মো. কামরুল ইসলাম, নবীনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি : ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে নিত্যপণ্যের চড়া দামে দিশেহারা ক্রেতারা। শীতের আগাম সবজির সরবরাহ থাকলেও কমছে না দাম। চাল, ডাল, ডিম, মাছ-মাংসসহ প্রায় সব নিত্যপণ্যের বাড়তি দামে চাপে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ। সংসারের খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন তাঁরা। অনেকেই প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার কিনতে পারছেন না। এ অবস্থায় বাজার মনিটরিং আরও জোরদারের দাবি জানিয়েছেন সাধারণ ক্রেতারা।
সম্প্রতি নবীনগর সদর বাজার ঘুরে দেখা গেছে, দোকানভেদে একই পণ্যের দামে রয়েছে পার্থক্য। করলা প্রতি কেজি ৮০ টাকা, বরবটি ৮০ থেকে ৯০ টাকা, ঝিঙা, চিচিঙ্গা ও কাঁকরোল ৮০ টাকা এবং ধুন্দুল ৫০ থেকে ৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শসা ৬০ থেকে ৭০ টাকা, পটল ৮০ টাকা, পেঁপে ৩৫ টাকা, টমেটো ১৩০ টাকা, গোল বেগুন ৮০ থেকে ৮৫ টাকা এবং লম্বা বেগুন ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া মিষ্টিকুমড়া ৩৫ থেকে ৪০ টাকা, ঢ্যাঁড়স ৮০ টাকা, কচুর ছড়া ৭০ টাকা, গাজর ১২০ টাকা ও মূলা ৭০ থেকে ৮০ টাকা কেজি। প্রতিটি লাউ ৮০ থেকে ৯০ টাকা এবং লেবুর হালি বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৭০ টাকায়।
চালের বাজারেও স্বস্তি নেই। মোটা চালের কেজি ৬০ টাকা, সরু চাল ৯০ টাকা এবং মসুর ডাল ১৬০ থেকে ১৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফার্মের ডিম প্রতি ডজন ১৫০ টাকা, প্রতি হালি ৫০ টাকা। ব্রয়লার মুরগির কেজি ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা এবং সোনালি মুরগি ৩৭০ থেকে ৩৮০ টাকা।
মাছের বাজারেও বেড়েছে খরচ। চাষের রুই ও কাতলা প্রতি কেজি ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা, বড় তেলাপিয়া ২৩০ থেকে ২৬০ টাকা এবং পাঙাশ ১৮০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চাষের চিংড়ির কেজি ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা এবং নদীর চিংড়ি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। ক্রেতাদের দাবি, এক সপ্তাহের ব্যবধানে বিভিন্ন ধরনের মাছের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। গরুর মাংস প্রতি কেজি ৭৫০ থেকে ৮৫০ টাকা এবং খাসির মাংস ১ হাজার ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বাজার করতে আসা এক নিম্ন আয়ের ক্রেতা ইব্রাহিম মিয়া বলেন, “প্রতিদিনের আয় দিয়ে চাল, ডাল ও সবজি কিনতেই বেশির ভাগ টাকা শেষ হয়ে যায়। মাছ-মাংস কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। আগে যে টাকায় কয়েক ধরনের সবজি কেনা যেত, এখন সেই টাকায় অল্প কিছু কিনেই বাড়ি ফিরতে হয়।”
এক মধ্যবিত্ত ক্রেতা আব্দুর রহিম বলেন, “বাড়িভাড়া, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও সংসারের অন্যান্য খরচ মেটানোর পর বাজারের জন্য বেশি টাকা থাকে না। এখন সবকিছুর দাম বেশি। প্রয়োজন থাকলেও অনেক কিছু কেনা সম্ভব হয় না। বাজারে নিয়মিত তদারকি হলে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো সম্ভব।”
দিনমজুর আমির মিয়ার ভাষ্য, “প্রতিদিন কাজ পাই না। কাজ পেলেও আয় সীমিত। সেই টাকায় সংসারের সব খরচ চালাতে হয়। বাজারে এসে দাম শুনে অনেক সময় প্রয়োজনীয় পণ্যও কম কিনতে হয়।”
অন্যদিকে খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, পাইকারি বাজারে বেশি দামে পণ্য কিনতে হওয়ায় খুচরা বাজারেও এর প্রভাব পড়ছে। পরিবহন খরচ, দোকানভাড়া ও পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। এক সবজি বিক্রেতা বলেন, “ক্রেতারা মনে করেন, বিক্রেতারা ইচ্ছামতো দাম বাড়ান। কিন্তু পাইকারি বাজার থেকে বেশি দামে সবজি কিনতে হয়। পরিবহন খরচও রয়েছে। পাইকারি বাজারে দাম কমলে খুচরা বাজারেও তার প্রভাব পড়বে।”
মাছ বিক্রেতা সুধাংশু দাস বলেন, “মাছের দাম বাড়লে বিক্রিও কমে যায়। বেশি দামে মাছ কিনে আনতে হলে খুচরা বাজারে দাম কিছুটা বেশি রাখতে হয়। অনেক ক্রেতা দাম শুনে মাছ না কিনেই ফিরে যান।”
বাজারে পণ্যের দামে ভিন্নতা ও মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে নিয়মিত মনিটরিং আরও জোরদারের দাবি জানিয়েছেন ক্রেতারা। তাঁদের মতে, দোকানে মূল্যতালিকা প্রদর্শন নিশ্চিত করার পাশাপাশি পাইকারি ও খুচরা বাজারের দামের ব্যবধান যাচাই করা প্রয়োজন। কেউ অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ালে বা ওজনে কারচুপি করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
শাহাবুদ্দিন নামে এক ক্রেতা বলেন, “প্রশাসন নিয়মিত বাজার মনিটরিং করছে, এটি ভালো উদ্যোগ। তবে তদারকি আরও জোরদার করতে হবে। একই পণ্য একেক দোকানে একেক দামে বিক্রি হচ্ছে কি না, তা দেখতে হবে। শুধু অভিযান চালালেই হবে না, নিয়মিত নজরদারি অব্যাহত রাখতে হবে।”
স্থানীয় ক্রেতাদের প্রত্যাশা, উপজেলা প্রশাসন, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগে বাজারে শৃঙ্খলা ফিরবে। পণ্যের সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এতে নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আসবে বলে আশা তাঁদের।