শিরোনাম
◈ মালয়েশিয়ায় ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী বিনা খরচে নিয়োগ, অনুমোদন পাচ্ছে ৩৩৮ এজেন ◈ সংরক্ষিত নারী আসনের উপনির্বাচন: শুক্রবার থেকে মনোনয়ন ফরম বিতরণ করবে বিএনপি ◈ কৃষিকে লাভজনক খাতে পরিণত করতে হবে, কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের আহ্বান রাষ্ট্রপতির ◈ গাজীপুরে স্বামীকে পাশের ঘরে আটকে গার্মেন্টসকর্মীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ ◈ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর যে জরুরি নির্দেশনা ◈ ভিনিসিউসের চার ম্যাচ নিষেধাজ্ঞা, এল ক্লাসিকোয় খেলতে পারবেন না ◈ বাংলাদেশের ১৬ হাজার কিলোমিটার নৌপথ সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না, কাজে লাগানোর আহ্বান নৌমন্ত্রীর ◈ আইএমএফের নতুন ঋণ পেতে শর্ত পূরণে রাজি বাংলাদেশ, যেসব বিষয়ে চলছে আলোচনা ◈ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে ঠিকাদারের হুমকি ‘এক থাপ্পড়ে ঠিক করে দেব’, জবাবে প্রকল্প পরিচালক বলেন ‘আমিও ছাত্রদলের নেতা ছিলাম' ◈ বলিউড অভিনেতা ইমরান খানকে কেন ভারত ছাড়তে বলা হলো, যা বললেন বিজেপির কিরিট সোমাইয়া

প্রকাশিত : ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ০৩:৫৩ দুপুর
আপডেট : ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ০৫:২৮ বিকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

চট্টগ্রামের অক্সিজেন মোড়ে ২২০০ কোটি টাকার নতুন উড়াল সড়ক, যানজট কমানো নিয়ে প্রশ্ন

অক্সিজেন মোড়ে নির্মিতব্য আরেকটি উড়াল সড়কের নকশা

চট্টগ্রাম নগরীর যানজট নিরসনে গত ১৫ বছরে পাঁচটি প্রকল্প হাতে নেয় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। এসব প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্নের মধ্যেই এবার অক্সিজেন মোড়ে প্রায় দুই হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে আরেকটি উড়াল সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, শুধু উড়াল সড়ক নির্মাণ নয়, সমন্বিত পরিবহন পরিকল্পনাই হতে পারে যানজট নিরসনের কার্যকর পথ।

নগরের বিভিন্ন এলাকায় নির্মিত উড়াল সড়কগুলোর কোথাও সংযোগ সড়ক ও র‌্যাম্পের ঘাটতি, কোথাও নিচের সড়কে যানজট, আবার কোথাও ব্যয় বৃদ্ধি ও দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। নগর পরিকল্পনাবিদদের অভিযোগ, এসব অবকাঠামো নির্মাণের ফলে বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) ও মাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) চালুর সুযোগও সংকুচিত হয়েছে। তাদের মতে, শুধু উড়াল সড়ক নির্মাণ করে যানজটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়; প্রয়োজন সমন্বিত সড়ক ও গণপরিবহন ব্যবস্থা।

এমন পরিস্থিতিতে নগরের উত্তর প্রবেশদ্বার অক্সিজেন মোড়ে নতুন উড়াল সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সিডিএ। গত বছরের জুলাইয়ে প্রকল্পটির নকশা ও বিস্তারিত প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরির কাজ শুরু হয়। শিগগিরই অনুমোদনের জন্য প্রকল্পটি মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর কথা রয়েছে।

প্রস্তাবিত উড়াল সড়কটি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের সঙ্গে যুক্ত হবে। এর একটি র‌্যাম্প বায়েজিদ থেকে হাটহাজারী সড়কের সঙ্গে এবং অন্যটি কুয়াইশ সড়কের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। হাটহাজারী সড়ক থেকে বায়েজিদ ও মুরাদপুরের দিকে দুটি র‌্যাম্প থাকবে। কুয়াইশ সড়কও সরাসরি বায়েজিদের সঙ্গে যুক্ত হবে। ছয় লেনের কুয়াইশ সড়ককে উড়াল সড়কের সঙ্গে সমন্বিত করা হবে। সব মিলিয়ে প্রকল্পটির দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ৭ দশমিক ৫ কিলোমিটার।

Advertisement

সিডিএর চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন গত সোমবার সমকালকে বলেন, ‘অক্সিজেনের উড়াল সড়ক প্রকল্পটি শিগগিরই মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। আমি আশা করি, জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে এটি দ্রুত অনুমোদন পাবে। অনুমোদনের পর কম সময়ের মধ্যে কাজ শুরু করব।’

আগের উড়াল সড়কগুলোর অভিজ্ঞতার পর নতুন প্রকল্পটি কতটা সুফল দেবে, জানতে চাইলে বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘শহরে ইট-কংক্রিটের জঞ্জাল কম করতে পারলে ভালো। তবে অক্সিজেন মোড়ের উড়াল সড়কটি সময়ের দাবি। এটা থেকে সাত সড়কে সাতটি র‌্যাম্প নামবে। এতে যান চলাচল সহজ হবে।’

বাস টার্মিনাল চালু হলে কমবে যানজট

অক্সিজেন মোড়ের যানজটের অন্যতম কারণ হিসেবে সড়কের পাশে উত্তর চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামগামী বাস এবং সিএনজিচালিত অটোরিকশার স্ট্যান্ডকে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এসব স্ট্যান্ড থেকে যাত্রী ওঠানামা এবং সড়কের পাশে যানবাহন দাঁড়িয়ে থাকার কারণে মোড়ে যান চলাচল ব্যাহত হয়।

চট্টগ্রাম নগরের কুলগাঁও বালুচরা সিটি করপোরেশন বাস টার্মিনালটি চলতি মাসে চালু হওয়ার কথা রয়েছে। এটি চালু হলে উত্তর চট্টগ্রামগামী বাসগুলো টার্মিনালে স্থানান্তর করা সম্ভব হবে। ফলে অক্সিজেন মোড়ের যানজট এমনিতেই কমে আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক সুবীর মহাজন প্রতিদিন অক্সিজেন মোড় দিয়ে যাতায়াত করেন। তিনি বলেন, অক্সিজেন মোড়ে উত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকার অর্ধডজন বাসের স্ট্যান্ড গড়ে উঠেছে। গড়ে উঠেছে একাধিক সিএনজি অটোরিকশার স্ট্যান্ড। সড়কের পাশে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে বাস-অটোরিকশার যাত্রী তোলার কারণেই সেখানে বেশি যানজট হয়। তাই উড়াল সড়ক নির্মাণ নয়, মোড় থেকে যানবাহনের অবৈধ স্ট্যান্ড সরালে অর্ধেক যানজট কমে যাবে।

চট্টগ্রাম জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ও পরিবহন নেতা মোহাম্মদ শাহজাহানও বাস ও অটোরিকশার স্ট্যান্ডকে যানজটের অন্যতম কারণ বলে মনে করেন। তিনি বলেন, বাস-অটোরিকশা স্ট্যান্ডের কারণে মোড়ে যানজট হয়, এটা অস্বীকার করা যাবে না। তবে উত্তর চট্টগ্রামের যানবাহনের জন্য কুলগাঁও বালুচরা বাস টার্মিনালটি চলতি মাসেই উদ্বোধন ও পুরোদমে চালু হওয়ার কথা রয়েছে। সেটি চালু হলে সব বাস টার্মিনালে চলে যাবে, এরপর অক্সিজেন মোড়ে যানজট থাকার কথা নয়।’

কুলগাঁও বাস টার্মিনাল চালু হলে যানজট কমতে পারে– এমন যুক্তির বিষয়ে সিডিএ চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন বলেন, এটা ঠিক। তবে উড়াল সড়ক প্রকল্পটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। সব দিক বিবেচনা করে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।

বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারের নিচে যানবাহন বেশি

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সিডিএ পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে চারটি উড়াল সড়ক এবং লালখানবাজার থেকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করে। উড়াল সড়কগুলো হলো বহদ্দারহাট, মুরাদপুর-লালখানবাজার, কদমতলী-ধনিয়ালাপাড়া ও দেওয়ানহাট। এসব অবকাঠামোর কোনোটিতে নির্দিষ্ট পথে যান চলাচল সহজ হলেও সামগ্রিক কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

চার হাজার ৩৬৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে প্রথমে ১৫টি র‌্যাম্প নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। পরে ছয়টি র‌্যাম্প বাদ দেওয়া হয়। বাকি র‌্যাম্পগুলোর কাজ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা।

২০১৪ সালে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের ‘স্টেট অব দ্য সিটিজ: গভর্ন্যান্স ফর আ লিভেবল চিটাগং’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারের কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যস্ত সময়ে ফ্লাইওভারের নিচ দিয়ে চলাচলকারী যানবাহনের সংখ্যা ওপর দিয়ে চলাচলকারী যানবাহনের তুলনায় ৩ দশমিক ৮৫ গুণ ছিল।

পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদরা ২০১৫ সালে মুরাদপুর-লালখানবাজার ফ্লাইওভার নির্মাণের সময় আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, এ ধরনের অবকাঠামো গণপরিবহনের বিকল্প ব্যবস্থা চালুর সুযোগ সীমিত এবং নিচের সড়কের জায়গা সংকুচিত করতে পারে। ২০১৮ সালে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের সময়ও সংগঠনটি যানজট কমাতে ফ্লাইওভারের পরিবর্তে গণপরিবহন ও পথচারীবান্ধব ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের দাবি, বর্তমানে এসব উড়াল সড়ক দিয়ে নগরের মাত্র ২ শতাংশ যানবাহন চলাচল করে।

সমন্বিত পরিকল্পনার ওপর জোর

পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সহসভাপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া বলেন, অক্সিজেন মোড়ের প্রস্তাবিত উড়াল সড়কও আগের প্রকল্পগুলোর মতো অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে। এ প্রকল্পের আগে কয়েকটি বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি।

সুভাষ বড়ুয়া বলেন, কোন দিক থেকে কত যানবাহন আসে এবং কোন দিকে যায়, সে বিষয়ে হালনাগাদ ট্রাফিক সমীক্ষা প্রয়োজন। র‌্যাম্পগুলোর অবস্থান এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে, যাতে বায়েজিদ, হাটহাজারী, মুরাদপুর ও কুয়াইশমুখী যানবাহনের চলাচল নির্বিঘ্ন থাকে। পাশাপাশি নিচের সড়কে বাস ও অটোরিকশার যাত্রী ওঠানামা, পার্কিং এবং পথচারীদের নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ফুটপাত, সাইকেল চলাচল ও গণপরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। তিনি বলেন, উড়াল সড়ক থেকে যানবাহন নেমে যদি সামনে এগোতে না পারে, তাহলে নিচের গোটা সড়ক অকার্যকর হয়ে পড়বে।

সুভাষ বড়ুয়া উদ্বেগ জানিয়ে আরও বলেন, মুরাদপুর-লালখানবাজার ফ্লাইওভার ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কারণে নগরে বিআরটি ও এমআরটি চালুর সুযোগ সংকুচিত হয়ে গেছে। শহরের সবচেয়ে বড় রিসোর্স হলো ভূমি। সেটাকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ব্যবহার করা না গেলে শহর অকার্যকর হয়ে পড়ে।

সব মিলিয়ে অক্সিজেন মোড়ের যানজট নিরসনে নতুন উড়াল সড়ক নির্মাণের আগে বিদ্যমান যানবাহনের চাপ, বাস টার্মিনালের সম্ভাব্য প্রভাব এবং গণপরিবহন ও পথচারীদের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো বিবেচনায় নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। 

  • সর্বশেষ