ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণের জবাবে ইরান গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্ভাব্য একটি আন্তর্জাতিক নৌ নিরাপত্তা জোট গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, চীন, জাপানসহ কয়েকটি দেশ যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়ে এই পথ নিরাপদ রাখবে। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, বাস্তবে এই পরিকল্পনা কার্যকর করা সহজ হবে না।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই পথে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের বেশি হয়ে গেছে।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, যুদ্ধের সময় এই জলপথ বন্ধ রাখার কৌশল নেবে ইরান। দেশটির আরেক শীর্ষ কর্মকর্তা সতর্ক করেছেন, ইরানের ওপর আক্রমণ চলমান থাকলে তেলের দাম ২০০ ডলার ছাড়াতে পারে।
এ অবস্থায় ট্রাম্প বলেন, হরমুজ নিরাপদ রাখতে বিভিন্ন দেশকে নিয়ে একটি নৌ জোট গঠন করা দরকার। তিনি চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাজ্যকে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানান। তার দাবি, ইরানের সামরিক সক্ষমতার বড় অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। তবু তেহরান ড্রোন পাঠানো, মাইন ফেলা বা স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে এই সরু জলপথে হামলা চালাতে পারে।
তবে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে বড় বাধা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, হরমুজ প্রণালির ভৌগোলিক অবস্থানই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সবচেয়ে সরু জায়গায় এর প্রস্থ মাত্র ২১ নটিক্যাল মাইল বা প্রায় ৩৯ কিলোমিটার। এর মধ্যে জাহাজ চলাচলের পথ আরও সরু। ফলে হামলার ঝুঁকি বেশি। একদিকে ইরান, অন্যদিকে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মাঝখানে এই জলপথ। প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে সমুদ্রপথে ভেতরে ঢোকা বা বের হওয়ার আর কোনো পথ থাকে না।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো বিভিন্ন দেশের নৌবাহিনীর সমন্বয়। সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আলেক্সান্দ্রু হুদিস্তিয়ানু বলেন, বিভিন্ন দেশের যুদ্ধজাহাজ একসঙ্গে কাজ করতে গেলে যোগাযোগ ব্যবস্থা, কৌশল ও সামরিক পদ্ধতির সমন্বয় বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তিনি আরও বলেন, ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি, সমুদ্রে পাতা মাইন এবং ড্রোন হামলার মতো অসম যুদ্ধ কৌশল এই অঞ্চলে জাহাজ চলাচলকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।
জাহাজকে নিরাপত্তা দিয়ে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হলেও তা ব্যয়বহুল। এতে অংশ নেওয়া বিদেশি যুদ্ধজাহাজও ইরানি হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ফলে সংঘাতে আরও দেশ জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এ ছাড়া দ্রুত কোনো অভিযান চালানোর চেষ্টা করলে তা উল্টো ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকেরা।
এদিকে ট্রাম্পের আহ্বানে এখন পর্যন্ত কোনো দেশ প্রকাশ্যে যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে সম্মতি দেয়নি। যুক্তরাজ্য বলেছে, তারা মিত্রদের সঙ্গে আলোচনা করছে কীভাবে প্রণালিটি আবার খুলে দেওয়া যায়। চীন সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে এবং বলেছে, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সব পক্ষের দায়িত্ব।
জাপান জানিয়েছে, এমন অভিযানে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানদণ্ড খুবই কঠিন। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিষয়টি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। ফ্রান্সও জানিয়েছে, তারা কোনো যুদ্ধ অভিযানে যোগ দেবে না।
এদিকে কিছু দেশ সরাসরি তেহরানের সঙ্গে আলোচনা করে নিজেদের জাহাজ চলাচলের অনুমতি নেওয়ার চেষ্টা করছে। ভারতের পতাকাবাহী দুটি এলপিজি ট্যাঙ্কার ইতোমধ্যে এই পথ দিয়ে পার হয়েছে। তুরস্কের একটি জাহাজও একইভাবে অনুমতি পেয়েছে। আরও কয়েকটি তুর্কি জাহাজ অনুমতির অপেক্ষায় আছে। ফ্রান্স ও ইতালিও ইরানের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।