ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসছে নবম জাতীয় পে-স্কেল। ধাপে ধাপে শতভাগ বেতন সমন্বয়ের পাশাপাশি পেনশনভোগীদের জন্যও বড় সুখবর দিতে যাচ্ছে সরকার। আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেলের প্রথম ধাপ কার্যকরের প্রস্তুতি চলছে, যেখানে মূল বেতনে যুক্ত হবে অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ। একই সঙ্গে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মচারীদের বেশি সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনার পাশাপাশি পেনশন বৃদ্ধির হারও হতে পারে নজিরবিহীন।
আসন্ন বাজেটে ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ রাখা হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন পুনর্গঠিত কমিটি বৃহস্পতিবার এ সংক্রান্ত সুপারিশ চূড়ান্ত করতে যাচ্ছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
অর্থ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, পুনর্গঠিত কমিটির বৈঠকে সুপারিশ চূড়ান্ত হওয়ার পর তা দ্রুত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হবে। প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন দিলে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। এরপরই নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে। নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নে পুনর্গঠিত কমিটি ইতোমধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও আর্থিক সংশ্লিষ্ট সংস্থার মতামত পর্যালোচনা করেছে। কমিটির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, দেশের বর্তমান মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক সক্ষমতা এবং সরকারের রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের কৌশল নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দিন অর্থাৎ আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন কাঠামোর প্রথম ধাপ কার্যকর হবে। এ ধাপে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের বিদ্যমান মূল বেতনের ওপর অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ সমন্বিত বেতন পাবেন। দ্বিতীয় ধাপে, অর্থাৎ পরবর্তী অর্থবছরে আবারও মূল বেতনের ওপর সমপরিমাণ সমন্বয় যুক্ত হবে। তবে এই সময় পূর্বের ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা আগের মতো বহাল থাকবে। দুই বছরের মধ্যে মূল বেতনের পূর্ণ সমন্বয় সম্পন্ন হবে। তবে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত, বিশেষ প্রণোদনা, ঝুঁকি ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা একযোগে কার্যকর করা হচ্ছে না।
কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, এসব ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা তৃতীয় বছর অর্থাৎ ২০২৮-২৯ অর্থবছরে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করা হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, একবারে সব সুবিধা চালু করলে সরকারের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে। তাই রাজস্ব পরিস্থিতি ও বাজেট সক্ষমতা বিবেচনায় ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পথ বেছে নেওয়া হয়েছে।
সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য কয়েক ধাপে বেতন বৃদ্ধির কৌশলটি ঠিকই আছে। গত কয়েক বছর যেভাবে দেশে মূল্যস্ফীতি হয়েছে সেভাবে তাদের ইনক্রিমেন্ট হয়নি। ফলে নিত্যপণ্য কিনতে তাদের বেশি অর্থ খরচ করতে হয়েছে। আবার অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিচেনায় নিলে অর্থনীতিতে চাপ ও চ্যালেঞ্জ আছে। এ অবস্থায় একবারে বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করার মতো সামর্থ্য সরকারের নেই।
পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিলে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা যৌক্তিক। তবে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে তিন ধাপে বাস্তবায়নের বিষয়টি কৌশলী সিদ্ধান্ত হয়েছে।
জানা গেছে, নবম পে-স্কেলের আওতায় শুধু প্রশাসন ক্যাডার নয়, শিক্ষক, পুলিশ, স্বাস্থ্যকর্মী, মাঠ প্রশাসন, বিচার বিভাগীয় কর্মচারীসহ সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। পাশাপাশি স্বায়ত্তশাসিত ও আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ক্ষেত্রেও সমন্বিত নির্দেশনা থাকতে পারে। যদিও এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সুপারিশ অনুমোদনের পর জানা যাবে।
কমিটির দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, নতুন পে-স্কেলে নিম্ন ও মধ্যম স্তরের কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি রাখার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। কারণ মূল্যস্ফীতির চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ছে নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের ওপর। একই সঙ্গে বিভিন্ন গ্রেডের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য কিছুটা কমিয়ে আনারও সুপারিশ থাকতে পারে।
সাবেক সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন বেতন কমিশন পেনশনভোগীদের পেনশনের হারও শতভাগের বেশি বৃদ্ধির সুপারিশ করেছিল। এতে বলা হয়েছে, মাসে ২০ হাজার টাকার কম পান, এমন পেনশনভোগীদের পেনশন ১০০ শতাংশের মতো বৃদ্ধি হতে পারে। তবে যারা মাসে ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পেনশন পান, তাদের পেনশন ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। আর যারা মাসে ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশন পান, তাদের পেনশন বাড়তে পারে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত। আগামী অর্থবছরে তাদের জন্য কতটুকু দেওয়া যায়, তা চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। উৎস: যুগান্তর।