শিরোনাম
◈ ‘আমরা থানা পুড়িয়েছি, এসআইকে জ্বালিয়ে দিয়েছি’ : বৈষম্যবিরোধী নেতা ◈ টিকে থাকলেও থমকে গেল গতি—২০২৫ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতির বাস্তব চিত্র ◈ সৌদি আরবে বাংলাদেশি কর্মী প্রেরণে নতুন রেকর্ড ◈ অধ্যাদেশ জারি: অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সির ব্যাংক গ্যারান্টি এক কোটি টাকা ◈ এ মাসের মধ্যেই হাদি হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের মুখোশ উন্মোচন করা হবে: নৌ উপদেষ্টা ◈ বাংলা‌দে‌শের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ দ‌লে নেই শান্ত ◈ হলফনামায় চমক: জোনায়েদ সাকির চেয়ে স্ত্রীর সম্পদ অনেক বেশি ◈ নি‌জের মাঠেই হোঁচট খে‌লো লিভারপুল ◈ বাছাইয়ের প্রথম দিনে বিএনপি-জামায়াতসহ হেভিওয়েট যেসব প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হলো ◈ গণভোটে ‘হ্যাঁ’ দিলে কী পাবেন, ‘না’ দিলে কী পাবেন না

প্রকাশিত : ০২ জানুয়ারী, ২০২৬, ১১:০৩ রাত
আপডেট : ০৩ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৬:০০ সকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

টিকে থাকলেও থমকে গেল গতি—২০২৫ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতির বাস্তব চিত্র

২০২৫ সাল বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ছিল মূলত টিকে থাকার বছর। ধসে পড়ার মুখে থাকা অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখাই ছিল সরকারের প্রধান লক্ষ্য। সে লক্ষ্য আংশিকভাবে পূরণ হলেও তার বিনিময়ে প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে বড় ধাক্কা এসেছে।

বছরজুড়ে কিছু সামষ্টিক সূচকে স্থিতিশীলতার আভাস মিললেও ব্যাংকিং খাতের ভেতরের সংকট আরও প্রকট হয়েছে। বিশেষ করে খেলাপি ঋণের দ্রুত উল্লম্ফন নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। এর পাশাপাশি বিনিয়োগ স্থবির, কর্মসংস্থান সংকুচিত এবং রফতানি আয়ে চাপ অর্থনীতিকে দুর্বল রেখেছে।

সরকারের দাবি, রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতিকে পুরোপুরি ভেঙে পড়তে দেয়নি। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, উচ্চ সুদহার, কঠোর মুদ্রানীতি ও ব্যয় সংকোচনের মাধ্যমে যে স্থিতিশীলতা এসেছে, তা শিল্প-বাণিজ্যের গতি কমিয়ে দিয়েছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনে প্রত্যাশিত স্বস্তি আনতে পারেনি।

বড় দুর্বলতা বিনিয়োগে খরা

২০২৫ সালে দেশের অর্থনীতির বড় দুর্বলতা হিসেবে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বিনিয়োগ খাতের স্থবিরতা। অক্টোবরে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ নেমে আসে রেকর্ড সর্বনিম্ন ৬ দশমিক ২৩ শতাংশে। উচ্চ সুদহার, ব্যবসার খরচ বৃদ্ধি, ডলার সংকট ও নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। নতুন উদ্যোগ নেওয়ার বদলে অনেকেই বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখাতেই মনোযোগ দিচ্ছেন। অনেকেই বলছেন, ব্যাংক খাত সংস্কার ও কর ফাঁকি দমনে সরকারের কঠোর অবস্থান ব্যবসায়ীদের মধ্যে এক ধরনের ভীতি তৈরি করেছে।

বিনিয়োগের এই মন্দার প্রভাব পড়েছে বিদেশি বিনিয়োগেও। সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) জিডিপির ১ শতাংশের নিচে সীমাবদ্ধ থাকায় অর্থনীতির বৈচিত্র্য বাড়ছে না, পাশাপাশি মানসম্মত নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি হচ্ছে না।

ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, বর্তমানে ব্যবসা সম্প্রসারণ বা নতুন প্রকল্প নেওয়ার মতো পরিবেশ নেই। সরকারও ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান নিয়ে কার্যকর আলোচনা করছে না। ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে, আর উচ্চ সুদ, ভ্যাট ও করের চাপ নতুন ব্যবসা শুরু করাকে আরও নিরুৎসাহিত করছে। এর ফলে মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানিও কমে যাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বর্তমান সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে যে অর্থনৈতিক সংকট পেয়েছে, তার বড় অংশ এখনও কাটেনি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আর্থিক খাতের দুরবস্থা ও অর্থনীতিতে কর্মচাঞ্চল্যের অভাব স্পষ্ট রয়ে গেছে। প্রবৃদ্ধি মন্থর, বিনিয়োগে খরা, কর্মসংস্থানে স্থবিরতা এবং রফতানিতে ভাটার চিত্রেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি।

তবে বৈদেশিক বাণিজ্য ভারসাম্যে কিছুটা স্বস্তি এসেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় যেখানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার, বর্তমানে তা বেড়ে ২৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি এবং অর্থপাচার কমে যাওয়ায় বাজারে ডলারের জোগান বেড়েছে বলেও তিনি জানান।

ড. জাহিদ হোসেনের মতে, মূল্যস্ফীতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি পুরোপুরি কমেনি, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো এখনো চাপের মধ্যে রয়েছে। আর্থিক খাত সংস্কারে উদ্যোগ নেওয়া হলেও এর ফল এখনও অনিশ্চিত। পাশাপাশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি— রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগ–খরা কাটেনি। ফলে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে— এমন দাবি করার সুযোগ নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

২০২৫ সাল ব্যাংক গ্রাহকদের উৎকণ্ঠার বছর

২০২৫ সালজুড়ে দেশের ব্যাংক গ্রাহকদের জন্য ছিল অনিশ্চয়তা আর উৎকণ্ঠার বছর। বছরের শুরু থেকেই কয়েকটি ব্যাংকে নগদ অর্থের তীব্র সংকট দেখা দেয়, অনেক গ্রাহক জরুরি প্রয়োজনেও টাকা তুলতে পারেননি। বিশেষ করে ইসলামি ধারার পাঁচটি ব্যাংকের গ্রাহকরা বছরের শেষ পর্যন্ত তাদের সঞ্চয় ফেরত পাননি।

বাংলাদেশ ব্যাংক বারবার আশ্বাস দিয়েছে দুর্বল ব্যাংকের কারণে সাধারণ গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না। এ জন্য আমানত বিমা তহবিল আইন সংশোধন করা হয়, যাতে কোনও ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা ফেরত পেতে পারেন। কিন্তু বাস্তবতায় সমস্যার সমাধান তৎক্ষণাৎ হয়নি। একীভূতকরণের প্রক্রিয়া শুরুর পর সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো থেকে কার্যত অর্থ উত্তোলন বন্ধ হয়ে যায়।

এদিকে, খেলাপি ঋণের মাত্রা বাড়তে থাকায় ব্যাংক খাতে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। সেপ্টেম্বর ২০২৫ সালের শেষে মোট ঋণ দাঁড়ায় ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা, যার মধ্যে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, অর্থাৎ ৩৫.৭৩ শতাংশ। ২০২৪ সালের একই সময়ে খেলাপি ঋণ ছিল মোট ঋণের ১৬.৯৩ শতাংশ। বিশ্লেষকদের মতে, ঋণ পুনঃতফসিল ও বিশেষ সুবিধা কমে যাওয়ায় প্রকৃত খেলাপি ঋণ প্রকাশ পেয়েছে।

অর্থনীতিতে এ পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে বিনিয়োগ, এলসি খোলা, কাঁচামাল আমদানি এবং বেতন পরিশোধে। দীর্ঘমেয়াদে এতে প্রবৃদ্ধি, রাজস্ব আদায় ও আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।

মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যানে স্বস্তি, বাজারে অস্বস্তি

২০২৫ সাল শুরু হয়েছিল খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্যের চাপ নিয়ে। বছরের শুরুতে খাদ্যমূল্যস্ফীতি প্রায় ১১ শতাংশে থাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে সাধারণ মানুষের দুশ্চিন্তা ছিল তুঙ্গে। বছর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সরকারি পরিসংখ্যানে কিছুটা স্বস্তির ছবি ফুটে উঠলেও সেই স্বস্তি বাজার কিংবা ভোক্তার জীবনে তেমনভাবে প্রতিফলিত হয়নি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বর মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি নেমে আসে ৭ দশমিক ৩৬ শতাংশে এবং সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে। কাগজে-কলমে এটি ইতিবাচক অগ্রগতি হলেও বাস্তব বাজারে চাল, তেল, পেঁয়াজসহ নিত্যপণ্যের দামে তেমন কোনও স্বস্তি মেলেনি।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাব বলছে, গত এক বছরে মোটা চালের দাম কেজিতে বেড়েছে ৫ থেকে ৭ টাকা। ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে লিটারে প্রায় ২০ টাকার বেশি। পেঁয়াজের বাজারও অস্থির ছিল, কোনও কোনও সময়ে দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। যদিও চিনি, মুরগি কিংবা কিছু মসলা পণ্যের দামে তুলনামূলক স্থিতিশীলতা ছিল, তবে সামগ্রিকভাবে খাদ্যঝুড়ির ব্যয় কমেনি।

বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালে নিত্যপণ্যের বাজার ছিল স্বস্তি ও অস্থিরতার এক অদ্ভুত মিশ্রণ। বছরের বেশির ভাগ সময় পেঁয়াজের দাম সহনীয় থাকলেও শেষ তিন মাসে হঠাৎ করেই তা বেড়ে কেজিতে ১৭০ টাকায় পৌঁছায়। পরে ভারত থেকে আমদানি ও নতুন মুড়িকাটা পেঁয়াজ বাজারে আসায় দাম নেমে আসে ১০০ টাকার নিচে।

সবজির বাজারেও ছিল বড় ধরনের অস্থিরতা। মাঝামাঝি সময়ে প্রায় কোনও সবজিই ১০০ টাকার নিচে পাওয়া যায়নি, বেগুনের দাম ছাড়িয়ে যায় কেজিতে ২০০ টাকা। শীত মৌসুমে সরবরাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়। মাছের বাজারেও স্বস্তি ছিল না— ইলিশ সারা বছরই ছিল নাগালের বাইরে, আর অন্যান্য মাছের দামও ছিল তুলনামূলক বেশি।

সব মিলিয়ে বলা যায়, পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতি কমার ইঙ্গিত মিললেও সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বাড়েনি।

চাল, ভোজ্য তেল, শাকসবজি, পরিবহন ব্যয়, বাড়ি ভাড়া, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার খরচ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের আয়ের বড় অংশ গ্রাস করছে। বিশেষ করে মজুরিভিত্তিক শ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় প্রতিদিন টিকে থাকার লড়াইয়ে পড়েছেন।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাংলাদেশ একটি ‘নিম্নমাত্রার অর্থনৈতিক সমতায়’ আটকে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্ক থেকে কমে ৮.২৯ শতাংশে নেমে এলেও মজুরি বাড়ার গতি প্রায় স্থবির থাকায়— প্রকৃত আয় ও ক্রয়সক্ষমতা কমে যাচ্ছে মানুষের।

কর্মসংস্থানে ধাক্কা

কারখানা বন্ধ, গণহারে ছাঁটাই এবং মন্থর প্রবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে ২০২৫ সাল শেষ হচ্ছে চাকরির বাজারে পুনরুদ্ধারের কোনও সুখবর ছাড়াই। চাকরির বাজারে ঘুরে দাঁড়ানোর যে আশা ছিল, তা আর বাস্তবে রূপ নেয়নি। বরং আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক—দুই খাতেই কর্মসংস্থানের সংকট আরও গভীর হয়েছে।

বেকারত্ব বহু দিন ধরেই দেশের বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পেছনেও চাকরিহীনতার ক্ষোভ একটি বড় কারণ হিসেবে কাজ করেছিল। কিন্তু সেই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের দেড় বছর পরও শ্রমবাজারে কাঙ্ক্ষিত কোনও ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত নেই।

সরকারি পর্যায়ের একটি অভ্যন্তরীণ জরিপ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের জুলাই— এই এক বছরে দেশে অন্তত ২৪৫টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় এক লাখ শ্রমিক। যদিও একই সময়ে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহে প্রায় ৯৩৭টি নতুন কারখানা চালু হয়েছে, তবে এসব উদ্যোগের বেশির ভাগই ছোট পরিসরের।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদের ভাষায়, বড় বিনিয়োগ খুব কম হয়েছে। ছোট ও সীমিত উদ্যোগ বাড়লেও তা অর্থনীতিকে অর্থবহভাবে ঘুরে দাঁড় করানোর জন্য যথেষ্ট নয়।

বিডিজবস ডটকমের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও এ কে এম ফাহিম মাশরুরের মতে, ২০২৫ সাল ছিল চাকরি প্রত্যাশীদের জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং। বছরের শুরুতে, বিশেষ করে প্রথম ছয় মাসে, চাকরির বিজ্ঞপ্তির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। যদিও মধ্যভাগের পর কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, বাস্তবে চাকরির বাজার এখনও পূর্ণাঙ্গ গতি ফেরাতে পারেনি।

তিনি বলেন, এই স্থবিরতার সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ছে সদ্য স্নাতক সম্পন্ন করা তরুণদের ওপর। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক গ্র্যাজুয়েট শ্রমবাজারে যুক্ত হলেও তাদের জন্য শুরুর পর্যায়ের চাকরির সুযোগ তুলনামূলকভাবে অনেক কম।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘শ্রমশক্তি জরিপ-২০২৪’ অনুযায়ী দেশে কর্মসংস্থানে বড় ধরনের সংকোচন দেখা দিয়েছে। এক বছরে মোট কর্মসংস্থান কমেছে প্রায় ১৭ লাখ ৪০ হাজার, যার মধ্যে ১৬ লাখ ৪০ হাজারই নারী— অর্থাৎ ক্ষতিগ্রস্তদের প্রায় ৯৪ শতাংশ নারী শ্রমশক্তি।

তার মতে, এই বাস্তবতা দেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন মডেলকে সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। বৈষম্য কমাতে হলে শুধু কর্মসংস্থান বাড়ালেই হবে না, প্রয়োজন মানসম্মত, টেকসই ও উৎপাদনশীল কাজের সুযোগ সৃষ্টি।

বিশ্বব্যাংক ও পিপিআরসির বিভিন্ন জরিপের তথ্য উদ্ধৃত করে তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে দারিদ্র্য ও আয়বৈষম্য—দুটোই বেড়েছে, যা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন শ্রমবাজারের এক ধরনের বিরোধাভাস— দেশে শিক্ষার হার বাড়লেও শিক্ষিতদের চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা উল্টো কমে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য বড় সতর্কবার্তা।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও)-এর সাবেক বিশেষ উপদেষ্টা রিজওয়ানুল ইসলামের মতে, ২০২৫ সালের শুরুতে কিছুটা পুনরুদ্ধারের আভাস মিললেও তা দ্রুতই থেমে গেছে। প্রকৃত মজুরি কমতে থাকায় দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষ এখন দ্বিমুখী সংকটে পড়েছেন। তার ভাষায়, দেশ এখন ‘চাকরিবিহীন প্রবৃদ্ধি’ থেকে ‘প্রবৃদ্ধিহীন ও চাকরিহীন’ অর্থনীতির দিকে এগোচ্ছে।

র‍্যাপিডের চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক বলেন, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না, আর যেগুলো আছে তার বড় অংশই অনানুষ্ঠানিক ও কম উৎপাদনশীল। পাশাপাশি গ্র্যাজুয়েট বেকারত্ব উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে।

রফতানিতে একের পর এক নেতিবাচক ধাক্কা

২০২৫ সালে রফতা নি খাতে একাধিক নেতিবাচক ধাক্কার প্রভাব পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রধান বাজারগুলোতে শুল্ক আরোপের হুমকি ও অর্ডার স্থগিতের ঘটনা তৈরি পোশাক রফতানিতে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সরকার পরিবর্তনের প্রভাব ব্যবসায়িক আস্থাকে দুর্বল করেছে।

শ্রম অসন্তোষও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সড়ক অবরোধ, শ্রমিক আন্দোলন এবং একাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে নজিরবিহীন ঘটনা ছিল কাস্টমস হাউজের সম্পূর্ণ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া— যা বিশ্বব্যাপী বিরল। এমন এক দেশে, যেখানে রফতানি আয়ের প্রায় পুরোটাই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে, সেখানে কাস্টমস কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়া রফতানির ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করেছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একটি বড় দুর্ঘটনা। একটি প্রধান বিমানবন্দরে কার্গো আগুনে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক পণ্য পুড়ে যায়, যা সরাসরি রফতানি আয় কমিয়ে দেয়।

এ ছাড়া রফতানি প্রণোদনা প্রত্যাহার, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে বাংলাদেশের ঐতিহ্যগত মূল্য সুবিধা অনেকটাই ক্ষয়ে যাচ্ছে।

বছরের শুরুতে রফতানি ভালো থাকলেও গত চার মাসে তা অনেকটাই কমে গেছে বলে জানান ড. জাহিদ হোসেন। তার মতে, এর বড় কারণ বৈশ্বিক। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আমলের শুল্কনীতি নতুন করে সক্রিয় হওয়া।

জাহিদের কথায়, এখানে সরকারের তেমন কিছু করার নেই, যদিও বাণিজ্য সহজীকরণে সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগ তিনি ইতিবাচক বলেই মনে করেন।

নতুন করে চাপে পড়েছে রফতানিমুখী শিল্প

যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত শুল্ক, আর্থিক দুর্বলতা এবং ব্যবস্থাপনার নানা সংকটে এসব খাতের সঙ্গে যুক্ত ব্যাকওয়ার্ড ও ফরোয়ার্ড লিংকেজ শিল্পগুলোও বিপাকে পড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থানে।

আনুষ্ঠানিক খাতে কাজ হারানো অনেক মানুষ বাধ্য হয়ে অনানুষ্ঠানিক পেশায় ঝুঁকছেন। ব্যাটারিচালিত রিকশা বা মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ারিং চালকের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যাওয়াকেও শ্রমবাজারের চাপের একটি লক্ষণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

বিদায়ী বছরে বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর কারখানা বন্ধ ও ছাঁটাই পরিস্থিতিকে আরও ঘনীভূত করেছে। গত সেপ্টেম্বরে নাসা গ্রুপ আর্থিক সংকটে ঢাকা, গাজীপুর, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে তাদের ১৬টি কারখানা বন্ধ করে দেয়। এতে সাড়ে ১২ হাজারের বেশি শ্রমিক চাকরি হারান। একইভাবে বেক্সিমকো গ্রুপেও হাজার হাজার শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে, কার্যাদেশ না থাকার অজুহাতে।

কারখানা বন্ধ ও শ্রমিকদের বকেয়া বেতন পরিশোধে এবার সরকার আগের চেয়ে কঠোর ভূমিকা নেয়। শ্রমিকদের পাওনা না দিয়ে দেশত্যাগকারী মালিকদের বিরুদ্ধে প্রথমবারের মতো ইন্টারপোল রেড নোটিশ জারির উদ্যোগ নেওয়া হয়। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বেক্সিমকো ও নাসাসহ ১১টি কোম্পানির শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধে সরকার সুদমুক্ত ঋণ দিয়েছে, যার ফলে প্রায় ৫০ হাজার শ্রমিক তাদের প্রাপ্য টাকা পেয়েছেন।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ তাৎক্ষণিকভাবে শ্রমিকদের কিছুটা স্বস্তি দিলেও সংকটের মূল সমাধান নয়। কারখানা বন্ধ হওয়ার আগেই সমন্বিত নীতি ও আগাম হস্তক্ষেপ জরুরি ছিল।

বিনিয়োগে স্থবিরতা কর্মসংস্থান সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২০২৫ সালের অক্টোবরে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। ব্যবসা সম্প্রসারণ না হওয়া এবং নতুন যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগ কমে যাওয়াই এর বড় কারণ।

গতিশীল রফতানি খাত গতি হারালো

২০২৫ সালে বাংলাদেশের রফতানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প (আরএমজি), স্পষ্টভাবেই গতি হারিয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশের মোট রফতানি আয় ছিল ৩৫ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৮ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে— যা ছিল ৭ দশমিক ২৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি।

কিন্তু ২০২৫ সালে জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত রফতানি আয় দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার। এই সময়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ, যেখানে ২০২৪ সালের একই সময়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ২৩ শতাংশ। অর্থাৎ পুরো বছর বিবেচনায় নিলেও ২০২৫ সালে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি আগের বছরের ধারা ধরে রাখতে পারবে না বলেই ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

২০২৪ সালের সমপরিমাণ রফতানি আয় অর্জন করতে হলে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে অন্তত ২ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রফতানি প্রয়োজন। আর ৭ দশমিক ২৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে ডিসেম্বরেই রপ্তানি করতে হবে প্রায় ৫ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার— যা বাস্তবসম্মত নয় বলেই মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল জানিয়েছেন, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি গতিবেগ কমেছে। জানুয়ারি-নভেম্বর পর্যন্ত রপ্তানি ৩৫.৫৯ বিলিয়ন ডলারে সীমাবদ্ধ থেকে, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কেবল ২.৫৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ পুরো বছর বিবেচনায় নিলেও ২০২৫ সালে রফতানি প্রবৃদ্ধি হয়তো আগের বছরের ধারা ধরে রাখতে পারবে না।

রুবেল বলেন, মার্কিন বাজার থেকে শুল্ক হুমকি, অর্ডার স্থগিত, রাজনৈতিক অস্থিরতা, শ্রমবিরোধ, কারখানা ও কাস্টমস হাউস বন্ধ এবং বিমানবন্দরের কার্গো আগুনের মতো ঘটনার প্রভাব রপ্তানি বৃদ্ধিকে ব্যাহত করেছে। এছাড়া উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সীমিত পণ্য বৈচিত্র্য বাংলাদেশের প্রতিযোগিতাকে কমিয়ে দিয়েছে।

হঠাৎ ব্যাংক ঋণে ঝুঁকছে সরকার

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে তফসিলি ব্যাংকগুলো থেকে সরকারের নিট ঋণ ছিল মাত্র ৯ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। কিন্তু নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই সেই অঙ্ক লাফিয়ে বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩ হাজার ৫৪২ কোটি টাকায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র সাড়ে পাঁচ মাসেই প্রাথমিক বাজেটে নির্ধারিত অভ্যন্তরীণ ঋণ লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৪৩ শতাংশ ব্যবহার হয়ে গেছে।

সুদের চাপ ও ‘ক্রাউডিং আউট’ আশঙ্কা

ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, সরকারের ব্যাংক ঋণ বাড়লে তারল্য সংকট তীব্র হবে এবং সুদের হার আরও বাড়বে। নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, সরকার যখনই ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেয়, তখন বেসরকারি খাতই সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ে।

তার ভাষায়, “তাৎক্ষণিক প্রভাব না পড়লেও এর সুদূরপ্রসারী ফল হবে। ব্যাংকে তারল্য কমলে ব্যবসা সংকটে পড়বে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন ঋণ নেওয়ার আগ্রহ আরও কমে যাবে।”

বেসরকারি ঋণে চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৬ দশমিক ২৩ শতাংশে— গত চার বছরের মধ্যে যা সর্বনিম্ন। সেপ্টেম্বরে এই হার ছিল ৬ দশমিক ২৯ শতাংশ।

অথচ চলতি অর্থবছরে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ছিল বেসরকারি খাতে ৭ দশমিক ২ শতাংশ ঋণ প্রবৃদ্ধি অর্জন। বাস্তবে তার চেয়ে অনেক নিচে অবস্থান করায় বিনিয়োগ কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

বিদেশি বিনিয়োগ কমলো পুঁজিবাজারে

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর মাসে তালিকাভুক্ত শেয়ারে নিট বিদেশি বিনিয়োগ ৬৬ মিলিয়ন ডলার কমেছে। অর্থাৎ এই সময়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কেনার চেয়ে বিক্রি করেছেন বেশি। তুলনায়, আগের অর্থবছরের একই সময়ে বিদেশি বিনিয়োগ কমে মাত্র ৯ মিলিয়ন ডলার।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা নয়, দেশের আর্থিক খাতের কিছু সমস্যা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থাহীনতা সৃষ্টি করেছে। ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, কিছু ব্যাংকের সমস্যার প্রভাব অন্য ব্যাংকেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে মাত্র চার থেকে পাঁচটি ব্যাংক তুলনামূলক স্থিতিশীল, বাকি ব্যাংকগুলো নানা ধরনের চাপে রয়েছে।

তিনি আরও জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক পাঁচটি তালিকাভুক্ত ব্যাংক একীভূত করছে এবং নয়টি ব্যাংকের লিকুইডেশন প্রক্রিয়া চলছে, যার মধ্যে আটটি তালিকাভুক্ত ব্যাংক। এসব ঘটনাও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

শেয়ার বাজার দরপতনের বৃত্তেই কাটল ২০২৫

২০২৫ সালটি বাংলাদেশের শেয়ার বাজারের জন্য টিকে থাকার বছর হিসেবে মনে হলো। বছরের শুরুতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৫২১৬ পয়েন্টে যাত্রা শুরু করলেও ৩০ ডিসেম্বর তা দাঁড়িয়েছে ৪৮৬৫ পয়েন্টে, অর্থাৎ বছরজুড়ে প্রায় ৭ শতাংশ হারিয়েছে। বছরের মধ্যে ২৯ মে সূচক নেমে গিয়েছিল ৪৫৮৮ পয়েন্টে, আবার ৮ সেপ্টেম্বর অল্প সময়ের জন্য ৫৬৭৪ পয়েন্ট অতিক্রম করলেও টেকসই হয়নি।

বাজার বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার অবসান, ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের অনুপস্থিতি ও কাঠামোগত সংস্কারের ধীরগতি বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারেনি।

২০২৫ সালে কিছু সংস্কার হয়েছে—মিউচুয়াল ফান্ড ও মার্জিন ঋণের নতুন নীতিমালা, নগদ লভ্যাংশ বিতরণ সহজীকরণ এবং বিও ফি কমানো। তবে এর সঙ্গে মার্জিন ঋণের পরিবর্তনের কারণে বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করতে বাধ্য হন, যা দরপতন ত্বরান্বিত করেছে।

আর্থিক খাতের দুর্বলতা সবচেয়ে বড় আঘাত দিয়েছে। পাঁচটি ব্যাংক একীভূতকরণের মধ্যে, আর নয়টি ব্যাংকের মধ্যে আটটি কার্যত বন্ধের পথে। এসব প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষতি প্রায় ৫৫০০ কোটি টাকা। বিনিয়োগকারীদের আস্থার ঘাটতিও তীব্র হয়েছে।

বাজারে নতুন শেয়ার না আসার কারণে পরিস্থিতি আরও চাপের। পুরো বছরে একটিও আইপিও হয়নি, ফলে বিনিয়োগকারীরা দুর্বল শেয়ারে আটকে থাকেন।

নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো সক্রিয় থাকলেও বাজারে আস্থা ফেরানো যায়নি। তবে আগামী জাতীয় নির্বাচন ও নতুন পাবলিক ইস্যু নীতিমালা বাজারে আস্থা ফেরাতে সহায়ক হতে পারে।

উল্লেখ্য, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট, আমদানি নিয়ন্ত্রণ ও প্রকৃত আয় হ্রাস— এই চার চ্যালেঞ্জ নিয়ে ২০২৪ সাল পার করেছিল বাংলাদেশের অর্থনীতি। তবে ২০২৫ সালে এসে ধীরে ধীরে সেই চাপ কমতে শুরু করেছে। মূল্যস্ফীতি নিম্নমুখী, রিজার্ভ পুনরুদ্ধার, প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানে গতি এবং শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে প্রবৃদ্ধি—সব মিলিয়ে ২০২৫ সালকে অর্থনীতির ‘স্থিতিশীলতার দিকে প্রত্যাবর্তনের বছর’ হিসেবে দেখছে অন্তর্বর্তী সরকার।

আইএমএফের ভরসায় কিছুটা স্বস্তি

আগের সরকারের সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার ছিল আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কর্মসূচি বহাল রাখা। কারণ আইএমএফের ছাড়পত্র ছাড়া বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে বাজেট সহায়তা পাওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ত। এ লক্ষ্য অর্জনে সরকার বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চালু, রাজস্ব আদায় বাড়ানো এবং ভর্তুকি ও ব্যয়ে কড়াকড়ির মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়।

এই ইস্যুতে সরকারের সঙ্গে আইএমএফের দরকষাকষি ছিল দীর্ঘ ও চাপপূর্ণ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে কর্মবিরতি, ভ্যাট বৃদ্ধির প্রতিবাদে ব্যবসায়ীদের আন্দোলন— সব মিলিয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ে। শেষ পর্যন্ত মে মাসে সমঝোতা হয় এবং জুনে আইএমএফসহ বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলো থেকে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার সহায়তা আসে। এই অর্থনীতিক ‘অক্সিজেনেই’ পরিস্থিতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে।

রিজার্ভ ও ডলার বাজারে স্বস্তি

একসময় প্রতিদিন উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠা ডলারের বিনিময় হার এখন তুলনামূলক স্থিতিশীল। ডলারপ্রতি টাকার দাম ঘোরাফেরা করছে ১২০-১২২ টাকার মধ্যে। বৈদেশিক মুদ্রার মোট রিজার্ভ এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলারে।

চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে বৈদেশিক লেনদেনে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি উদ্বৃত্ত হয়েছে, যেখানে আগের বছর একই সময়ে ঘাটতি ছিল ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার।

প্রবাসী আয় ও বিদেশে কর্মসংস্থান

২০২৫ অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে পাঁচ লাখ কর্মীর বৈদেশিক নিয়োগ নিশ্চিত হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৩ লাখ ৯৭ হাজার। একই সময়ে দেশে এসেছে ১৩ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স— গত বছরের তুলনায় ১৭ দশমিক ১৪ শতাংশ বেশি। উৎস: বাংলা ট্রিবিউন।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়