শিরোনাম
◈ ইরানের ড্রোন ঠেকাতে হরমুজে যুক্তরাষ্ট্রের ‘লেজার অস্ত্র’ : নিউ ইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদন ◈ জাতিসংঘের প্রশাসনিক দায়িত্বে জাইমা রহমান, লিগ্যাল অফিসারের আসল কাজ কী? (ভিডিও) ◈ নিউইয়র্কে প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজকে প্রবাসীদের কটূক্তি ও হেনস্তার অভিযোগ (ভিডিও) ◈ ককটেল বিস্ফোরণ: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন ডিএমপি ◈ সরকারি চাকরিতে মামলা চললে পদোন্নতি নয়, দণ্ড শেষেও দুই বছর অপেক্ষা ◈ ২৪ ঘণ্টায় হাম উপসর্গে তিন জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১২৬৫ ◈ জাতিসংঘ অধিবেশনে মোদি অনুপস্থিত কেন, ভারতের কূটনীতিতে কী বার্তা? ◈ নেতানিয়াহুর ভাষণের সময় বাংলাদেশসহ ৭৭ দেশের ওয়াকআউট ◈ নভেম্বরের মাঝামাঝি হতে পারে এইচএসসির ফল প্রকাশ  ◈ মহেশখালীতে এলএনজি স্থানান্তর শুরু, দেশে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি

প্রকাশিত : ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৮:২৮ রাত
আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৮:২৮ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

কক্সবাজারে স্যারের সংকট, পাচার হচ্ছে মিয়ানমারে 

সরওয়ার আজম মানিক, কক্সবাজার : চোরাই পথে মিয়ানমারে পাচারের কারণে কক্সবাজারে তীব্র সার সংকট দেখা দিয়েছে। কৃষকদের মধ্যে সারের জন্য হাহাকার চলছে। চাহিদা মত সার না পাওয়ার অভিযোগ কৃষকদের। চলতি বোরো মৌসুমে উৎপাদনের ‌লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার আশঙ্কা। সরকার নির্ধারিত মূল্যের অতিরিক্ত দাম দিয়েও বাজারে মিলছে না বিভিন্ন প্রকারের সার। কৃষি বিভাগ বলছে শীঘ্রই সার সংকট কেটে যাবে।বরাদ্দের সার মিয়ানমারে পাচার হওয়ার কারণে উখিয়া, টেকনাফ এবং রামুতে ইউরিয়া সারের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। সার পাচার প্রতিরোধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে বিজিবি ও কোস্ট গার্ড। পাচার প্রতিরোধে নিয়মিত মনিটরিং করার কথা বলছে জেলা প্রশাসন।

কক্সবাজার জেলায় উৎপাদিত ধানে স্বয়ংসম্পূর্ণ থাকলেও ২০১৭ সালের পর মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা আসার পর বাইরের জেলা থেকে খাদ্য নিয়ে আসতে হয়। বর্তমানে কক্সবাজারের ২৪ লাখ বাসিন্দার পাশাপাশি ১৫ লাখের মতো রোহিঙ্গা বসবাস করছে। ফলে কক্সবাজারে অতিরিক্ত খাদ্যের চাহিদা রয়েছে। এই বিষয়টি মাথায় রেখে পুরো জেলায় চলতি বোরো মৌসুমের ধান রোপন করে চাষিরা। প্রথম দিকে বৃষ্টি ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে দ্বিতীয় দফায় রোপন করতে হয়। কিন্তু কৃষকরা পর্যাপ্ত সার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। তারা বলছেন সারের অভাবে এবারের উৎপাদন অর্জিত না হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কক্সবাজার জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহকারি পরিচালক ড.বিমল কুমার প্রামানিক জানান , চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের সেপ্টেম্বর মাসে জেলায় বোরো মওসুমে ৪ হাজার ৭৫ মেট্রিকটন সারের চাহিদার বিপরীতে সমসংখ্যক সার বরাদ্দ দেয়া হয়। শুধুমাত্র চলতি মৌসুমে অর্থাৎ সেপ্টেম্বর মাসে জেলায় ইউরিয়া সারের বরাদ্দ হয় ২ হাজার ৩৪৩ মেট্রিক টন। টিএসপির বরাদ্দ ৪৭৫ টন। ডিএপি সারের বরাদ্দ হয় ৮৮৯ টন। এছাড়া এমওপি সারের বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৩৬৮ টন। গতকাল পর্যন্ত গুদামে উক্ত চার প্রকার সারের মজুদ রয়েছে ১৭৮৭ টন।  

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এ কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী কক্সবাজার জেলায় কোন ধরনের সারের ঘাটতি নেই। বাস্তবে মাঠে পাওয়া যাচ্ছে তার উল্টো চিত্র। কক্সবাজারের রামুর গর্জনিয়া ও কচ্ছপিয়ায় সারের জন্য ডিলারের সাথে কৃষকদের হাতাহাতি এমনকি মারামারির পর্যায়ের ঘটনা ও ঘটেছে বলে সেখানকার জন প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন।উখিয়া এবং টেকনাফের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট দিয়ে প্রতিদিনই মায়ানমারের পাচার হচ্ছে ইউরিয়া সার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে একাধিক চালান আটকের ঘটনা ঘটে। কয়েকদিন পর পর সার সহ ‌পাচারকারীদের আটক করছে বিজিবি ও কোস্টগার্ড।

advertisement

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বলছেন শীঘ্রই সংকট কেটে যাবে। জেলায় চাহিদার অনুযায়ী সার বরাদ্দ দেওয়া হলেও ঘাটতির বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে ইউরিয়া সার নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছে কৃষকরা সেটা দৃশ্যমান। শুধুমাত্র ইউরিয়া সার বাজারে না থাকার কারণে বোরো আবাদে বিপাকে পড়েছেন জেলার ৫ লক্ষাধিক কৃষক। কৃষকদের দাবি, সারের বরাদ্দ কম থাকার পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে এক ধরনের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে একটি সিন্ডিকেট ও কালোবাজারি চক্র এই সংকটকে আরো ঘনীভূত করছে। পাশাপাশি পার্বত্য অঞ্চল বান্দরবান খাগড়াছড়ি এবং মিয়ানমারেও কয়েকটি সিন্ডিকেট রাতের আঁধারে কক্সবাজার জেলার জন্য বরাদ্দকৃত সার উচ্চ দামে বিক্রি করে পাচার করছেন। সাম্প্রতিক সময়ে উখিয়া এবং টেকনাফে কয়েকটি পয়েন্টে প্রভাবশালী একটি দলের নেতারা মায়ানমারের ইউরিয়া সার পাচার করার কারণে এ সংকট আরো ঘনীভূত হয়েছে বলে অভিযোগ কৃষকদের।

কক্সবাজার সদর উপজেলার ঝিলংজা এবং পিএমখালীর কয়েকজন কৃষক আব্দুর রহিম, ফরিদুল আলম, ওসমান গনি, মাহমুদুল হক জানান - ইউরিয়া সার বাজারে ২৭ টাকা কেজি সরকার নির্ধারণ করলেও বাস্তবে তা ৩০ থেকে ৩৩ টাকায় কেজি প্রতি কিনতে হচ্ছে। সরকার নির্ধারিত মূল্যে ইউরিয়া সারের বস্তা ১৩৫০ টাকা হলেও তা বিক্রি হচ্ছে ১৫০০ থেকে ১৬০০ টাকায়। ডিএপি স্যারের কেজি প্রতি ২৭ টাকা দাম হলেও ২৭ টাকা দামে কোথাও এ সার বিক্রি করেছেন না ডিলাররা। এমওপি সার বস্তা ১০০০ টাকা সরকার দাম নির্ধারণ করলেও ১২০০ টাকার নিচে কোথাও এসার বিক্রি হচ্ছে না। একইভাবে ডিএপি সারের দাম বস্তা ১০৫০ টাকা হলেও কৃষকদের কিনতে হচ্ছে ১৩০০ থেকে ১৪০০ টাকায়। বেশি দামেও অনেক এলাকায় সার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন কৃষকরা। এভাবে সার না পেলে চলতি পবোরো মৌসুমে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার আশঙ্কা সাধারণ কৃষকদের।
অপরদিকে বোরো আবাদে যথাসময়ে সার প্রয়োগ করতে না পারার কারণে চরম ক্ষতির মুখে পড়ছে কৃষকরা। রামু উপজেলা গর্জনিয়ার কৃষক আবুল কাশেম ও জসিম উদ্দিন জানান, উপযুক্ত সময় জমিতে সার দেওয়া জরুরি কিন্তু ডিলাররা বলছেন ৫ কেজি নাও। প্রয়োজনমতো সার দিতে না পারলে এবার ফলন অনেক কম হবে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সার মিলছে না ডিলারদের কাছেও। এ অবস্থায় তিনিসহ ওই এলাকার অনেক চাষি চরম দুশ্চিন্তায় আছেন।

চলতি মৌসুমে সারের সংকট এর কারণ খুঁজতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, কৃষক এবং ডিলারদের সাথে কথা বলে জানা যায়- সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কর্তৃক সারের চাহিদা নিরূপণ করতে গিয়ে প্রকৃত চাহিদা মাঠ থেকে তুলে আনেননা। চাহিদা নিরূপণ করার সময় কর্মকর্তারা আউস, আমন বোরো মওসুম, শীতকালীন সবজির জন্য চাহিদা নিরূপণ করে থাকেন। প্রকৃতপক্ষে কক্সবাজারের রামু উপজেলায়সহ কয়েকটি উপজেলায় তামাক চাষ, মৎস্য ঘের,পানের বরজ, ছাদবাগান, বনবিভাগ কর্তৃক ফলজ ও বনজ গাছের বনায়নে সার প্রয়োগ করতে হয় তা হিসাবে আনেন না। ফলে চাহিদা নিরূপণের সময় উক্ত সারের চাহিদা পাঠানো হয়না কেন্দ্রীয়ভাবে। ফলে চাহিদা এবং বরাদ্দের মধ্যে বিস্তর অসামঞ্জস্য লক্ষ্য করা যায়। এছাড়াও চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ অপ্রতুলতা, বিতরণ ব্যবস্থায় নেই কোন আধুনিকায়ন, মাঠে সারের জন্য গুজব সৃষ্টি করে মজুদের প্রবণতা, টেকনাফ উখিয়া রামুর চারটি সীমান্তে মোটা দাগে সার পাচারসহ নানা কারণে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নজরদারির অভাব ও প্রকটভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। ফলে চলতি মৌসুমে কৃষকদের কাছে সার পাওয়া আকাশ কুসুম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া বর্তমান দায়িত্বগত ডিলারদের কাছ থেকে সরকারদলীয় নেতাদের কাছে ডিলারশিপ চলে যাবে এমন গুজব সৃষ্টি করে সারের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছে একশ্রেণীর দালাল চক্র। কতিপয় সরকারদলীয় নেতাদের দৌরাত্বের কারণে ডিলাররা বরাদ্দের বাইরে গিয়ে সার সংগ্রহ করছে না বলে বলেও জানা গেছে।

বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএ) কক্সবাজার জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক নুরুল আলম জানান- জেলার বিভিন্ন উপজেলায় চট্টগ্রাম থেকে সার পরিবহণে বস্তাপ্রতি (৫০কেজি) ৬০ থেকে ১৪০ টাকা ব্যয় হয়। বিসিআইসি বাফার গুদাম করা গেলে বস্তা প্রতি ব্যয় ২০ থেকে ৫০ টাকার মধ্যে নেমে আসবে।চট্টগ্রাম সার কারখানা থেকে টেকনাফ উপজেলার দূরত্ব ২০০ কিলোমিটারের ও অধিক। কুতুবদিয়া উপজেলায় সার পরিবহনের ক্ষেত্রে ডিলারদের ৪ বার লোড আনলোড করতে হয়।পরিবহনের ব্যয়ের পাশাপাশি গুদাম ভাড়া,কর্মচারী বেতন,বিদ্যুৎ বিল,ব্যাংক সুদসহ আনুসাঙ্গিক সকল প্রকারের খরচাদিও বেড়েছে।কিন্তু ডিলারদের এখনো ২০০৯ সালে নির্ধারিত কেজি প্রতি দুই টাকা কমিশনে ব্যবসা পরিচালনা করতে হচ্ছে।যে কারণে ডিলাররা প্রতিনিয়ত লোকসান গুণছেন। এমতাবস্থায় কক্সবাজার জেলায় দ্রুত বিসিআইসি বাফার গুদাম স্থাপন এবং দূরত্ব অনুযায়ী কমিশন নির্ধারণ করা না হলে ডিলারদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কষ্টসাধ্য হয়ে যাবে।

ডিলারদের সার বিক্রি তদারকির জন্য উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে একজন ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করা হলেও ডিলার এবং সেই অফিসারের যোগসাজসে উচ্চ দামে কৃষকদের সার বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ সাধারণ কৃষকদের।

এসব কারণে ভর্তুকি দেওয়া কৃষকদের এই সার তাদের কিনতে হচ্ছে উচ্চ দামে। উচ্চ দাম দিয়ে সার নেওয়ার পরেও কোন প্রতিবাদ করতে গেলেই কৃষকদের উপর নেমে আসে নির্যাতন। এমন অভিযোগ করেন অনেক কৃষক। ফলে কৃষকদের সাথে ডিলারদের একটা দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্ম দিচ্ছে প্রতিদিনই।

এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামানিক বলেন সারের ঘাটতি নেই। বাজার মনিটরিংয়ের জন্য টিম সার্বক্ষণিক কাজ করছে। মিয়ানমারে কৌশলে সার পাচার বিষয়ে এই কর্মকর্তা বলেন- উখিয়া এবং টেকনাফ উপজেলায় সার বিক্রি বিশেষ নজরদারি রয়েছে। প্রত্যেক ডিলারগণ বিক্রি শেষে রেজিস্টার এর মাধ্যমে অনলাইনের সার বিক্রির আপডেট প্রদানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী এ সার বিক্রি না করলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়ার পর উক্ত ডিলারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ও তিনি জানান। 

কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন বলেন, কয়েকদিন পরপরই সারসহ পাচারকারীদের আটক করছে কোস্টগার্ড। চলতি মাসেই তিনটি বড় ধরনের চালান আটক করে কোস্টগার্ড। 

বিজিবির কক্সবাজার রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কাজী সামশের উদ্দীন ,বলেন, সারপাচার প্রতিরোধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে বিজিবির সদস্যরা। মাঝেমধ্যে সারসহ পাচারকারীদের আমরা গ্রেপ্তার করছি।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোঃ আব্দুল মান্নান বলেন, চোকরা যাতে পর্যাপ্ত সার পেতে পারে এবং চলতি বড় মৌসুমে যাতে কোন ব্যাঘাত না ঘটে সেজন্য আমরা একাধিক বার মিটিং করেছি। স্যার প্রাপ্তিতে সরকারের নানা পদক্ষেপ রয়েছে। বর্তমান সরকার বলছে কৃষকরা যাতে পর্যাপ্ত সার পায় এবং উৎপাদন ভালো হয়। আমরা সেই লক্ষ্যে কাজ করছি। সার পাছার প্রতিরোধের বিষয়টি মনিটরিং করা হচ্ছে নিয়মিত।

  • সর্বশেষ