পাঞ্চলে বেসরকারি খাতের অন্তত ৩৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ অলস পড়ে আছে। তবে প্রকৃত অঙ্ক নিশ্চিতভাবেই এর চেয়ে অনেক বেশি। কারণ, জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, গ্যাস সংযোগের জন্য আরও ১ হাজার ৮০০টি আবেদন পড়ে আছে। এসব আবেদনের প্রতিটির পেছনে ঠিক কত টাকার বিনিয়োগ রয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনও করা হয়নি।

টিবিএস এ পর্যন্ত যেসব বিনিয়োগের তথ্য নিশ্চিত হয়েছে, তা এই সংকটের বাস্তব চিত্রই তুলে ধরে। আব্দুল মোনেম ইকোনমিক জোনে ৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে আবদুল মোনেম গ্রুপ। মেঘনা গ্রুপ তাদের মেঘনা ইকোনমিক জোনে ৬ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে; কুমিল্লা ইকোনমিক জোনে আরও ১০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ কাজে লাগানোর অপেক্ষায় রয়েছে।

বসুন্ধরা গ্রুপ একটি সিড ক্রাশিং প্ল্যান্টে ১ হাজার ২৩ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। অন্যদিকে নিটল নিলয় গ্রুপ কিশোরগঞ্জ ইকোনমিক জোনে ৬০০ কোটি টাকা এবং বে গ্রুপ তাদের বে ইকোনমিক জোনে ৪০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। এই তালিকা ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে।

এগুলো কোনো ধারণানির্ভর বা অর্ধ-নির্মিত প্রকল্প নয়। বেশিরভাগের নির্মাণকাজই পুরোপুরি বা প্রায় শেষ। মালিকরা ইতোমধ্যেই ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন, কর্মী নিয়োগ দিয়েছেন কিংবা নিয়োগের পরিকল্পনা করেছেন। কিন্তু এখন কোনো আয় ছাড়াই এই অলস সম্পদের বিপরীতে তাদের নিয়মিত নির্দিষ্ট খরচ বহন করতে হচ্ছে।

অন্যদিকে যেসব ব্যাংক এই বিপুল কর্মযজ্ঞে অর্থায়ন করেছে, তারা এমন সব প্রকল্পের ঋণের টাকা আদায় করছে, যেগুলো থেকে ঋণ পরিশোধের জন্য প্রয়োজনীয় নগদ অর্থ প্রবাহ এখনও তৈরিই হয়নি।

বিনিয়োগ নিয়ে বিপাকে সিটি গ্রুপ

সিটি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ হাসান বলেন, তাদের অর্থনৈতিক অঞ্চলের ছয়টি শিল্প ইউনিট এখনও গ্যাস সংযোগ পায়নি। ফলে পুরো বিনিয়োগই অনুৎপাদনশীল হয়ে পড়েছে।

তিনি আরও বলেন, গ্যাসের চাপ কম থাকায় তাদের বিদ্যমান কারখানাগুলোতেও উৎপাদন কমে গেছে। পাশাপাশি ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে তাদের বিপুল ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে।

হাসান জানান, তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ হোসেন্দী ইকোনমিক জোনের জন্য গ্যাস সংযোগ অনুমোদন করেছিল। সেই অনুযায়ী ২০১৮ ও ২০২১ সালে জামানত হিসেবে ১৫০ কোটি টাকা জমাও দেওয়া হয়েছিল।

বেশ কয়েকটি ব্যাংক জানিয়েছে, চালু ব্যবসা থেকে আসা নগদ অর্থ প্রবাহ এখন অর্থনৈতিক অঞ্চলটির ঋণ ও দায় পরিশোধে চলে যাচ্ছে। ফলে সিটি গ্রুপ তাদের চলতি মূলধন নিয়ে চাপে পড়েছে। ঋণের এই চাপ কমানোর জন্য সিটি গ্রুপ তাদের কিছু ব্যবসার জন্য দেশি-বিদেশি ক্রেতা খুঁজছে।

স্বাধীনতার পরপর প্রতিষ্ঠিত সিটি গ্রুপ দেশের অন্যতম বৃহৎ ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী শিল্পগোষ্ঠী। গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে ঋণের ক্ষেত্রে তারা পরিচ্ছন্ন রেকর্ড বজায় রেখেছে।

এই সময়ে গ্রুপটি ভোজ্য তেল ও চিনি পরিশোধন, চাল-ডাল, আটা-ময়দা, প্রক্রিয়াজাত খাবার, পোলট্রি খাদ্য, জাহাজ নির্মাণ, চা বাগান, ব্যাংক ও বিমা, হাসপাতালসহ বিভিন্ন খাতে অন্তত ৪০টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে।

দেশের বাজারের প্রায় ৩৫ শতাংশ ভোজ্যতেল, ৪০ শতাংশ চিনি ও ২৫ শতাংশ আটা সরবরাহ করে সিটি গ্রুপ। বাজার প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা বার্ষিক টার্নওভারের সিটি গ্রুপ সরাসরি প্রায় ২৫ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে, পরোক্ষাভাবে যা ১০ লাখের বেশি।

বারবার চেয়েও গ্যাস পায়নি মেঘনা

প্রথম বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলের লাইসেন্স পায় মেঘনা গ্রুপ। নারায়ণগঞ্জে ২৪৫ একর জমির ওপর ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত মেঘনা অর্থনৈতিক অঞ্চলে এখন পর্যন্ত প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ হয়েছে।

মেঘনা গ্রুপের ৫টিসহ দেশ-বিদেশের অন্তত ১০টি কোম্পানি বিনিয়োগ করেছে এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে। তবে গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এখানে। আটকে আছে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ। আর উৎপাদনের অপেক্ষায়ও রয়েছে বেশ কয়েকটি কোম্পানি।

কুমিল্লায় ২০২২ সালে তৃতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণের কাজ শেষ করে মেঘনা গ্রুপ। ৩৫০ একর জমিতে স্থাপিত এই জোনে এরইমধ্যে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে গ্রুপটি। এটি পুরোপুরি চালু হলে ২৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রাক্কলন করেছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)। 

গ্যাস পেতে ২০২২ সাল থেকে একাধিক সংস্থার দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে মেঘনা গ্রুপ। বেশ কয়েকবার আন্তঃমন্ত্রণালয় সভাও হয়। তবে কাজ হয়নি কোনো কিছুতেই। গত বছর এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনও করেছে গ্রুপটি।

সম্প্রতি বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থার (বিডা) এক মতবিনিময় সভায় মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল বলেন, তারা একটি ইস্পাত কারখানায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার, আর একটি কাচ ও পেপার বোর্ড কারখানায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছেন। 

তিনি বলেন, এসব কারখানা রক্ষণাবেক্ষণে ২০২২ সাল থেকে বছরে প্রায় ৮০ কোটি টাকা খরচ হয়। গ্যাস সংযোগ প্রক্রিয়া দ্রুত করতে গ্রিড নেটওয়ার্ক উন্নয়নে ১০০ কোটি ও জিটিসিএলের পাইপলাইন অবকাঠামো উন্নয়নে আরও ১০০ কোটি টাকা দিয়েছে গ্রুপটি। 

কোনো কিছুতেই কাজ হচ্ছে না জানিয়ে মোস্তফা কামাল বলেন, কবে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হবে, সে বিষয়ে বেজা কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি।

মোনেমের ৫ হাজার কোটি টাকার বোঝা

ঢাকা থেকে ৩৭ কিলোমিটার দূরে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চলের অনুমোদন নিয়ে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে আব্দুল মোনেম গ্রুপ। 

দেশের দ্বিতীয় বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসাবে একে মোটর যন্ত্রাংশ সংযোজন, খাদ্য ও পানীয় উৎপাদন এবং হালকা প্রকৌশল, প্যাকেজিং ও রাসায়নিক দ্রব্য উৎপাদনের জন্য ২০১৭ সালে অনুমোদন দেয় বেজা।

তবে গ্যাস সংকটের কারণে এখন পর্যন্ত হোন্ডা প্রাইভেট লিমিটেড ছাড়া আর কোনো প্রতিষ্ঠান উৎপাদনে যেতে পারেনি এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে। বিপুল বিনিয়োগ করে এটি এখন আব্দুল মোনেমের জন্য গলার কাঁটা। 

আর্থিক সংকট মেটাতে এরইমধ্যে গ্রুপটি তাদের সুগার মিল অন্য একটি গ্রুপের কাছে বিক্রি করে টিকে থাকার চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছেন এর কর্মকর্তারা।

আব্দুল মোনেম গ্রুপের একজন কর্মকর্তা বলেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলে অনেক দেশি-বিদেশি কোম্পানির বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি ছিল। গ্রুপটির নিজেদের কিছু কারখানা ছিল। তবে গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় সব আটকে গেছে।

বিনিয়োগ আটকে গেছে নিটল নিলয় ও টাটার

হাওর অঞ্চলে দেশের প্রথম অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসাবে ২০২২ সালে কিশোরগঞ্জ ইকোনমিক জোন চালু করে নিটল নিলয় গ্রুপ। টাটা গ্রুপ তাদের পিকআপ উৎপাদনে ৬০০ কোটি টাকা ও নিটল নিলয় গ্রুপ গাড়ির টায়ার ও পার্টস উৎপাদনে ৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে।

তবে এখানে গ্যাস সংকটে গলার কাঁটা হয়ে গেছে এই বিনিয়োগ। এখনো আলোর মুখ দেখেনি এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের কারখানা। তবে অর্থ আটকে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছে গ্রুপটি।

আমান ও বে গ্রুপ

বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ করে বিপাকে পড়েছে আমান গ্রুপ আর বে গ্রুপও। আমান গ্রুপ ২০১৭ সালে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে আমান ইকোনমিক জোনে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। সিমেন্ট, প্যাকেজিং, বেভারেজ, পোলট্রি ফিডসহ নানা ধরনের কারখানা স্থাপন করা হয়েছে এখানে। কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে চলছে না অধিকাংশ কারখানা।

অন্যদিকে ৩ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আনার লক্ষ্য নিয়ে গাজীপুরে একটি বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলের অনুমতি নিলেও আলোর মুখ দেখেনি বে ইকোনমিক জোন।

২০২২ সাল থেকে গ্যাসের অপেক্ষায় বসুন্ধরা, টিকে

২০২২ সালে নারায়ণগঞ্জে দৈনিক ৫ হাজার টন উৎপাদন ক্ষমতার সয়াবিন ও ২ হাজার ৫০০ টন উৎপাদন ক্ষমতার সিড ক্রাশিং প্ল্যান্ট স্থাপন করছে বসুন্ধরা গ্রুপ। 

রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ও জনতা ব্যাংকের সহায়তায় এতে ১ হাজার ২৩ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে গ্রুপটি। তবে বারবার আবেদন করেও গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় এখনো উৎপাদনে যেতে পারেনি। ফলে বিনিয়োগ করে ঋণের টাকা তুলতে পারছে না ব্যাংকগুলোও।

একজন কর্মকর্তা বলেন, ২০২২ সাল থেকে পেট্রোবাংলা, তিতাসসহ একাধিক সংস্থার কাছে তারা বহুবার আবেদন নিয়ে গেছেন, আঃন্তমন্ত্রণালয়ের সভায় যোগ দিয়েছেন। তবে গ্যাস সংকটের কারণে সরকার সংযোগ দিতে পারেনি।

বসুন্ধরার মতোই ২০২২ সালে চট্টগ্রামে স্টিল মিলের কাজ শেষ করে গ্যাস সংযোগের জন্য ঘুরছে টিকে গ্রুপ। গ্রুপটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা হায়দার বলেন, স্টিল শিল্পের মূল কাঁচামালই গ্যাস। সংযোগ না পাওয়ায় বিনিয়োগ বসে আছে। 

হায়দার আরও বলেন, ২০২৪ সালে সরকারের কাছ থেকে একটি পাটকল ইজারা নিয়ে পুনরায় চালু করেছেন। সেখানেও গ্যাস সংযোগ পাননি। কেমিক্যালসহ আরো কয়েকটি খাতে গ্যাস সংযোগের আবেদন করে বিনিয়োগ অপেক্ষমাণ রয়েছে। সংযোগ পেলে কাজ শুরু হবে।

তিনি বলেন, গ্যাস সংযোগের জন্য আবেদন করে রাখা এসব কারখানায় বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে অপেক্ষা করছেন উদ্যোক্তারা। কারখানা বসিয়ে রেখে ব্যাংকের সুদ ও আসল পরিশোধে নগদ প্রবাহ সংকটে ভুগছেন বিনিয়োগকারীরা। 

সরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলেও গ্যাস সংকট 

সরকার ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করে ২০১১ সালে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো অঞ্চলকেই পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবে রূপ দিতে পারেনি গ্যাস সংযোগের কারণে। কয়েকটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে অবকাঠামো শেষ হলেও মাত্র তিনটি অঞ্চলে আংশিক গ্যাস সংযোগ দিতে পেরেছে। 

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার সময় বলেছিলেন, ইউটিলিটি সীমাবদ্ধতার কারণে সরকার মাত্র দশটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে মনোযোগ দেবে। তবে ওই দশটি অঞ্চলে এখনও তীব্র গ্যাস সংকট রয়ে গেছে।

প্রায় ৩৫ হাজার একর জমিতে চট্টগ্রামে দেশের সর্ববৃহৎ মিরসরাই ইকোনমিক জোন স্থাপন করেছে সরকার। ১৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়ে ২০১২ সালে এ অর্থনৈটিক অঞ্চলের কাজ শুরু হলেও গ্যাস ও পানি সংকটে প্রকৃত বিনিয়োগ যৎসামান্য। 

বেজা সূত্রে জানা গেছে, মিরসরাইয়ে জমি বরাদ্দের জন্য ২০১৭ সালের এপ্রিলে আবেদন নেওয়া শুরু হয়। এতে ৫৩৯টি প্লট তৈরি করে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ কর্তৃপক্ষ (বেপজা)। সর্বশেষ ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪১টি প্রতিষ্ঠানকে কেবল ২৪৪টি প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র তিনটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন শুরু করেছে। আর উৎপাদনের অপেক্ষায় রযেছে তিন প্রতিষ্ঠান। 

মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে আংশিক গ্যাস সংযোগ দিতে পেরেছে বেজা। একইভাবে আংশিক গ্যাস সংযোগ পেয়েছে জাপানিজ ইকোনমিক জোন ও ইস্ট ওয়েস্ট ইকোনমিক জোন। 

১৬৩ একর জমিতে জামালপুর অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাজ শেষ হয়েছে ২০২১ সালে। ১৬ জন উদ্যোক্তা ১.৭৫৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব করেছেন এখানে। বিনিয়োগ এসেছে ২১৬ মিলিয়ন ডলার। তবে গ্যাস সংযোগ না থাকায় বিপাকে পড়েছেন উদ্যোক্তারা। 

জামালপুরের মতোই অবকাঠামো শেষ হলেও গ্যাস সংযোগ নেই সিরাজগঞ্জ ইকোনমিক জোন, সাবরাং ট্যুরিজম পার্কসহ আরও কয়েকটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে। 

'জ্বালানি খাতে শৃঙ্খলা আনতে সময় লাগবে'

জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গ্যাস সংযোগ পাওয়ার জন্য এ বছরের এপ্রিল পর্যন্ত গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর কাছে জমা আছে ১ হাজার ৮০০টি আবেদনপত্র। এর মধ্যে ডিমান্ড নোটের টাকা জমা দিয়ে গ্যাস সংযোগের জন্য ৪-৫ বছর ধরে অপেক্ষায় রয়েছে ৫৫০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এই প্রতিটি কোম্পানিকে কয়েক কোটি টাকা করে ডিমান্ড নোটের টাকা জমা দিতে হয়েছে। 

ব্যবসায়ীরা বলছেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ করলেই গ্যাসসহ নিরবচ্ছিন্ন ইউলিটি সংযোগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো তৎকালীন সরকার।

বৃহস্পতিবার রাজধানীতে এক গোলটেবিল বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো স্থাপনের পরিকল্পনার শুরুতেই সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজটি যথাযথভাবে হয়নি। এতগুলো অর্থনৈতিক অঞ্চল একসঙ্গে দরকার ছিল না। 

তিনি বলেন, এখন সরকারের অগ্রাধিকার হচ্ছে ব্যবসাকে সহজ করা। গ্যাস-বিদ্যুৎসহ ইউটিলিটি সমস্যা সমাধানে কার্যকরী উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এদিকে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শিল্পে গ্যাস সংযোগের ব্যাপারে নিয়মনীতি মানা হয়নি। এখন জ্বালানি খাতে শৃঙ্খলা আনতে সময় লাগবে। সরকার ক্ষমতায় আসার পর শিল্পে গ্যাস সংযোগ নিয়ে জ্বালানি বিভাগে বৈঠক হয়েছে। আরও বৈঠক করতে হবে।

পেট্রোবাংলার প্রাক্কলন অনুসারে, দেশে এখন দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩.৮ বিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে সরকার গ্যাস সরবরাহ দিচ্ছে ২.৬ থেকে ২.৭ বিলিয়ন ঘনফুট। এ কারণে অনেক এলাকার শিল্পকলকারখানা চাহিদামতো গ্যাস পাচ্ছে না। এমনকি বিদ্যুৎ ও সার কারখানাও বন্ধ রাখা হচ্ছে। 

কেন কেবল গ্যাস? এর কি সহজ কোনো বিকল্প নেই?

বাংলাদেশের শিল্প খাতের গ্যাসের ওপর এই নির্ভরশীলতার কারণ কয়েক দশকের উন্নয়ন। সরাসরি কারখানাগুলোতে সরবরাহ করা সম্ভব—এমন একটি মাত্র স্বল্পমূল্যের ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানির ওপর ভিত্তি করেই এই উন্নয়ন অর্জিত হয়েছে।

শিল্পে গ্যাস মূলত দুটি প্রধান কাজে ব্যবহৃত হয়: তাপ উৎপাদন ও বিদ্যুৎ উৎপাদন। টেক্সটাইল, সিমেন্ট, সিরামিক, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সিড ক্রাশিং শিল্পে কম খরচে দীর্ঘক্ষণ উচ্চ তাপমাত্রা ধরে রাখার জন্য গ্যাসচালিত বয়লারের ওপর নির্ভর করতে হয়।

এছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও গ্যাস একটি প্রধান ভিত্তি। জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের সরবরাহ নির্ভরযোগ্য না হওয়ায় নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন নিশ্চিত করতে কারখানা মালিকরা নিজস্ব গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র, অর্থাৎ ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে বিনিয়োগ করতে বাধ্য হয়েছেন।

বয়লার ও জেনারেটর চালানোর জন্য গ্যাসের বিকল্প হিসেবে ডিজেল ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু এতে খরচ দুই-তিন গুণ বেশি হয়। ফলে টেক্সটাইল ও সিমেন্টের মতো জ্বালানিনির্ভর খাতগুলোতে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যায়।

স্পিনিং খাতের পরামর্শক আবুল কালাম আজাদ বলেন, 'গ্যাসের দাম বাড়ার পরও ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদন তুলনামূলকভাবে এখনও সস্তা।'

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়