শিরোনাম
◈ যৌন হয়রানির অপরা‌ধে ৫ বছর নিষিদ্ধ গায়ানা ফুটবল কর্মকর্তা ইয়ান আলভেস ◈ সীমান্তে ভারতীয় ড্রোন পড়ে আতঙ্ক, বিজিবির হেফাজতে উদ্ধার করা হয়েছে ◈ টি-টোয়েন্টি র‍্যাংকিংয়ে আটে বাংলাদেশ ◈ চীনের নেতৃত্বাধীন বাণিজ্যিক জোট আরসেপে যোগ দিতে প্রস্তুত বাংলাদেশ ◈ সরকারি ব্যয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ৩৮ অডিট রিপোর্ট প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর ◈ দেশের ইতিহাসে এত চমৎকার নির্বাচন আগে কখনো হয়নি: সেনাপ্রধান ◈ এক বছরের মধ্যেই সব ধাপের স্থানীয় সরকার নির্বাচন: মির্জা ফখরুল ◈ শাপলা চত্বর মামলা: ৫৮ জন নিহত, প্রধান আসামি শেখ হাসিনা ◈ হরমুজে আটকে থাকা জাহাজের সংখ্যা প্রায় ২০০০! ◈ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া: বাণিজ্যমন্ত্রী (ভিডিও)

প্রকাশিত : ০৫ মে, ২০২৬, ০৬:৩৪ বিকাল
আপডেট : ০৫ মে, ২০২৬, ১০:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

১০ হাজার কো‌টি টাকা খেলাপি ঋণ রেখে বি‌শ্বের বি‌ভিন্ন দে‌শে মারা যাচ্ছেন সিকদার পরিবারের সদস্যরা 

ডেস্ক রি‌পোর্ট : মাত্র পাঁচ বছর আগেও দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী একটি নাম ছিল ‘সিকদার পরিবার’। এ পরিবারের কর্তা ও সিকদার গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা জয়নুল হক সিকদারের প্রভাব ছিল ক্ষমতার অন্দরমহলেও। কিন্তু অল্প সময়ের ব্যবধানে পরিবারটির ক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব ভেঙে পড়েছে। দেশের বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ রেখে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সিকদার পরিবারের সদস্যরা মৃত্যুবরণ করছেন।

সিকদার পরিবারের পতনের শুরু ২০২১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের একটি হাসপাতালে মারা যান জয়নুল হক সিকদার। কভিডে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন। তার মৃত্যুর পর সন্তানদের বিবাদ ঠেকাতে গ্রুপটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিয়েছিলেন স্ত্রী মনোয়ারা সিকদার। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি হাসপাতালে তিনি মারা যান। মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে গতকাল আরব আমিরাতের দুবাইয়ের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন এ দম্পতির সন্তান ও সিকদার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রন হক সিকদার। দেশটির একটি হাসপাতালে বর্তমানে রনের ভাই রিক হক সিকদারও চিকিৎসাধীন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

হাজার হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণের চাপ, অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একাধিক মামলা ও পাওনাদারদের তোপের মুখে থাকা সিকদার পরিবারের কোনো সদস্যই এখন আর দেশে নেই। তাদের ব্যবহৃত ফোন নাম্বারগুলোও বন্ধ। গতকাল রন হক সিকদারের মৃত্যুর ঘটনাটি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানোর জন্য এ পরিবারের কোনো সদস্যকে পাওয়া যায়নি। সিকদার গ্রুপের অফিসে ফোন দিয়েও কারো সাড়া মেলেনি।

এ বিষয়ে ন্যাশনাল ব্যাংকের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা সোমবার বলেন, দুবাই থেকে ফোন করে রন হক সিকদারের মৃত্যুর বিষয়টি আমাদের ব্যাংকের কয়েকজনকে জানানো হয়েছে। আর ফেব্রুয়ারিতে মনোয়ারা সিকদার যুক্তরাষ্ট্রে মারা গেলেও আমরা বেশ কিছুদিন পরে সেই খবর শুনেছি। মৃত্যুর প্রায় দেড় মাস পর মনোয়ারা সিকদারের লাশ দেশে এনে অনেকটা নীরবে-নিভৃতে দাফন করা হয়েছে। এ পরিবারের কোনো সদস্যই এখন আর দেশে নেই। বিদেশেও তারা ছন্নছাড়া জীবনযাপন করছেন।’

দেশের ব্যাংকসহ আর্থিক খাতে সিকদার পরিবারের উত্থান ঘটে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার (ক্ষমতাচ্যুত) ক্ষমতায় আসার পর। কথিত আছে, প্রয়াত জয়নুল হক সিকদারকে অভিভাবকতুল্য বিবেচনা করতেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাজনৈতিক এ প্রভাবকে ব্যবহার করে বেসরকারি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসিতে একক কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে সিকদার পরিবার। ২০০৯ সাল-পরবর্তী সময় থেকে মৃত্যুর দিন পর্যন্ত ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ছিলেন জয়নুল হক সিকদার। ওই সময়ে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে, নাতিসহ অন্তত ছয়জনকে সদস্য করেছিলেন। এক পরিবারের হাতে নিয়ন্ত্রিত হওয়া ন্যাশনাল ব্যাংকে অনিয়ম-দুর্নীতি ও কমিশনের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে দেশের প্রথম প্রজন্মের এ ব্যাংকের আর্থিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। গত বছর ন্যাশনাল ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৭৬ শতাংশে গিয়ে ঠেকে। ২০২৪ সাল শেষে ব্যাংকটির ক্রমপুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪ হাজার ৩২৯ কোটি টাকায়। ২০২৫ সালেও ব্যাংকটি প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার নিট লোকসান দিয়েছে। সিকদার পরিবারের লুণ্ঠনের শিকার এ ব্যাংকটি গ্রাহকদের আমানতের অর্থও ফেরত দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে তারল্য সহায়তা নিয়ে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে ব্যাংকটি।

জয়নুল হক সিকদার মারা যাওয়ার পর ২০২১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ‘সিকদার গ্রুপের ঋণ ৬ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা’ শিরোনামে বণিক বার্তায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের সূত্রে বলা হয়, ২০২১ সালের জানুয়ারিতে সিকদার গ্রুপের ১৪টি কোম্পানির ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা। আর সিকদার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রন হক সিকদারের নামে ছিল ৬৮১ কোটি টাকার ঋণ। ১৯৩ কোটি টাকা ঋণ ছিল রিক হক সিকদারের। সব মিলিয়ে গ্রুপটির ঋণের পরিমাণ ছিল তখন ৬ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। এ ঋণের মধ্যে ৫ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকাই ফান্ডেড বা মেয়াদি ঋণ। বাকি ৪৯৫ কোটি টাকা নন-ফান্ডেড।

সিকদার পরিবারের বিভিন্ন কোম্পানির মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঋণ ছিল বিদ্যুৎ খাতে। এর মধ্যে পাওয়ার প্যাক মতিয়ারা কেরানীগঞ্জ পাওয়ার প্লান্ট লিমিটেডের নামে ঋণ ছিল ১ হাজার ৬৭১ কোটি টাকা। মাল্টিপ্লেক্স হোল্ডিংস লিমিটেডের নামে ২১০ কোটি, পাওয়ার প্যাকের নামে ১২ কোটি, পাওয়ার প্যাক হোল্ডিংস লিমিটেডের নামে ৪৫ কোটি, পাওয়ার প্যাক মতিয়ারা খুলনা পাওয়ার প্লান্ট লিমিটেডের নামে ২৭ কোটি টাকা ঋণ ছিল। তবে সিকদার গ্রুপের সবচেয়ে বেশি ঋণ রয়েছে পাওয়ার প্যাক মতিয়ারা জামালপুর পাওয়ার প্লান্ট লিমিটেডের নামে। এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য বিভিন্ন ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ২২১ কোটি টাকা।

এছাড়া সিকদার গ্রুপের প্রতিষ্ঠান আর অ্যান্ড আর এভিয়েশন লিমিটেডের নামে ৪৬ কোটি, সিকদার রিয়েল এস্টেট লিমিটেডের নামে ৬৯৫ কোটি, জেড এইচ সিকদার উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হসপিটালের নামে ৮ কোটি, জয়নুল হক সিকদার উইমেন্স মেডিকেল কলেজের নামে ২ কোটি ও বিইএল কনস্ট্রাকশন এসডিএন বিএইচডি লিমিটেডের নামে ৫৬৯ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে।

সিকদার গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেয়া ব্যাংকগুলোর মধ্যে আছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, এবি ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক এবং সরকারি জনতা ও অগ্রণী ব্যাংক। এসব ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জয়নুল হক সিকদারের মৃত্যুর পর সিকদার গ্রুপের কোনো প্রতিষ্ঠানই আর ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করেনি। এতে অনাদায়ী সুদ যুক্ত হয়ে গ্রুপটির ঋণের পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকায় ঠেকেছে। এ ঋণের পুরোটাই এখন খেলাপি। এর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংকের বেনামি কিছু ঋণও যুক্ত হয়েছে।

প্রয়াত জয়নুল হক সিকদার সপরিবারে দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে থিতু হয়েছিলেন আশির দশকের শুরুতে। যদিও আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে যাতায়াত ছিল তার। জয়নুল হক সিকদার ও তার স্ত্রী মনোয়ারা সিকদার উভয়েই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ছিলেন। পাশাপাশি এ দম্পতির আট সন্তানের প্রায় সবার যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব রয়েছে। এ দম্পতির তিন মেয়ে নাসিম সিকদার, পারভীন হক সিকদার, লিসা ফাতেমা হক সিকদার। এর মধ্যে কেবল পারভীন হক সিকদার বাংলাদেশে বসবাস করেছেন। তিনি ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের মনোনয়নে জাতীয় সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হয়েছিলেন। 

বাকি দুই কন্যা স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। জয়নুল হক সিকদারের পাঁচ ছেলের মধ্যে সবার বড় মমতাজুল হক সিকদার। অন্য ছেলেরা হলেন নিক হক সিকদার, দিপু হক সিকদার, রিক হক সিকদার ও রন হক সিকদার। দেশের বাইরে অবস্থান করলেও এ দম্পতির সব সন্তানই সিকদার গ্রুপের পরিচালক। পাশাপাশি জয়নুল হক সিকদারের নাতি-নাতনিদের মধ্যে মনিকা সিকদার, মেন্ডি সিকদার, জেফ্রী সিকদার, জোনাস সিকদার, সিন হক সিকদার, জন হক সিকদারও শিল্প গ্রুপটির পরিচালক হিসেবে রয়েছেন। যদিও তাদের কেউ বাংলাদেশে বসবাস করেন না। আর সিকদার গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

সোমবার সংযুক্ত আরব আমিরাতে মারা যাওয়া রন হক সিকদার ছিলেন পরিবারটির সবচেয়ে প্রভাবশালী ও বেপরোয়া সদস্য। ২০২০ সালে এক্সিম ব্যাংকের তৎকালীন এমডিকে গুলি করে ভয় দেখানোর ঘটনায় ব্যাপক সমালোচিত হয়েছিলেন তিনি। 

ন্যাশনাল ব্যাংকের তথ্যমতে, এ ব্যাংকটি থেকেও নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েছেন রন ও রিক। এসব ঋণ অনেক আগেই অনিয়মিত ও মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। শুধু ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেই এ দুই ভাই বিদেশে খরচ করেছেন ৭১ কোটি টাকার বেশি। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী দেশের ব্যাংকগুলোর কোনো ক্রেডিট কার্ডের অনুকূলে জামানতবিহীন সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ও জামানতসহ সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকার ঋণসীমার সুযোগ রয়েছে।

২০২৪ সালের এপ্রিলে এ দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলায় তাদের বিরুদ্ধে ন্যাশনাল ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে বিদেশে ৭১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা ব্যয় ও পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছিল। এতে রন-রিক ছাড়াও বেসরকারি ব্যাংকটির সাবেক তিন ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ (এমডি) পাঁচ কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়। দুদকের পরিচালক মো. বেনজীর আহম্মদ বাদী হয়ে মামলা দুটি করেন।

ক্রেডিট কার্ড ছাড়াও ন্যাশনাল ব্যাংকের হিসাব থেকে থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে অর্থ পাচার হয়েছে বলে দুদকের মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়। এতে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) অনুসন্ধান প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, থাইল্যান্ডে রন হক সিকদার ও রিক হক সিকদারের নিজ নামে এবং তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে অন্তত ২০টি ব্যাংক হিসাব পরিচালিত হচ্ছে। 

এসব ব্যাংক হিসাবে বিভিন্ন সময়ে ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে অর্থ স্থানান্তর হয়েছে। এছাড়া আমেরিকা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, সুইজারল্যান্ড, চীন, ভিয়েনা, অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন ও রাশিয়া থেকে হিসাবগুলোয় অর্থ স্থানান্তরের প্রমাণ পাওয়া গেছে। -- ব‌ণিকবার্তা

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়