মনজুর এ আজিজ: এলপি গ্যাস সংকটকে পুঁজি করে সরকারি আদেশ অমান্য করে সারাদেশেই আমদানিকারক, পরিবেশক এবং খুচরা বিক্রেতা বাড়তি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে মারাত্নকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন গ্রাহকরা। এদিকে এ পরিস্থিতিতে রোববার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ১২ কেজি এলপি গ্যাসের দাম ৪০-৫০ টাকা বাড়াতে পারে বলে জানা গেছে।
গত ডিসেম্বর মাসের জন্য ১২ কেজি এলপি গ্যাসের দাম ৩৮ টাকা বাড়িয়ে ১২৫৩ টাকা নির্ধারণ করে বিইআরসি। আন্তর্জাতিক বাজারদর এবং ডলারের দাম বৃদ্ধির কারণে ফর্মুলা অনুযায়ী এলপিজির দাম বেড়ে যায়। কিন্তু অনেক জায়গা থেকে ১৫০০ টাকা থেকে ২১০০ টাকায় বিক্রির খবর পাওয়া যাচ্ছে।
রংপুরের সিনিয়র সাংবাদিক শাহ সাদা মিয়া গণমাধ্যমকে বলেছেন, রংপুরের পীরগঞ্জে এলপিজি সিলিন্ডারের তীব্র সংকট চলছে। দুইদিন আগে বাজারে যে সিলিন্ডার ১৩২০ টাকায় বিক্রি হতো, ১ জানুয়ারি সেই সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ১৫০০ টাকায়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে কোনো কোম্পানির সিলিন্ডারের সরবরাহ নেই। কোম্পানির লোকজনকে ফোন করলে তারা ফোন কেটে দিচ্ছেন। কয়েকজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সাথে কথা হলে তারা বলেন, আমরাও কাস্টমারের নিকট নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছি।
এলপিজি সিলিন্ডার পরিবেশক সমিতির সভাপতি সেলিম খান গণমাধ্যমকে বলেন, ডিসেম্বরের শুরুতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) দর ঘোষণার পর দুই দফায় দাম বাড়িয়েছে এলপিজি ব্যবাসায়ীরা। খুচরা পর্যায়ে ১২৫৩ টাকায় বিক্রি করার কথা, অথচ কিনতে হয়েছে ১৩২৯ টাকা দিয়ে। তিনি বলেন, ২৭টি কোম্পানি বাজারে থাকলেও মাত্র ৩টি কোম্পানি (ওমেরা, আইগ্যাস ও বিএম) এলপিজি সরবরাহ দিচ্ছে তাও রেশনিং করে। অন্যগুলো সরবরাহ বন্ধ রেখেছে।
৫ আগস্টের পর কয়েকটি কোম্পানি মার্কেট থেকে হারিয়ে গেছে। সরবরাহ কমে যাওয়ায় আমরাও খুব বিপদে আছি। সকালে (৩ জানুয়ারি) রাজশাহীর এলপিজি সিলিন্ডার পরিবেশক সমিতি থেকে ফোন করেছিল, তারা গ্যাস পাচ্ছে না, দোকান বন্ধ করার কথা বললে আমি জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পরিস্থিতি অবগত করার কথা বলেছি।
বিইআরসি সূত্র দাবি করেছে, ৫ আগস্টের পরে বসুন্ধরা, ওরিয়ন, নাভানাসহ কয়েকটি কোম্পানির আমদানি বন্ধ হয়ে গেছে। এরা ছিল বাজারের বড় আমদানিকারক। সে কারণে স্বাভাবিকভাবেই একটি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সঙ্গে তৈরি হয়েছে এলসি জটিলতা ও জাহাজ সংকট।
এ প্রসঙ্গে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, এলপিজি সংকটের বিষয়ে জানার পর লোয়াব (এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশ) প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি জানিয়েছেন, ডিসেম্বরে আমদানি কম হয়েছে সে কারণে বাজারে প্রভাব পড়েছে। আমদানি কম হওয়ার কারণ হিসেবে জাহাজ সংকটের কথা জানিয়েছেন তিনি।
আমি নিজে খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি, ডিসেম্বরের ১৮ তারিখে আমেরিকা নতুন করে ২৯টি জাহাজের উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। যে কারণে জাহাজ সংকট তৈরি হয়েছে। পারস্য সাগরে জাহাজে থাকা এলপিজিগুলো রিপ্লেস করতে হবে, এতে কিছুটা সময় লাগছে। মাসে ১ লাখ ২৫ হাজার টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে। সেখানে ডিসেম্বরে আমদানি হয়েছে ৯০ হাজার টন। আশা করছি শিগগিরই সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
বেশি দামে বিক্রি প্রসঙ্গে বিইআরসি চেয়ারম্যান বলেন, নির্ধারিত দামের বেশি নেওয়ার সুযোগ নেই। ভোক্তা অধিদপ্তর ইতোমধ্যে অভিযান শুরু করেছে। লোয়াব প্রেসিডেন্ট আমাকে জানিয়েছে, তারা নির্ধারিত দামেই বিক্রি করছে, তবে সংকট থাকায় খুচরা বিক্রেতা বাড়তি দাম নিয়ে থাকতে পারে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শনিবার (৩ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় জ্বালানি উপদেষ্টা এ বিষয়ে বৈঠক করবেন। সেখানে সংশ্লিষ্ট সকলকে ডাকা হয়েছে।
এলপিজি ব্যবসায়ীদের সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশ (লোয়াব) সূত্র বলছে, শীতের সময় বিশ্ববাজারে এলপিজির চাহিদা বেড়ে যায়। এতে দামও কিছুটা বাড়তি থাকে। এর সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে এলপিজি আমদানির জাহাজসংকট। নিয়মিত এলপিজি পরিবহনের ২৯টি জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পড়েছে। পরিবহন খরচ বেড়ে গেছে। তারপরও চাইলেই জাহাজ পাওয়া যাচ্ছে না। এতে আগের মাসের তুলনায় গত মাসে এলপিজি আমদানি কমে গেছে।
আমদানি নির্ভর এলপিজির দর ছিল ব্যবসায়ীদের ইচ্ছাধীন। ২০২১ সালের ১২ এপ্রিলে প্রথম দর ঘোষণা হয়। ওই আদেশে বলা হয়, সৌদির দর উঠা-নামা করলে ভিত্তিমূল্য উঠানামা করবে। অন্যান্য কমিশন অপরিবর্তিত থাকবে। ঘোষণার পর থেকে প্রতিমাসে এলপিজির দর ঘোষণা করে আসছে বিইআরসি।