এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার: সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্রতিনিধিদের টানাটানির শিকার হচ্ছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কে কোথায় পরীক্ষা করাবেন, কোন চিকিৎসকের কাছে যাবেন কিংবা কোথায় ভর্তি হবেন—এসব সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে হাসপাতালকেন্দ্রিক একটি দালালচক্রের বিরুদ্ধে। এবার সেই অভিযোগের বাস্তবতা খতিয়ে দেখতে মাঠে নেমেছে প্রশাসন।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান ফটকের সামনে ভ্রাম্যমাণ আদালতের আকস্মিক অভিযানে একজনকে আটক করা হয়। পরে তাকে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অভিযানের খবর পেয়ে বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কয়েকজন প্রতিনিধি ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
আটক ব্যক্তি মো. ইয়াছিন (৩৭) সোনামণি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্রতিনিধি বলে জানানো হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক ও ফকিরহাটের সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. শরিফ নেওয়াজ তাকে দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ১৮৮ ধারায় ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন।
হাসপাতালের ফটকেই ‘রোগী ধরার’ অভিযোগ
স্থানীয় সূত্র ও হাসপাতালসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের লক্ষ্য করে বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্রতিনিধিরা অবস্থান নেন। রোগীর অসুস্থতা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলে তাদের নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়—এমন অভিযোগ রয়েছে।
কখনো রোগীর সঙ্গে সরাসরি কথা বলা, কখনো স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং কখনো দ্রুত পরীক্ষা বা চিকিৎসার কথা বলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান পরিচালনা করা হয়।
তবে অভিযানে কতজন প্রতিনিধি ঘটনাস্থলে ছিলেন এবং কারা পালিয়ে গেছেন—এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
আকস্মিক অভিযান, একজনের সাজা
বৃহস্পতিবারের অভিযানে প্রশাসনের উপস্থিতি টের পেয়ে কয়েকজন প্রতিনিধি দ্রুত সরে যান। এ সময় মো. ইয়াছিনকে আটক করা হয়।
পরে ঘটনাস্থলেই ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। দণ্ডবিধির ১৮৮ ধারায় তাকে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
অভিযানের সময় ফকিরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. তানভীর মাহমুদ অনিক এবং ফকিরহাট মডেল থানার পুলিশের একটি দল উপস্থিত ছিলেন।
রোগী সুরক্ষায় প্রশাসনের কঠোর বার্তা
ফকিরহাটের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. শরিফ নেওয়াজ বলেন, রোগীদের প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা এবং হাসপাতালকেন্দ্রিক দালাল চক্রের কার্যক্রম বন্ধ করতেই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, হাসপাতাল এলাকায় রোগী ও তাদের স্বজনদের হয়রানি কিংবা প্রতারণার কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না। এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
প্রশ্ন উঠছে নজরদারি নিয়ে
সরকারি হাসপাতাল থেকে একজন রোগী চিকিৎসা নিতে বের হওয়ার পর কোথায় পরীক্ষা করাবেন বা কোথায় চিকিৎসা নেবেন—সেটি তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত। কিন্তু কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি যদি রোগীকে প্রভাবিত করে নির্দিষ্ট বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিতে চান, তাহলে তা রোগীর স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
এ কারণে হাসপাতালের প্রবেশপথ, বহির্বিভাগ ও আশপাশের এলাকায় নজরদারি জোরদার করার দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে অভিযোগের সঙ্গে জড়িত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা যাচাই এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
একজনকে কারাদণ্ড দেওয়ার মধ্য দিয়ে অভিযান শেষ না করে হাসপাতালকেন্দ্রিক দালাল তৎপরতার উৎস, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং কীভাবে রোগী সংগ্রহ করা হয়—এসব বিষয় নিয়মিত নজরদারির আওতায় আনা গেলে রোগী হয়রানি ও প্রতারণার অভিযোগ কমানো সম্ভব হতে পারে।