ডেস্ক রিপোর্ট : মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে দেশের তেলের বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পাম্পে পাম্পে তেল কিনতে দীর্ঘ লাইন লেগেই আছে। তবে সড়ক-মহাসড়কে তেল সংকটের চিত্র নেই। দূরপাল্লার বাস চলছে, ব্যক্তিগত যানবাহনও চলছে ঠিকমতো। চাহিদার তুলনায় কম তেল সরবরাহের কারণে পাম্পে পাম্পে এই দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন মালিকরা। কোনো কোনো পাম্পে তেল বিক্রি বন্ধ রেখেছে। চাপ সামলাতে তেলের দাম না বাড়িয়ে দিনে ১৬৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে সরকার।
সরকার বলছে, দেশে এখনো জ্বালানি তেলের সংকট তৈরি হয়নি। এপ্রিল মাসের আমদানিসূচিও তৈরি করা হচ্ছে। দেশে প্রতিদিন গড়ে ডিজেলের চাহিদা ছিল ১২ হাজার টন। পেট্রোল ও অকটেনের চাহিদা ছিল ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টন। ঈদের আগে প্রতিদিন ২৪ হাজার থেকে ২৫ হাজার টন ডিজেল সরবরাহ করা হয়েছে। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার ১০ হাজার টন ডিজেল ও ২০ হাজার টন জেট ফুয়েল নিয়ে একটি জাহাজ দেশে পৌঁছেছে।
ইউনিপেক নামের চীনের একটি প্রতিষ্ঠান চুক্তি অনুযায়ী এই তেল সরবরাহ করেছে। এমটি গ্রান কুভা নামের জাহাজে এই জ্বালানি তেল দেশে পৌঁছে। সিডিউল অনুযায়ী মার্চে তেল নিয়ে ১৭টি জাহাজ দেশে আসার কথা ছিল। এ নিয়ে ৯টি জাহাজ দেশে এসেছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা যায়, গত ২৩শে মার্চ পর্যন্ত ১৪ দিনের ডিজেল মজুত ছিল। সংকট আরও বাড়ার আশঙ্কায় মানুষ আগেভাগেই ডিজেল, অকটেন ও পেট্রল কিনে রাখছেন। ওদিকে, শুক্রবার দুপুরে যশোরে এক অনুষ্ঠানের যোগ দিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম বলেন, জনগণের দুর্ভোগ কমাতে সরকার প্রতিদিন জ্বালানি তেলে ১৬৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে। জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেন, বহির্বিশ্বের অস্থিরতার মধ্যেও জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করেনি।
চতুর্দিক থেকে চাপ থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কোনো পরিকল্পনা করেনি সরকার। জনগণের দুর্ভোগ কোনো কারণে যাতে না বাড়ে, সেটি নিশ্চিত করতে প্রতিদিন সরকার ১৬৭ কোটি টাকা জ্বালানি তেলে ভর্তুকি দিচ্ছে। এ সময় তিনি বলেন, আগামী এপ্রিল মাস পর্যন্ত জনগণের জ্বালানি তেলের চাহিদা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে। জ্বালানি তেল নিয়ে অনেকের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। এখন পর্যন্ত পৃথিবীর ৮০টা দেশ জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি করলেও বাংলাদেশ সরকার জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির পরিকল্পনা করেনি। কিন্তু আমাদের চাহিদা অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে।
এক বিবৃতিতে পেট্রোল পাম্প ওনার্স এসোসিয়েশনের আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল বলেন, বর্তমানে পেট্রোল পাম্পগুলোতে জ্বালানি সংগ্রহের জন্য যে উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা অনভিপ্রেত। আমার ৫০ বছরের ব্যবসায়িক জীবনে এমন পরিস্থিতি কখনো দেখিনি। এ অবস্থা সামলাতে সাধারণ গ্রাহকদের অবশ্যই সংযত হতে হবে। তিনি বলেন, মার্চ মাসে অধিক মাত্রায় সরকারি ছুটি থাকায় জ্বালানি তেলের ধারাবাহিক সরবরাহ প্রক্রিয়া কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। ফলে দেশের বেশ কিছু জায়গায় পাম্প সাময়িকভাবে তেলশূন্য হয়ে পড়েছিল।
শুক্রবার সরজমিন ঢাকার কয়েকটি পাম্প ঘুরে দেখা গেছে, কিছু কিছু পাম্প অকটেনের সরবরাহ না পেয়ে বিক্রি বন্ধ রেখেছে। অকটেন বন্ধ রেখে ডিজেল বা পেট্রোল বিক্রি করছে। বন্ধ পাম্পগুলোতে কিছু সময় পর পর বাইকাররা এসে ঘুরে যাচ্ছিলেন। আবার যেসব পাম্পে অকটেন বিক্রি হচ্ছে সেগুলোতে কয়েকশ’ মিটার লম্বা লাইন দেখা গেছে। তেল নিতে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছিলেন তারা। রাজধানী ঢাকার মতো একই চিত্র সারা দেশের অন্যান্য জেলাগুলোতেও।
মগবাজার এলাকার মইন মটরসে দেখা যায়, সেখানে ঢাকার মিনিবাসগুলো লাইন ধরে আছে ডিজেল নেয়ার জন্য। তবে কোনো মোটরসাইকেল দেখা যায়নি। পাম্পের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, সর্বশেষ ঈদুল ফিতরের আগে অকটেন বিক্রি করেছেন তারা। এরপর আর তেল পাওয়া যায়নি। তাই বিক্রি বন্ধ রয়েছে।
নীলক্ষেত এলাকার পথের বন্ধু ফিলিং স্টেশনের বিকাল ৪টার দিকে দেখা যায়, সেখানে তেল বিক্রি হলেও বাইকারদের লম্বা লাইন নীলক্ষেত জিরো পয়েন্ট থেকে পলাশী পর্যন্ত। তবে পাম্প কর্তৃপক্ষ জানায়, গত কয়েকদিন ধরেই সেখানে তেল সরবরাহ বন্ধ ছিল। পরে শুক্রবার চাহিদার খুব অল্প পরিমাণ তেল পায় পাম্পটি। পরিবাগের দু’টি- মেঘনা মডেল সার্ভিস ও পূর্বাচল টেডার্সে গিয়ে দেখা গেছে একটিতে অকটেন সংকটে বিক্রি বন্ধ রয়েছে। অন্যটিতে বাইকাররা দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষা করে তেল নিয়েছেন।
নীলক্ষেত পথের বন্ধু পাম্পের মালিক মো. আজমাল বলেন, সাতদিন ধরে পাম্পে অকটেন ছিল না। শুক্রবার তেল আসে। আমাদের সাড়ে ৯ হাজার লিটার অকটেন দরকার দিয়েছে সাড়ে ৪ হাজার লিটার। এগুলোর জন্য কাড়াকাড়ি লেগে গেছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, তেল শেষ হয়ে গেলে ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা গণ্ডগোল শুরু করে দেয়। কেউ কেউ পাম্পে আগুন লাগিয়ে দেবে বলেও হুমকি দেয়।
তাদের দাবি তেল আছে কিন্তু আমরা তেল দিই না। মেঘনা মডেল সার্ভিসের এসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার আহমাদ রুশ বলেন, পাম্পে তেলের কোনো সংকট নেই। আমরা নিয়মানুযায়ী তেল দিচ্ছি। বিশেষ কোনো প্রয়োজন হলে সেক্ষেত্রে কিছু বাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। তাছাড়া ঈদের আগে পরে তেল না থাকায় পাম্প বন্ধ থাকেনি কোনোদিন।
মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর মো. শাহীরুল হাসান বলেন, তেলের কোনো সংকট নেই। তবে আমার মনে হয়, গতকাল বন্ধ থাকায় ডিপো থেকে তেল নিয়ে যেতে কিছু সময় লেগেছে। তাই কোথাও কোথাও তেল ফুরিয়ে যেতে পারে। সূত্র, মানবজমিন