শিরোনাম
◈ বাংলাদেশকে স্বনির্ভর ও শিল্পোন্নত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা: মির্জা ফখরুল ◈ ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানোর কৌশল: অর্থনীতির জন্য কতটা ইতিবাচক? ◈ ক্রিকেটার নাঈমের শারী‌রিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে চট্টগ্রামে গে‌লেন বিসিবির ফিজিওরা ◈ ব্রাজিলের এক‌টি গ্রামের অধিকাংশ মানুষ মরক্কোর বিপক্ষে জয় চান না ◈ ইংল্যান্ড দ‌লের বল ও বুটসহ অ‌নেক অনুশীলন সরঞ্জাম চুরি ◈ সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে একটি করে গাছ লাগান: প্রধানমন্ত্রী ◈ বিপ্লবের পর বাস্তবতার মুখে বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা ◈ জুলাইয়ে সমাহিত হবেন খামেনি, ঘোষণা ইরানের ◈ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বন্ধে ইরানের সঙ্গে গোপন সমঝোতা আমিরাতের? ১০-২০ বিলিয়ন ডলার ছাড়ের তথ্য প্রকাশ করল রয়টার্স ◈ ‘দেশের মালিক ২০ কোটি মানুষ, কোনো দল বা পরিবার নয়, জনগণের সমর্থন নিয়েই দেশের ভাগ্য বদলাবে বিএনপি’

প্রকাশিত : ১৩ জুন, ২০২৬, ০৭:৩৫ বিকাল
আপডেট : ১৩ জুন, ২০২৬, ০৯:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানোর কৌশল: অর্থনীতির জন্য কতটা ইতিবাচক?

আমিনুল হক রাসেল: বাংলাদেশের অর্থনীতিতে জাতীয় বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি সরকারের উন্নয়ন দর্শন, বিনিয়োগ কৌশল এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির রূপরেখা। প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ঘাটতি অর্থায়নের যে কাঠামো উপস্থাপন করা হয়েছে, তা দেশের ব্যাংকিং খাত, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। বিশেষ করে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প অর্থায়ন উৎসের দিকে ঝোঁক অর্থনীতির জন্য একটি কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

আগামী অর্থবছরে সরকারের মোট ঘাটতি অর্থায়নের পরিমাণ ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ উৎস এবং ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস থেকে সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। বৈদেশিক অর্থায়নের মধ্যে ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা ঋণ এবং ৬ হাজার ১৫০ কোটি টাকা অনুদান হিসেবে আসবে। অন্যদিকে, অভ্যন্তরীণ অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংকিং খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা এবং ব্যাংক-বহির্ভূত উৎস থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এই বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ঘাটতি অর্থায়নে ব্যাংকিং খাতের ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রচেষ্টা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে সরকার ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল, যা মোট ঘাটতি অর্থায়নের প্রায় ৫৯ শতাংশ। নতুন বাজেটে সেই পরিমাণ কমিয়ে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ মোট ঘাটতি অর্থায়নের ৪৬ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। এটি শুধু একটি সংখ্যাগত পরিবর্তন নয়; বরং আর্থিক খাত ব্যবস্থাপনায় একটি নীতিগত রূপান্তরের প্রতিফলন।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিন ধরেই সরকারি ঋণ গ্রহণের একটি প্রধান উৎস। যখন সরকার ব্যাপক পরিমাণে ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করে, তখন ব্যাংকগুলোর ঋণযোগ্য তহবিলের একটি বড় অংশ সরকারি খাতে চলে যায়। ফলে শিল্প উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা (এসএমই), কৃষি খাত এবং নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্য ঋণপ্রাপ্তি কঠিন হয়ে পড়ে। অর্থনীতিতে এটিকে "ক্রাউডিং আউট" (Crowding Out) প্রভাব বলা হয়। নতুন বাজেটে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানোর ফলে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ বাড়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।

বাংলাদেশ বর্তমানে বিনিয়োগ ঘাটতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিল্পায়নের গতি বৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। বেসরকারি খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়। ব্যাংক খাতের ওপর সরকারি চাপ কমলে শিল্প ও উৎপাদন খাতে নতুন বিনিয়োগ বাড়তে পারে, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং রপ্তানি সম্প্রসারণে সহায়ক হবে। এর মাধ্যমে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি আরও শক্তিশালী ভিত্তি লাভ করতে পারে।

বাজেটে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য বন্ড মার্কেটের উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ। উন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতিগুলোতে সরকার এবং করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প অর্থায়নের জন্য বন্ড বাজার ব্যবহার করে থাকে। বাংলাদেশে এখনো বন্ড বাজার পর্যাপ্তভাবে বিকশিত হয়নি। তাই সরকারি ট্রেজারি বন্ডের পাশাপাশি করপোরেট বন্ড, মিউনিসিপ্যাল বন্ড এবং অন্যান্য পুঁজিবাজারভিত্তিক আর্থিক উপকরণ চালুর উদ্যোগ অর্থনীতিকে একটি নতুন দিকনির্দেশনা দিতে পারে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং নগর উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বিকল্প অর্থায়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

তবে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি কিছু চ্যালেঞ্জও সামনে আনতে পারে। বৈদেশিক ঋণ সাধারণত তুলনামূলক কম সুদে পাওয়া গেলেও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা এবং বিনিময় হার ব্যবস্থাপনার ওপর এর প্রভাব থাকে। তাই বৈদেশিক ঋণ ব্যবহারে দক্ষতা, প্রকল্প বাস্তবায়নের গুণগত মান এবং অর্থনৈতিক রিটার্ন নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের চাপ অর্থনীতির জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপের প্রেক্ষাপটে সরকার যে ব্যাংকিং খাতের ওপর নির্ভরতা কমানোর কৌশল গ্রহণ করেছে, তা সময়োপযোগী পদক্ষেপ। এটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ব্যাংকিং খাতের তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি হবে, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি পাবে, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সম্প্রসারিত হবে এবং অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি আরও টেকসই ভিত্তি পাবে।

সার্বিকভাবে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ঘাটতি অর্থায়নের নতুন কাঠামো বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করছে। ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানো, বন্ড বাজারের বিকাশ এবং অর্থায়নের উৎস বহুমুখীকরণের মাধ্যমে সরকার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ভিত্তি আরও শক্তিশালী করতে চায়। এই উদ্যোগগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত হবে আরও গতিশীল, বিনিয়োগ পরিবেশ হবে আরও অনুকূল এবং অর্থনীতি এগিয়ে যাবে একটি অধিক টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে।

আমিনুল হক রাসেল, পিএইচডি ফেলো, ফিনান্স বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ। এবং সহকারী অধ্যাপক, ড্যাফোডিল ইনস্টিটিউট অব আইটি।
Email: [email protected]

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়