সরওয়ার আজম মানিক, কক্সবাজার : কক্সবাজারের প্রাণ বাঁকখালী নদী এখন দখল ও দূষণে অস্তিত্ব সংকটে। একসময়কার খরস্রোতা এ নদী হারাচ্ছে স্বাভাবিক প্রবাহ, মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য। নদীর দুই তীর দখল, প্যারাবন নিধন, পৌরসভার বর্জ্য ও হোটেল-মোটেলের আবর্জনায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে নদীর পরিবেশ। এ অবস্থায় বাঁকখালী রক্ষায় দ্রুত হাইকোর্টের রায় বাস্তবায়ন, নদীর সীমানা নির্ধারণ, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং নৌযান মেরামতের ডকইয়ার্ড অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন পরিবেশবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
বুধবার (৪ নভেম্বর) কক্সবাজার শহরের হোটেল সি প্যালেসে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) আয়োজিত ‘দখল ও দূষণে বিপর্যস্ত বাঁকখালী নদী: আমাদের করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব দাবি জানানো হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও বেলার লিগ্যাল কো-অর্ডিনেটর এস. হাসানুল বান্না। বক্তব্য রাখেন, কক্সবাজারের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামাণিক, পৌরসভার প্রকৌশলী পরক্রম চাকমা, পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী আতিকুর রহমান ও সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মশিউর রহমান।
মূল প্রবন্ধে এস. হাসানুল বান্না বলেন, বেলার দায়ের করা জনস্বার্থমূলক রিট মামলা (নং ৮৩২৫/২০১৪)-এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ২৪ আগস্ট হাইকোর্ট বাঁকখালী নদীকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণাসহ অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণের নির্দেশ দিয়েছেন। নদীর বর্তমান প্রবাহ অনুযায়ী আরএস ও বিএস জরিপে সীমানা নির্ধারণ, দখলদারদের তালিকা তৈরি করে উচ্ছেদ, নদী এলাকায় দেওয়া সব ইজারা বাতিল এবং ভবিষ্যতে ইজারা না দেওয়ার নির্দেশনাও রয়েছে। পাশাপাশি নদীর দুই তীরে ম্যানগ্রোভ বন ফিরিয়ে আনা এবং প্রতি ছয় মাস পরপর আদালতে অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বক্তারা বলেন, প্রায় ৬৯ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁকখালী নদী একসময় কক্সবাজার থেকে টেকনাফ, মহেশখালী ও কুতুবদিয়ায় যাতায়াতের অন্যতম প্রধান নৌপথ ছিল। প্রাকৃতিক দুর্যোগে শত শত জাহাজ ও ট্রলার এ নদীতে আশ্রয় নিত। নদীর দুই পাশের প্যারাবন উপকূলকে ঝড়-জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা করত। একসময় ইলিশ, মহাশোল, চিংড়ি, বেলে, টেংরাসহ নানা প্রজাতির মাছ ও বিরল লাল কাঁকড়ার বিচরণ ছিল এ নদীতে। কিন্তু দখল-দূষণে এসব প্রাকৃতিক সম্পদ আজ বিলুপ্তির পথে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বক্তারা অভিযোগ করে বলা হয় ২০০৮ সাল থেকে কক্সবাজার পৌরসভা নদীতে বর্জ্য ফেলা শুরু করার পর দূষণ বাড়তে থাকে। পাশাপাশি নদীর দুই তীরের প্যারাবন কেটে প্লট তৈরি, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ, পাহাড় কাটার মাটি নদীতে পড়া এবং হোটেল-মোটেলের বর্জ্য ফেলার কারণে নদীর তলদেশ ভরাট হচ্ছে। রামু ও নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকায় নদীর পানি কমে গেলে বিভিন্ন স্থানে তামাক চাষও করা হচ্ছে। এতে নদীর পানি কৃষিকাজের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হচ্ছেন কৃষক ও মৎস্যজীবীরা।
বেলার দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ও ১ মার্চ প্রশাসনের অভিযানে নদীর তীর থেকে ৫৫০টি পাকা, আধাপাকা ও টিনশেড স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন আদালতে মামলা ও স্থিতাবস্থার আদেশের কারণে উচ্ছেদ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। অভিযোগ রয়েছে, উচ্ছেদের পর নতুন করে প্রায় দুই শতাধিক স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। কস্তুরাঘাটে খুরুশকুল ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় নদীর প্রায় ৫৪ একর জায়গা দখলের অভিযোগও রয়েছে। এ ছাড়া ২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিস ১৩৩ জন দখলদারের তালিকা তৈরি করলেও প্রভাবশালী অনেক দখলদারের নাম বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
সভায় জানানো হয়, বাঁকখালী নদী পুনরুজ্জীবিত, দখলমুক্ত ও দূষণমুক্ত করতে ৪৭ কোটি ৫০ লাখ ৮০ হাজার টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ থাকলেও নদী রক্ষা ও দখলমুক্ত করার কাজে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন বক্তারা।
আলোচনায় বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্টের (বিডব্লিউটিএ) কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেন, কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সহসভাপতি অ্যাডভোকেট রমিজ আহমেদ, বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ইসলাম মাহমুদ, ছায়ানীড়ের সভাপতি কল্লোল দে, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ কলিম, সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম নজরুল, আমরা কক্সবাজারবাসী সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দিন, মাছরাঙা টেলিভিশনের প্রতিনিধি সুনীল বড়ুয়া, ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াক) সাবেক সভাপতি এস এম কিবরিয়া, বিডিনিউজের প্রতিনিধি সৌরভ দে এবং প্রকৃতি ও জীবন ক্লাবের আহ্বায়ক মোহাম্মদ উর রহমান মাসুদসহ অন্যরা।
বক্তারা নদীর সীমানা নির্ধারণ করে সব অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ, দূষণের উৎস বন্ধ, ডকইয়ার্ড অন্যত্র স্থানান্তর, নদীর তীরের পাহাড় কাটা ও তামাক চাষ বন্ধ, রাবার ড্যাম অপসারণ এবং পরিকল্পিত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদীর গভীরতা ও নাব্যতা ফিরিয়ে আনার দাবি জানান। একই সঙ্গে নদীর দুই তীরে ম্যানগ্রোভ বন পুনরুদ্ধার এবং সব ধরনের ইজারা বাতিলের আহ্বান জানান তাঁরা।
বক্তারা বলেন, বাঁকখালী শুধু একটি নদী নয়, এটি কক্সবাজারের হৃদপিণ্ড। নদীটি হারিয়ে গেলে পর্যটননগরী কক্সবাজারের পরিবেশ, অর্থনীতি ও জনজীবন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি উচ্চ আদালতের নির্দেশনা কার্যকর করে নদীটিকে দখল ও দূষণমুক্ত করতে হবে।