শিরোনাম
◈ তাবলিগের শীর্ষ মুরুব্বি মাওলানা ফারুকের ইন্তেকাল ◈ আরও ১৭১ খেলোয়াড় ক্রীড়া কার্ড পেলেন ◈ ওয়াশিংটনের দাবিকে ‘অবাস্তব’ আখ্যা, আলোচনায় না যাওয়ার ঘোষণা ইরানের ◈ যে জেলায় আগের দামেই মিলছে জ্বালানি তেল! ◈ ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন শেয়ার করায় গ্রেফতারের পর কারাগারে, সংসদে হাসনাত ও চিফ হুইপের মধ্যে বিতর্ক ◈ জোট শরিকরা সংরক্ষিত নারী আসনে কে কতটি পেল জামায়াত থেকে ◈ বিদ্যুৎ খাতে ৫২ হাজার কোটি টাকা বকেয়া, ঋণের বোঝা দেড় লাখ কোটি: সংসদে জ্বালানিমন্ত্রী ◈ বাসে ৬৪ শতাংশ, লঞ্চ ভাড়া দেড়গুণ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব ◈ ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনার জন্য ইসলামাবাদে পৌঁছাল মার্কিন দল ◈ সোমবার বগুড়ায় যাত্রা, ‘ই-বেইল বন্ড’ চালুর ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর

প্রকাশিত : ১৯ এপ্রিল, ২০২৬, ০৭:২৯ বিকাল
আপডেট : ২০ এপ্রিল, ২০২৬, ০৩:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

নানামুখী অপরাধের হটস্পট হয়ে উঠেছে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকা!

সহযোগীদের খবর: অপরাধের হটস্পট মোহাম্মদপুর। একের পর এক অঘটন রীতিমতো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও ভাবিয়ে তুলেছে। ৫ই আগস্টের পট পরিবর্তনের পর এই এলাকায় হত্যা, হামলা, ছিনতাইসহ নানা অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। সর্বশেষ গত কয়েক সপ্তাহে প্রকাশ্যে কুপিয়ে একাধিক হত্যা, কিশোর গ্যাংয়ের দ্বন্দ্ব, মাদক কারবারি, ধারালো অস্ত্রের মুখে একের পর এক ছিনতাইয়ের ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে এই এলাকা। সূত্র: মানবজমিন প্রতিবেদন

স্থানীয়রা জানান, গাংচিল, কব্জি কাটা আনোয়ার, পাটালি গ্রুপ, বাদল, লও ঠেলা, আরমান-শাহরুখ, লাড়া দে, লাল বাহিনী, বিরিয়ানি সুমন গ্রুপ, আকাশ গ্রুপ, দে ধাক্কা, বেলচা মনির, ডায়মন্ড, গ্রুপ টুয়েন্টি ফাইভ, মুরগি গ্রুপ, টুন্ডা বাবু, কালা রাসেল, ল্যাংড়া হাসানসহ পুরো মোহাম্মদপুর এলাকায় অন্তত ২০ থেকে ২৫টা কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এরা নিজেরা আবার স্থানীয়ভাবে একাধিক গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করে।

বিশেষ করে মোহাম্মদপুর তিন রাস্তার মোড়, বুদ্ধিজীবী কবরস্থান, চাঁদ উদ্যান, লাউতলা, নবীনগর হাউজিং, বসিলা চল্লিশ ফিট, কাঁটাসুর, তুরাগ হাউজিং, আক্কাস নগর, ঢাকা উদ্যান নদীর পাড়, চন্দ্রিমা হাউজিং, আদাবর, শেখেরটেক, মনসুরাবাদ, রায়ের বাজারসহ আশপাশের এলাকায় এসব গ্রুপের সদস্যরা প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্রের মহড়া দেয়। যা খুশি তাই করে। দিনের আলোতে সকলের সামনেই ধারালো অস্ত্রের মুখে মানুষকে জিম্মি করে সব কেড়ে নেয় তারা। এরা এতটাই হিংস্র যে, মানুষের জীবন নিতে পর্যন্ত একবার ভাবে না।

সম্প্রতি মোহাম্মদপুরের রায়ের বাজার বেড়িবাঁধ এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই কিশোর গ্যাংয়ের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। ওই সময় এলেক্স গ্রুপের প্রধান ইমন হোসেন ওরফে এলেক্স ইমনকে প্রকাশ্যে রাস্তায় ফেলে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে আরমান-শারুখ গ্রুপ নামে আরেক কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। এই ঘটনায় বেশ কয়েকজনকে আটক করে রিমান্ডে নেয়া হলেও পুরো এলাকায় এখনো আতঙ্ক বিরাজ করছে।

গোয়েন্দা তথ্য বলছে, হত্যার শিকার এলেক্স ইমনের বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর, ধানমণ্ডি ও হাজারীবাগ থানায় হত্যা, মাদক, চাঁদাবাজি, ছিনতাইসহ ১৮টি মামলা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে রায়ের বাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের ১ নম্বর গেট সংলগ্ন এলাকার ভ্রাম্যমাণ দোকান, অটোরিকশার গ্যারেজ, নার্সারি থেকে চাঁদা তোলার পাশাপাশি পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রণ করতো এই এলেক্স ইমন গ্রুপ।

অন্যদিকে রায়ের বাজার ২ নম্বর গলি থেকে কাঁচাবাজার পর্যন্ত এলাকায় নিয়ন্ত্রণ করে আরমান-শাহরুখ নামের আরেক কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। তাদের নামেও বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। এই দুই গ্রুপই আবার মোহাম্মদপুর এলাকার শীর্ষ দুই সন্ত্রাসীর হয়ে কাজ করে। ঘটনার দিন সকালেও ছিনতাই হওয়া একটি মোবাইল ফোনের ভাগাভাগি নিয়ে কামরাঙ্গীরচর এলাকায় এই দুই কিশোর গ্যাংয়ের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।

গত ১৫ই এপ্রিল রাতে রায়ের বাজার বেড়িবাঁধ এলাকার সাদেক খান পাম্পসংলগ্ন ইটখোলা এলাকায় আসাদুল ইসলাম ওরফে লম্বু আসাদুলকে ডেকে নিয়ে কুপিয়ে ও ছুরিকাঘাতে হত্যার পর লাশ রাস্তার উপর ফেলে রাখা হয়। ওই ঘটনাতেও অন্তত ৬ জনকে আটক করা হয়েছে। আসাদুল ইসলামের বাবা আব্দুল জলিল বলেন, ওইদিন রাতে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু অলিল তাকে বাসা থেকে ফোনে ডেকে নিয়ে যায়। অনেকক্ষণ পর আমি আসাদুলকে ফোন দিই। সে তখন আমাকে বলে, আমার আসতে একটু দেরি হবে। এর ঠিক ২-৩ ঘণ্টা পর আমরা খবর পাই, আসাদুলকে কারা যেন কুপিয়ে হত্যা করে।

অশ্রুসিক্ত হয়ে তিনি বলেন, ছেলের মৃত্যুর পরও আমরা ভয়ে সেখানে যেতে পারিনি। পরে পুলিশকে খবর দিলে ঘটনাস্থলে পুলিশ গিয়ে তার লাশ উদ্ধার করে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে যায়। মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ বলছে, বেড়িবাঁধ সাদেক খান পাম্প এলাকার কিশোর গ্যাং ‘চার্লি গ্রুপের’ মূলহোতা ছিল নিহত আসাদুল। তার নামেও থানায় বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে। স্থানীয় আরেক কিশোর গ্যাং লিডার আক্তার এই আসাদুলের কাছ থেকে কোনো টাকা না দিয়ে মাদক নিয়ে যেতো। মূলত এই মাদক নিয়েই আসাদুলের সঙ্গে আক্তার ও ওসমানের মধ্যে শত্রুতা শুরু হয়।

আসাদুল বাহিনী আক্তার গ্রুপের সদস্যদের একজনকে কুপিয়েও আহত করে। এর জেরে এই হত্যাকাণ্ড। এদিকে আসাদুল হত্যার ঠিক আগের দিন রাতে মোহাম্মদপুরের নুর জাহান রোড এলাকায় নিজ বাসার সামনে ধারালো অস্ত্রের মুখে ক্যামেরাসহ নিজের সবকিছু খুইয়েছেন জুলাই জাদুঘরের ফটোগ্রাফার সাঈদ হাসান তানিম। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহতও হয়েছেন তিনি।

এর আগে গত ৭ই মার্চ রাত সাড়ে ১০টার দিকে মোহাম্মদপুর রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের পাশ দিয়ে হাঁটাহাঁটির সময় শহীদ ফাইয়াজ চত্বর এলাকায় ছিনতাইয়ের শিকার হন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মহাপরিচালক (অনুসন্ধান ও তদন্ত-২) মোতাহার হোসেন। ছিনতাইকারীরা ধারালো অস্ত্রের মুখে তার আইফোন, মানিব্যাগ ও ঘড়ি ছিনিয়ে নেয়। আইফোনের পাসওয়ার্ড দিতে না চাওয়ায় সামুরাইয়ের উল্টো দিক দিয়ে আঘাত করে ও বাম চোখে ঘুষি মেরে তাকে জখম করে ছিনতাইকারীরা। পরে তাকে হাসপতালে ভর্তি করা হয়।

গত ২২শে ফেব্রুয়ারি রাত ৯টায় মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডের ময়ূর ভিলার পাশের ঢালে একটি চা দোকানে বোরকা পরে এসে ইব্রাহিম নামে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক সমন্বয়ককে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে দুর্বৃত্তরা।
শুধু প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা বা ছিনতাই নয় প্রতিনিয়ত চাঁদা দাবিও করা হচ্ছে এলাকাটির ব্যাবসায়ী থেকে ফুটপাথের দোকানি পর্যন্ত। গত ১৯শে ফেব্রুয়ারি ফারুক দলবল নিয়ে বছিলা সিটি ডেভেলপার্স এলাকায় গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবসায়ী শাহিনের দোকানে গিয়ে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন মো. ফারুক। চাঁদা না দেয়ায় দোকানের এক কর্মচারীকে বৈদ্যুতিক শক দেয় ফারুক ও তার দলবল। ওই দিনই ফারুকের লোকজন বছিলা সড়কের একেপিচ টাওয়ার মার্কেটের নিচতলা ও দোতলার সব দোকান বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। ঘটনার পর আতঙ্কে দোকান বন্ধ রাখেন ব্যবসায়ীরা।

শুধু মার্কেট নয় চাঁদার জন্য মোহাম্মদপুরের আবাসন ব্যাবসায়ী মনিরুল ইসলামের শেরশাহ শূরী রোডে ৭৫/বি নম্বর বাড়িতে ও অফিসে দুই দফা গুলি চালানো হয়। যা নিয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ পর্যন্ত দেয়া হয়েছে। চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে সর্বশেষ গত ২১শে ফেব্রুয়ারি থানা ঘেরাও করেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও জনতা। একইসঙ্গে বসিলা, চাঁদ উদ্যান ও আদাবর এলাকায় চাঁদাবাজি এবং গণছিনতাই প্রতিরোধের দাবি তুলে তারা থানা ঘেরাওয়ের পাশাপাশি সড়ক অবরোধ করেন।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপি’র মোহাম্মদপুর জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) জুয়েল রানা বলেন, গত এক বছরে বিভিন্ন অপরাধে অন্তত তিন হাজার গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে এরা জামিনে বের হয়ে আবারো অপরাধে জড়ায়। তবে আগের চেয়ে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। আমরা আরও ভালো করার চেষ্টা করছি।

বিষয়টি নিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপি’র তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. ইবনে মিজান বলেন, মোহাম্মদপুরে বেশ কয়কটি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। যখন যে গ্রুপের সদস্যদের আইনের আওতায় আনা হয়, তখন কিছুদিন সেই গ্রুপের কর্মকাণ্ড একটু কম থাকে। ওই সময় আবার নতুন নামে আরেকটি গ্রুপ মাথাচাড়া দেয়। তবে আমরা এই গ্যাং কালচারকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চালাচ্ছি। অপরাধের পরপরই অভিযুক্তদেরকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে।

মোহাম্মদপুর এলাকাকে দীর্ঘদিনের অপরাধপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে উল্লেখ করে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির বলেছেন, ১৯৮৬ সালে তিনি নিজেও মোহাম্মদপুর এলাকায় ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছিলেন। তিনি বলেন, মোহাম্মদপুর এলাকার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ নজরদারি ও অভিযান জোরদার করা হয়েছে। কিশোর গ্যাং, ছিনতাই ও মাদকবিরোধী টহল অব্যাহত রয়েছে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, প্রথমত কিশোর অপরাধের লাগাম টানতে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি তাদের সমাজে পুনর্বাসনের সুযোগ করে দিতে হবে। আর এই কিশোর অপরাধীদের যারা পৃষ্ঠপোষকতা করছে তাদেরও যথাযথ আইনের আওতায় আনতে হবে।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়