মনিরুল ইসলাম : বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান আইন ও নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন, নিয়মিত পরিবীক্ষণ, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা এবং নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিতসহ ১৫ দফা দাবি জানিয়েছে যুব ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তারা বলেছেন, বায়ুদূষণ এখন জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও পরিবেশগত ন্যায়বিচারের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে; পরিষ্কার বায়ু কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার।
আজ মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘ব্রিদ কোলিশন’ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরা হয়। ‘ব্রিদিং ইন দ্য গ্রে: ফ্রম পলিসি গ্যাপস টু পাবলিক অ্যাকশন ফর ক্লিন এয়ার’ শীর্ষক এ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন সূর্যোদয় ইয়ুথ সোসাইটির পরিচালক রায়হান নোমান নূরনবী। সঞ্চালনা করেন সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নিখিল চন্দ্র ভদ্র।
সংবাদ সম্মেলনে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন সেন্টার ফর অ্যাটমোসফেরিক পলিউশন স্টাডিজ (ক্যাপস)-এর পরিচালক অধ্যাপক ড. আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার। তিনি বলেন, বায়ুদূষণ একটি অদৃশ্য কিন্তু প্রাণঘাতী সংকট, যার কারণে বাংলাদেশে মানুষের গড় আয়ু প্রায় ৫ দশমিক ৫ বছর কমে যাচ্ছে। প্রতি বছর বায়ুদূষণজনিত রোগে প্রায় ১ লাখ ২ হাজার ৪৫৬ জন মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় আইনের কঠোর প্রয়োগ, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ও নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।
তিনি আরও বলেন, দেশে বায়ুদূষণ নিয়ে গবেষণা অত্যন্ত সীমিত। তাই প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়ু গবেষণা সেল গঠনের সুপারিশ করেন তিনি। তথ্যভিত্তিক গবেষণা ছাড়া কার্যকর নীতিনির্ধারণ সম্ভব নয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে টেকসই সমাধান নিশ্চিতে যুবসমাজকে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
আলোচনায় একশনএইড বাংলাদেশের প্রোগ্রাম অফিসার মো. মাসুদ পারভেজ অভি বলেন, বায়ুদূষণের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে শিশু, প্রবীণ, অসুস্থ ব্যক্তি ও শ্রমজীবী মানুষের ওপর। এ ঝুঁকি মোকাবেলায় ঘোষিত ১৫ দফা দাবি দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত দাবিনামায় বায়ুদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০২২সহ বিদ্যমান নীতিমালা দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি পরিবেশ অধিদপ্তর, বিআরটিএ, সিটি করপোরেশন ও পুলিশের সমন্বয়ে যৌথ টাস্কফোর্স গঠন, বায়ুদূষণ সংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা হটলাইন চালু এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করার দাবি জানানো হয়।
এছাড়া ‘পলিউটার পেইজ প্রিন্সিপল’ অনুযায়ী দূষণকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জরিমানা ও ক্ষতিপূরণ আদায়, প্রয়োজনে লাইসেন্স স্থগিত করার কথা বলা হয়েছে। ঢাকা ও বিভাগীয় শহরগুলোতে পর্যাপ্ত বায়ুমান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন, জনবহুল এলাকায় রিয়েল-টাইম এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (একিউআই) প্রদর্শন এবং নিয়মিত বায়ুমান বুলেটিন প্রকাশের দাবি জানানো হয়।
দাবিনামায় নির্মাণস্থলে ধুলা নিয়ন্ত্রণ, নির্মাণসামগ্রী ঢেকে রাখা, নিয়মিত পানি ছিটানো এবং ফিটনেসবিহীন ও কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়। খোলা জায়গায় বর্জ্য ও প্লাস্টিক পোড়ানো বন্ধে নজরদারি বাড়ানো, চরম দূষণের সময়ে জনস্বাস্থ্য সতর্কতা জারি এবং ট্রাফিক পুলিশ ও শ্রমজীবীদের জন্য সুরক্ষামূলক মাস্ক সরবরাহের সুপারিশও করা হয়।
এ ছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে বাজেট ও সরঞ্জাম বৃদ্ধি, গণমাধ্যম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বছরব্যাপী জনসচেতনতা কার্যক্রম চালানো এবং সরকারি নীতিনির্ধারণ ও তদারকিতে তরুণ গবেষক ও ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে সরকারি তদারকি ও বাস্তবায়ন কমিটিতে যুব প্ল্যাটফর্মগুলোকে স্বাধীন পরিবীক্ষক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বানও জানানো হয়।